পাবনা ও সিরাজগঞ্জে নকল তরল দুধ তৈরি হচ্ছে!
-সৌজন্যে প্রথম আলো
Click This Link
পাবনার বিভিন্ন এলাকা এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ায় নকল তরল দুধ তৈরি হচ্ছে। সিরাজগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগ প্রাথমিক তদন্ত করে নকল দুধ তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। তারা নকল দুধ তৈরির বিভিন্ন উপদানসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দুধের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় মহাখালীতে অবস্িথত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পাঠিয়েছে।
গত সপ্তাহে পাবনার সাঁথিয়া, বেড়া, সোনাতলা এবং চলতি সপ্তাহে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় লোকদের কাছ থকে এই নকল দুধ তৈরির ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্থানীয় ঘোষদের নকল দুধ তৈরির বিষয়টি এলাকায় জানা ঘটনা।
নকল দুধ বানানো হয় যেভাবে: অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রামগঞ্জ থেকে প্রতিদিন দুধ কিনে আনে ঘোষেরা (দুধ ব্যবসায়ী)। সেই দুধ থেকে প্রথমে ননি আলাদা করা হয়। এরপর ওই দুধ থেকে ছানা তৈরি হয়। ছানা তুলে নিলে যে পানি থাকে, তা হলো নকল দুধের মূল উপাদান। ছানার পানিতে প্রথমে লোহা কাটার জন্য ব্যবহূত কাটিং ওয়েল (হার্ডওয়্যারের দোকানে বিক্রি হয়) প্রতি লিটারে দুই ফোঁটা হারে মেশানো হয়। এতে ছানার পানি পুরোপুরি সাদা রং ধারণ করে। সেই সাদা পানিতে নামমাত্র ননি, গুঁড়ো দুধ, চিনি, লবণ, খাবার সোডা (সোডিয়াম কার্বনেট) ও দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি (অ্যাসেন্স) মিশিয়ে তৈরি করা হয় নকল দুধ। এই দুধ বেশি সময় ভালো রাখতে এতে মেশানো হয় পার-অক্সাইড ও ফরমালিন। সাঁথিয়ার একজন দুধ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক মণ দুধ তৈরিতে আড়াই থেকে তিন কেজি ননি, এক কেজি চিনি এবং পরিমাণমতো খাবার সোডা ব্যবহার করতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা যা বলেন: সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. তওফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব উপাদান ব্যবহার করে দুধ তৈরি করা হচ্ছে, তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এ দুধ খেলে কিডনি ও যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, "নকল দুধ তৈরির বিষয়টি জেনে আমি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়েছি। তাঁরা যেন বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।"
ঢাকা জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. শাহ মাহফুজুর রহমান ও ডা. মো. মুকিম আলী বিশ্বাস বলেন, ফরমালিন, পার-অক্সাইড, কাটিং ওয়েল−সবই রাসায়নিক এবং মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তাঁরা বলেন, ফরমালিনের কারণে চোখ, নাক ও গলায় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। অ্যালার্জি, চর্মরোগ এবং প্রজনন সমস্যাও হতে পারে এতে। দিনের পর দিন এসব রাসায়নিক গ্রহণের ফলে ক্যান্সারও হতে পারে। যকৃৎ ও হূদযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে। পার-অক্সাইড ও কাটিং ওয়েল গ্রহণের ফলে কিডনি ও যকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্েথ্যর জন্য এগুলো বেশি হুমকিস্বরূপ।
যেসব এলাকায় নকল দুধ তৈরি হচ্ছে: স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনসহ বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, পাবনার বেড়া উপজেলার পেচাকোলা, নাকালিয়া ও হাটুরিয়া; সাঁথিয়া উপজেলার সরিষা ও সোনাতলা; ফরিদপুর উপজেলার ডেমরার বিভিন্ন এলাকা; সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়নের বাঐখোলা, স্যান্ডালপাড়া, পোরজনা ঘোষপাড়া, কায়েমপুর ঘোষপাড়া ও বাঘাবাড়ী; উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর এবং তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটি এলাকায় কৃত্রিম উপায়ে এসব দুধ তৈরি করা হচ্ছে। এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছে প্রায় সাড়ে তিন শ ঘোষ।
ঘোষেরা যা বলেন: নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাঁথিয়ার করজা গ্রামের একজন ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, প্রথমে তিনি এভাবে ব্যবসা করতেন না; এখন অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, "ফ্যাক্টরিগুলো যদি ওই দুধ না কিনে, তাহলে কেউ নকল দুধ বানাবে না। ফ্যাক্টরিগুলো কিনে বলেই এভাবে ব্যবসা হচ্ছে।" প্রতিষ্ঠানগুলোতে নকল দুধ কীভাবে সরবরাহ করেন জানতে চাইলে ওই ব্যবসায়ী বলেন, "কেউ সহযোগিতা না করলে কি এভাবে ব্যবসা করা যেত?"
ডেমরা এলাকার জয়দেব ঘোষ বলেন, প্রায় তিন মাস ধরে এ এলাকায় অনেকেই বিভিন্নভাবে দুধ তৈরি করছে। এ এলাকায় ছানা, ঘি ও দুধ তৈরির প্রায় ২০টি কারখানা আছে। প্রতিদিন এসব কারখানা থেকে প্রায় এক শ মণ কৃত্রিম দুধ তৈরি করা হচ্ছে।
বেড়ার সানিলা গ্রামের দুধ ব্যবসায়ী আশুতোষ ঘোষ জানান, তাঁরা গ্রাম এলাকা থেকে দুধ কিনে তা প্রাণ ও ব্র্যাকের সংগ্রহ ও শীতলীকরণ কেন্দ্রে সরবরাহ করেন। ছানার পানির সাহায্যে দুধ তৈরির বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমরা এ কাজ করি না। আমরা ছানার পানি পুকুরে ফেলে দেই।"
শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের চড়া-চিথুলিয়া গ্রামের আব্দুল আলিম ছানা তৈরি করেন। তিনি জানান, তাঁর কাছ থেকে মেশিন দিয়ে আলাদা করা (দুধ থেকে তুলে নেওয়া) ননি ও ছানার পানি অনেকে কিনে নেয়। তা দিয়ে তারা কেউ ঘি আবার কেউ দুধ তৈরি করে।
এই দুধ যাচ্ছে কোথায়: পাবনা ও সিরাজগঞ্জের দুটি উপজেলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে চারটি বড় বেসরকারি দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে প্রাণ, ব্র্যাক (আড়ং দুধ), আবুল মোনেম লিমিটেড (অ্যামো মিল্ক) ও আকিজ (ফার্ম ফ্রেস) গ্রুপ।
বেড়া অঞ্চলের প্রাণ দুধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের সহকারী ব্যবস্থাপক সোয়েবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, "আমরা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দুধ সংগ্রহ করি। ভেজাল দুধ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। যেসব ঘোষ ভেজাল দুধ নিয়ে আসে, তাদের দুধ আমরা ফিরিয়ে দেই।"
বাঘাবাড়ীতে অবস্িথত প্রাণ ডেইরি শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. এনামুল হক বলেন, "এ এলাকায় রমজান মাসে প্রচুর ভেজাল দুধ তৈরি হয়েছিল। তখন ঢাকায় প্রচুর চাহিদাও ছিল। সে সময় কেউ এই দুধ কিনে থাকতে পারে।" তিনি বলেন, প্রাণ কোম্পানি দুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংগ্রহ করে থাকে। স্বাস্থ্য বিভাগের একটি তদন্তকারী দল তাঁর কেন্দ্র থেকে দুধের নমুনা সংগ্রহ করেছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
বেড়া থানাধীন শাহজাদপুর জোনের হাটুরিয়া ব্র্যাকের শীতলীকরণ কেন্দ্রের প্রধান মোজাম্মেল হক বলেন, "আমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও স্থানীয়দের নিয়ে বৈঠক করেছি। কিন্তু নকল দুধ তৈরি বন্ধ হয়নি। আমরা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দুধ সংগ্রহ করি। তাই নকল দুধ সংগ্রহের প্রশ্নই ওঠে না।"
আকিজ দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আব্দুর রহমান বলেন, "আমরা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি। প্রশাসন এ বিষয়ে এখনো কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ প্রক্রিয়ায় দুধ তৈরি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।"
বাঘাবাড়ীতে অবস্িথত ইগলু (অ্যামো মিল্ক) দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, "চড়া-চিথুলিয়া গ্রামের রশিদ, আলী ও বাচ্চু নামের তিন ব্যক্তি আগে আমাদের ক্রয়কেন্দ্রে দুধ সরবারহ করত। তাদের দুধের মান খারাপ হওয়ায় তাদের কাছ থেকে দুধ নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।" তিনি জানান, এ এলাকায় প্রায় এক বছর ধরে ভেজাল দুধ তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রথম আলোকে বলেন, ক্রেতা বেশি থাকায় প্রত্যেকের প্রতিষ্ঠানের দুধ কেনার চাপ থাকে। এ কারণে অনেকে চাকরি বাঁচাতে বেশি দুধ সংগ্রহ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তখন মান নিয়ন্ত্রণে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। একমাত্র এ অঞ্চলেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শতাধিক দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র আছে।
স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য: বেড়ার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, "এটা আসলে আমরা সবাই জানি। আমি কয়েকজনকে নিষেধ করেছি। প্রশাসনকেও বিষয়টি জানিয়েছি। আশা করি, প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।"
বেড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, "আমাদের কাছে নকল দুধ তৈরির বিষয়ে তথ্য এসেছে। গ্রামের লোকজন বিভিন্ন সময়ে আমাদের জানিয়েছে। তার পরও আমরা সোর্স নিয়োগ করেছি। বিষয়টি আমাদের নজরে আছে।"
বেড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাল হোসেন জানান, "এটা খুবই ভয়াবহ বিষয়; মেলামাইনের চেয়ে কোনো অংশে কম না। আমরা শিগগিরই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব। জায়গাগুলো চিহ্নিত করে অভিযানে যাব।"
তদন্ত: সিরাজগঞ্জ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ২৭ আগস্ট তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করে। তারা গত ৯ সেপ্টেম্বর বাঘাবাড়ীর ব্র্যাক সিলিং সেন্টার ও মোনেম লিমিটেড থেকে দুধের নমুনা সংগ্রহ করেছে। তদন্ত দল ১১ সেপ্টেম্বর বাঘাবাড়ীর বিক্রমপুর ডেইরি লিমিটেড থেকেও দুধের নমুনা সংগ্রহ করে সব নমুনা গত ১৩ সেপ্টেম্বর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পাঠায়। ২৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত দলটি শাহজাদপুরের মো. বাচ্চুর কারখানা থেকে ছানার নমুনা, মো. আব্দুল আলিমের ছানার কারখানা থেকে দুধের সঙ্গে মেশানো ময়দা এবং আব্দুর রশিদের ছানার কারখানা থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য জব্দ করে। এগুলোও মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সুত্রে জানা গেছে, এসব নমুনা নিয়ে তারা কাজ করছে। এখনো প্রতিবেদন চুড়ান্ত হয়নি।
তদন্ত দলের প্রধান শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আনছার আলী জানান, তদন্তকালে বিভিন্ন ছানার কারখানায় রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গেছে। ছানার পানি মজুদ করে রাখতে দেখা গেছে। এই পানি নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



