somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অতিক্রমণ কিংবা অবগাহনের গল্প

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৯:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :







১.
-এতক্ষন লাগলো আসতে ?
-স্যরি স্যরি জনাবা , অফিসে অনেক কাজ ছিলো , ছেড়ে আসা যাচ্ছিলো না , জোর করে আসতে হলো ।
-হুম , দিন রাত ২৪ ঘন্টা শুধু অফিসের কাজ নিয়ে থাকো , আমার কথা কি মনে থাকে নাকি?(কপট রাগ)
-আহা কি যে বলো না ? তুমি ছাড়া আর.......
চলতে থাকে রাগ ভাঙ্গার মিষ্টি কথোপকথন , খুনসুটি , রাত গভীরের সাথে ক্রমান্বয়ে তা গড়ায় দাম্পত্যের স্বাভাবিক ক্রিয়ায় , সঙ্গত কারনেই শহুরে বাড়িটার সব আলো নিভে যায় ।

২.
শহুরে বাড়িতে আজ উত্সবের আমেজ , নতুন অতিথির আগমন উপলক্ষ্যে বাড়িটা বেশ জমকালো ভাবে সাজানো হয়েছে , বাড়িটার সমস্ত চাকচিক্য যেন ঝলমল করছে । আর সেই নতুন অতিথিকে নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত , অতিথি এর কোল থেকে ওর কোলে ঘুরে বেরাচ্ছে , এত যাতায়াতের ফলে তার ভিতর বেশ ক্লান্তি এসে গিয়েছে বোধহয় , তাই মায়ের কোলে স্থান পাওয়া মাত্রই ঘুমে ডুবে গেলো আসরের মধ্যমনি ।

৩.
-আব্বু সোনা লক্ষী খাও , না হলে আম্মু রাগ করবে কিন্তু ।
ডিং ডং
-পাপা এসেছে পাপা এসেছে , আমি পাপাল হাতে খাবো(আহ্লাদী কন্ঠ )
ছুটে গিয়ে রায়হানের কোলে ওঠে রিওল নামের ছোট্ট বাবুটা ।
-নেও , তোমার ছেলে তুমি খাওয়াও ।
-ছেলে কি শুধুই আমার ? ( কিঞ্চিত হাসি )
-তা নয়তো কি ? সারাদিন আমি তার পিছে পিছে ঘুরেও সে তোমাকে ছাড়া খায় না ( কপট রাগ )
রায়হানের মুখে হাসি খেলে যায় ( প্রশান্তির হাসি )

৪.
-আর বলবেন না ভাবি , বাসায় পড়াশুনা করলে তো পরীক্ষায় ভালো করবে , এত বদমাইশ ছেলে চিন্তাও করতে পারবেন না ( গলায় যথেষ্ট ঝাঁঝ )
-আমারটারও একই অবস্থা , এত করে বলি তবু পড়াশুনার নাম মুখে আনেনা ( মিসেস রত্না সুর মেলায় মিসেস কবিতা রায়হানের সাথে )


৫.
-আব্বু আব্বু এই দেখো তোমার পুত্রধনের পরীক্ষার সাফল্য ( বাবা নয় যেন
বন্ধু ! কন্ঠে সে রকমই ভাষা ঝরে পরে )
-বেঁচে থাক বাবা , তোর জীবনে আরো সাফল্য আসুক ।
-আরে কি যে বলো আব্বু ! সব তো আম্মুর সাফল্য , বান্দরকে শাসনের ফল এটা । তিনজন মাত্র মানুষ তবু হাসির রোল ওঠে সারা বাড়িতে । ছেলের সাফল্যের আনন্দে চোখে কিঞ্চিত পানি চলে আসে বাবা মা দুজনেরই ।

৬.
-আ তো ভা !
-কি ? কিছু বুঝি না , ঢং ছেড়ে বুঝায়া বল ( ঝাঁঝের সাথে বলে নাদিয়া )
রিওলের গলা বেশ শুকিয়ে আসে , নাদিয়ার ঝাঁঝের সাথে ভালো মতই পরিচিত তবু এবার অনেক সাহস সঞ্চয় করে আসল কথা বলেই ফেলে ।
-আ আ আ
- কি আ আ করিস এ্যাঁ ( গলায় ঝাঁঝ আরো বেড়ে যায়)
-আমি তোকে ভালবাসি , এই নে লাল গোলাপ , লাল গোলাপ ভালোবাসার প্রতিক জানিস তো ? না জানলে এখন আমার কাছ থেকে জানলি । ওকে ?
ঝড়ের মতো কথা গুলো বলে আবার ঝড়ের মতই দৌড়ে পালায় রিওল । নাদিয়া চোখ বড় , মুখ কিঞ্চিত হা করে তাকিয়ে থাকে রিওলের দৌড়ে যাওয়া পথে ।

৭.
-ছেলেটাকে বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা দরকার ।
-হুম আমিও তাই ভাবছি , এত ভালো একটা রেজাল্ট করেও চাকরি পাচ্ছে না দেশে , দেশটা কি আসলেই গোল্লায় গেলো ? ( রাগে খানিকটা প্রেসার বেড়ে যায় রায়হান সাহেবের )
-আহ ! উত্তেজিত হয়োনাতো , কিন্তু এত টাকা কোথায় পাব ? সেটা চিন্তা করেছ ?
-এই যে বাড়িটা... !
কিছুটা দ্বিধা নিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে দেয় রায়হান , কবিতাও নিশ্চুপ তাকিয়ে দেখতে থাকে রায়হানকে । যেন দুজনের অনেক কথাই চোখে চোখে হয়ে যায় ।

৮.
-যদি ভুলে যাও ?
-দূর বোকা মেয়ে , ক বছর পরেই তো চলে আসবো , তখন তোমার আমার .....
রিওলের আশ্বাসে নাদিয়া আশায় বুক বেঁধে থাকে কিন্তু বছরদেড়েক পরে যখন ফোনে কথা হয় >
-নাদিয়া , আই এম স্যরি !
কথাটা শুনেই নাদিয়া বুঝে ফেলে যা বোঝার আর দ্বিতীয় কোন কথা সে বলেনি ।

খুব কি কেঁদেছিলো নাদিয়া ?

৯.
বছর কয়েক আগেই গত হয়েছেন কবিতা , বর্তমানে রায়হান সাহেব বাড়িতে একাই থাকেন । রিওলের পাঠানো টাকা দিয়ে বেশ আগেই বাড়িটাকে দেনা থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন তিনি । কিন্তু অনেকদিন পুত্রকে দেখতে পান না তিনি , কেন যেন রিওলই আর যোগাযোগ করে না , শেষবার মায়ের মৃত্যুর সময়ও সে আসে নি । কদিন ধরে মনে হচ্ছে তাঁর নিজের সময়ও ঘনিয়ে আসছে , খুব ইচ্ছে করছে ছেলেকে দেখতে , ড্রয়ার থেকে ছবি এলবাম বের করে বারান্দায় বসে অতীত দেখতে থাকেন আর বুকে ব্যথা প্রবল হয়ে ওঠে ।

১০.
নিউইয়র্ক গিয়েই কঠিন জীবন সংগ্রামে পরে যায় রিওল , বছরখানেক প্রচন্ড পরিশ্রম করে কাটাতে হয় তাকে , ঘুমের ঠিক নেই , খাওয়ার ঠিক নেই , একেবারেই যা তা অবস্থা । মাঝে মাঝে দেশের কথা মনে পরে তখন শুধু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে । এর মধ্যেই পরিচয় হয় লাস্যময়ী লিটার সাথে । রিওলের ব্যবহারে মুগ্ধ সে । বিয়ের প্রস্তাব দেয় , রিওল প্রথমে ফিরিয়ে দেয় তার বাবা মায়ের কথা বলে , বাড়ি বন্ধক থেকে তাদের মুক্ত করতে হবে যে ! লিটা সব ব্যবস্থা করে রিওলের জন্য , নিউইয়র্কের মত শহরে প্রভাব খাটিয়ে তার জন্য দামি চাকরি দেয় সে বিনিময়ে বিয়ে করতে চায় রিওলকে আর একটা শর্ত দেশে যেতে পারবে না ।

নাদিয়ার জন্য কষ্ট লেগেছিলো কি রিওলের কিংবা বাবা মাকে দেখতে না পাবার ? হয়তো লেগেছিলো , কিন্তু বাস্তবতার বাস্তবতায় সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে নি সে ।

১১.
কোলাহলময় বাড়িটা ধীরে ধীরে শুন্য হয়ে যায় । এক সময় কে বা কারা যেন সেটা দখলে নিয়ে নেয় । শুন্য বাড়ি আবার সরব হয় , সাক্ষী হবার প্রতিক্ষায় থাকে আরো একটি জীবন গল্পের ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০১২ রাত ১২:১৮
১৩০টি মন্তব্য ১৩২টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×