১.
-এতক্ষন লাগলো আসতে ?
-স্যরি স্যরি জনাবা , অফিসে অনেক কাজ ছিলো , ছেড়ে আসা যাচ্ছিলো না , জোর করে আসতে হলো ।
-হুম , দিন রাত ২৪ ঘন্টা শুধু অফিসের কাজ নিয়ে থাকো , আমার কথা কি মনে থাকে নাকি?(কপট রাগ)
-আহা কি যে বলো না ? তুমি ছাড়া আর.......
চলতে থাকে রাগ ভাঙ্গার মিষ্টি কথোপকথন , খুনসুটি , রাত গভীরের সাথে ক্রমান্বয়ে তা গড়ায় দাম্পত্যের স্বাভাবিক ক্রিয়ায় , সঙ্গত কারনেই শহুরে বাড়িটার সব আলো নিভে যায় ।
২.
শহুরে বাড়িতে আজ উত্সবের আমেজ , নতুন অতিথির আগমন উপলক্ষ্যে বাড়িটা বেশ জমকালো ভাবে সাজানো হয়েছে , বাড়িটার সমস্ত চাকচিক্য যেন ঝলমল করছে । আর সেই নতুন অতিথিকে নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত , অতিথি এর কোল থেকে ওর কোলে ঘুরে বেরাচ্ছে , এত যাতায়াতের ফলে তার ভিতর বেশ ক্লান্তি এসে গিয়েছে বোধহয় , তাই মায়ের কোলে স্থান পাওয়া মাত্রই ঘুমে ডুবে গেলো আসরের মধ্যমনি ।
৩.
-আব্বু সোনা লক্ষী খাও , না হলে আম্মু রাগ করবে কিন্তু ।
ডিং ডং
-পাপা এসেছে পাপা এসেছে , আমি পাপাল হাতে খাবো(আহ্লাদী কন্ঠ )
ছুটে গিয়ে রায়হানের কোলে ওঠে রিওল নামের ছোট্ট বাবুটা ।
-নেও , তোমার ছেলে তুমি খাওয়াও ।
-ছেলে কি শুধুই আমার ? ( কিঞ্চিত হাসি )
-তা নয়তো কি ? সারাদিন আমি তার পিছে পিছে ঘুরেও সে তোমাকে ছাড়া খায় না ( কপট রাগ )
রায়হানের মুখে হাসি খেলে যায় ( প্রশান্তির হাসি )
৪.
-আর বলবেন না ভাবি , বাসায় পড়াশুনা করলে তো পরীক্ষায় ভালো করবে , এত বদমাইশ ছেলে চিন্তাও করতে পারবেন না ( গলায় যথেষ্ট ঝাঁঝ )
-আমারটারও একই অবস্থা , এত করে বলি তবু পড়াশুনার নাম মুখে আনেনা ( মিসেস রত্না সুর মেলায় মিসেস কবিতা রায়হানের সাথে )
৫.
-আব্বু আব্বু এই দেখো তোমার পুত্রধনের পরীক্ষার সাফল্য ( বাবা নয় যেন
বন্ধু ! কন্ঠে সে রকমই ভাষা ঝরে পরে )
-বেঁচে থাক বাবা , তোর জীবনে আরো সাফল্য আসুক ।
-আরে কি যে বলো আব্বু ! সব তো আম্মুর সাফল্য , বান্দরকে শাসনের ফল এটা । তিনজন মাত্র মানুষ তবু হাসির রোল ওঠে সারা বাড়িতে । ছেলের সাফল্যের আনন্দে চোখে কিঞ্চিত পানি চলে আসে বাবা মা দুজনেরই ।
৬.
-আ তো ভা !
-কি ? কিছু বুঝি না , ঢং ছেড়ে বুঝায়া বল ( ঝাঁঝের সাথে বলে নাদিয়া )
রিওলের গলা বেশ শুকিয়ে আসে , নাদিয়ার ঝাঁঝের সাথে ভালো মতই পরিচিত তবু এবার অনেক সাহস সঞ্চয় করে আসল কথা বলেই ফেলে ।
-আ আ আ
- কি আ আ করিস এ্যাঁ ( গলায় ঝাঁঝ আরো বেড়ে যায়)
-আমি তোকে ভালবাসি , এই নে লাল গোলাপ , লাল গোলাপ ভালোবাসার প্রতিক জানিস তো ? না জানলে এখন আমার কাছ থেকে জানলি । ওকে ?
ঝড়ের মতো কথা গুলো বলে আবার ঝড়ের মতই দৌড়ে পালায় রিওল । নাদিয়া চোখ বড় , মুখ কিঞ্চিত হা করে তাকিয়ে থাকে রিওলের দৌড়ে যাওয়া পথে ।
৭.
-ছেলেটাকে বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা দরকার ।
-হুম আমিও তাই ভাবছি , এত ভালো একটা রেজাল্ট করেও চাকরি পাচ্ছে না দেশে , দেশটা কি আসলেই গোল্লায় গেলো ? ( রাগে খানিকটা প্রেসার বেড়ে যায় রায়হান সাহেবের )
-আহ ! উত্তেজিত হয়োনাতো , কিন্তু এত টাকা কোথায় পাব ? সেটা চিন্তা করেছ ?
-এই যে বাড়িটা... !
কিছুটা দ্বিধা নিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে দেয় রায়হান , কবিতাও নিশ্চুপ তাকিয়ে দেখতে থাকে রায়হানকে । যেন দুজনের অনেক কথাই চোখে চোখে হয়ে যায় ।
৮.
-যদি ভুলে যাও ?
-দূর বোকা মেয়ে , ক বছর পরেই তো চলে আসবো , তখন তোমার আমার .....
রিওলের আশ্বাসে নাদিয়া আশায় বুক বেঁধে থাকে কিন্তু বছরদেড়েক পরে যখন ফোনে কথা হয় >
-নাদিয়া , আই এম স্যরি !
কথাটা শুনেই নাদিয়া বুঝে ফেলে যা বোঝার আর দ্বিতীয় কোন কথা সে বলেনি ।
খুব কি কেঁদেছিলো নাদিয়া ?
৯.
বছর কয়েক আগেই গত হয়েছেন কবিতা , বর্তমানে রায়হান সাহেব বাড়িতে একাই থাকেন । রিওলের পাঠানো টাকা দিয়ে বেশ আগেই বাড়িটাকে দেনা থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন তিনি । কিন্তু অনেকদিন পুত্রকে দেখতে পান না তিনি , কেন যেন রিওলই আর যোগাযোগ করে না , শেষবার মায়ের মৃত্যুর সময়ও সে আসে নি । কদিন ধরে মনে হচ্ছে তাঁর নিজের সময়ও ঘনিয়ে আসছে , খুব ইচ্ছে করছে ছেলেকে দেখতে , ড্রয়ার থেকে ছবি এলবাম বের করে বারান্দায় বসে অতীত দেখতে থাকেন আর বুকে ব্যথা প্রবল হয়ে ওঠে ।
১০.
নিউইয়র্ক গিয়েই কঠিন জীবন সংগ্রামে পরে যায় রিওল , বছরখানেক প্রচন্ড পরিশ্রম করে কাটাতে হয় তাকে , ঘুমের ঠিক নেই , খাওয়ার ঠিক নেই , একেবারেই যা তা অবস্থা । মাঝে মাঝে দেশের কথা মনে পরে তখন শুধু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে । এর মধ্যেই পরিচয় হয় লাস্যময়ী লিটার সাথে । রিওলের ব্যবহারে মুগ্ধ সে । বিয়ের প্রস্তাব দেয় , রিওল প্রথমে ফিরিয়ে দেয় তার বাবা মায়ের কথা বলে , বাড়ি বন্ধক থেকে তাদের মুক্ত করতে হবে যে ! লিটা সব ব্যবস্থা করে রিওলের জন্য , নিউইয়র্কের মত শহরে প্রভাব খাটিয়ে তার জন্য দামি চাকরি দেয় সে বিনিময়ে বিয়ে করতে চায় রিওলকে আর একটা শর্ত দেশে যেতে পারবে না ।
নাদিয়ার জন্য কষ্ট লেগেছিলো কি রিওলের কিংবা বাবা মাকে দেখতে না পাবার ? হয়তো লেগেছিলো , কিন্তু বাস্তবতার বাস্তবতায় সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে নি সে ।
১১.
কোলাহলময় বাড়িটা ধীরে ধীরে শুন্য হয়ে যায় । এক সময় কে বা কারা যেন সেটা দখলে নিয়ে নেয় । শুন্য বাড়ি আবার সরব হয় , সাক্ষী হবার প্রতিক্ষায় থাকে আরো একটি জীবন গল্পের ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০১২ রাত ১২:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


