আকাশচারিতা
“দেখা করবে আমার সাথে?”
রায়হানের প্রশ্নটা স্তম্ভিত করে দিল। বলে কি ও? দেখা করা? হোক না সে ভারচুয়াল পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে প্রিয়জন, আমার ফেইভারেট তালিকার শীর্ষাধিকারী। তবু অচেনাই তো। কিন্তু ও তো থাকে পৃথিবীর অপর প্রান্তে। তাইতো, দেখা করব বললেই তো হবে না। কেন যেন এই বোধটা সস্তি ফিরিয়ে আনল।
হাসির ইমোটিকনের ফোয়ারা ছুটিয়ে লিখলাম, “কিভাবে? তুমি থাক সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে।“
“চলে আসব, তুমি বললেই।“
“আহা, বীরপুরুষ! কিভাবে আসবে শুনি? ভিসা পাবে কি করে? আমেরিকা আসা এত সোজা না বুঝলে।“
“তোমার জন্য রাখতে পারি এ জীবনটা বাজি
অপ্রতিরোধ্য গতি আমার, তুমি থাকলে রাজি
কেমনে রুখে দেখব আমায় তুচ্ছ ভিসার কারসাজি!”
“উফফ, তুমি কেমন করে ঝটপট এমন ছন্দ মিলাও বলত? তোমার ফাইন্যান্স না পড়ে সাহিত্য পড়া উচিত ছিল।“
“তাইই পড়তাম যদি তখন তোমায় চিনতাম।
“আজকে কি খেয়েছ? সাত সকালে এত রোমান্টিকতা আসে কোত্থেকে? অফিসে বসে দিব্যি অনলাইনে প্রেম প্রেম খেলছ, বস আসে নাই?”
“তোমার মতন বেরসিক আর দেখি নাই। বস আসছে, কিন্তু আমি কি ডরাই সখি বস রাঘবে? এখন আমার কফি ব্রেক।“
“জানা আছে আপনার দৌড়! বসের গলা শুনলেই তোমার হৃৎকম্প শুরু হয়। গত সেমিস্টারে ডাব্বা মেরে যখন আমার ফান্ডিং যায় যায়, সেই ক্রাইসিসের সময় তুমি আমার বুকভাসানো কান্নার মাঝখানে, “বস” বলে ঝট করে যে সাইন-অফ করলা আর সারারাত, আই মিন, সারাদিন খবর নাই! এক সপ্তাহ কথা বলি নাই মনে আছে?”
“তা থাকবে না আবার। কি পাষানী রে তুমি। সাতদিনে ৭০০০ বার সরি বলেছি, কমসে কম ৭০০ ইমেইলে। তারপর কন্যার মান ভাঙল!”
“এই বাড়িয়ে বলবে না! মাত্র ১৫টা ইমেইল করেছিলে। আর একটাতো হাজার বার “সরি সরি” পেস্ট করে পাতা ভরিয়ে একশেষ। ওটা তো বাদ। আচ্ছা, তুমি তখন এত রোমান্টিক সব কথা লিখেছিলে, কই আর তো আমাকে ইমেইল কর না রায়হান! পুরান হয়ে যাচ্ছি?”
“কি আবোল তাবোল বলছ? বরং আমিই পুরান তোমার কাছে। বললাম, দেখা করবে কিনা, তোমার তো কোন ইচ্ছাই দেখলাম না।“
“আর ইউ সিরিয়াস? দেখা কিভাবে করব? আগামী ৪ বছর দেশে যাবার কোন চান্স নাই জান!”
“ইউ এস এ আসছি আমি কনা,
শুনব না তোমার কোন মানা”
“ঊফফ, মানে কি? স্পষ্ট করে বল না।“
“মানে হল, আজকে সকালে একটা ইমেইল পেলাম। ওবামা ভাই আমাকে আমেরিকা যাবার দাওয়াত দিচ্ছেন! নুতন ইমিগ্রেশন ল নাকি পাশ হয়েছে, আমার গ্রীনকার্ড রেডি, এপ্লাইও করা লাগে নাই। এখন খালি বোচকা নিয়ে প্লেন উঠার অপেক্ষা সুন্দরী!”
“তুমি এত ফাজিল! একটা স্প্যাম ইমেইল নিয়ে এতক্ষন আমাকে টেনশনে রাখলে। গতবার নাইজেরিয়াতে কাউকে চিনি কিনা, বেড়াতে যাব কিনা, তাও প্লেনের ফার্স্ট ক্লাসে চড়ে বলে অনেক দুস্টুমি করার পর জানলাম, কোন জেনারেলের বিধবা তোমাকে দশ মিলিয়ন ডলার দিবে বলে ইমেইল করেছে! এত শয়তানী বুদ্ধি নিয়ে তুমি ঘুমাও কেমনে?”
“ঘুমাই কে বলল ডারলিং, সারারাত তোমার স্বপ্ন দেখি!”
হঠাৎ বুকের সব ভার নেমে গেল। আমি রায়হানকে বাস্তবে দেখতে চাই কিনা সেটা আমি জানি না। তবে ও আমার অনেক প্রিয়, অনেক কাছের আকাশ-বন্ধু এটা ঠিক। বাস্তব অনেক জটিল। আমি জানি এ ব্যাপারটা ওর জন্যও সত্যি। ওর হয়তো খুব মিষ্টি একটা প্রেমিকা বা বউ আছে, প্রতি সন্ধ্যায় হয়তো তার জন্য ও ফুল কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এই বন্ধুত্ব, খুনশুটি, এই নির্ভরতাও তো মিথ্যে নয়! আবার এক গাদা চোখ-ছানাবড়া এমোটিকনের বন্যা বইয়ে লিখলাম,
“আমার স্বপ্ন? কেন সারারাত যাদের সাথে ফোনে কথা বলতে, তোমার সব প্রেমিকারা কই? এক সাথে ব্রেকাপ করছে?”
“সব পাষান! আমার জাতীয় সঙ্গীত এখন “এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে?”
“হু। তোমার মামদোভুত মার্কা চেহারা দেখে সব কেটে পড়ছে বল!
“হতে পারে। আমাকে রীতিমত ছ্যাক খাওয়া ছড়াকার বানিয়ে ছাড়লে তোমরা,
নারীজাতি পাষান অতি
না দেয় কভু ধরা
প্রেমের ভানে পারদর্শি
মন ছলনায় ভরা!”
ও এত হাসাতে পারে, আমার সব টেনশন চলে যায় এক লহমায়। ন্যায় অন্যায় জানি না, আমার আকাশ বন্ধুকে আমি ছাড়ব না এটা আমি জানি।
“ছ্যাকই ভাল, বেতনের পয়সা পকেটে থাকছে। হয়তো সত্যি একদিন আসতে পারবে আমার কাছে।
রোজ বিনাপয়সায় যাই স্বপ্নে, পয়সা খরচ করব কেন! অহ, কনা বস! গেলাম! টিসি। লাভ ইউ। বাই।“
------
(ফেসবুক বন্ধ, অনেকের মন খারাপ, তাদের জন্য এ random কথপোকথনের অর্থহীন গল্প!)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


