"অপ্সরী! তোমার আর কতক্ষন লাগবে?"
ও ডাকছে আমাকে। খুব তাড়া। একটুও দেরী সয়না তার! 'ও' কে ,সেতো বলাই বাহুল্য, আমার ভালোবাসার মানুষ। কিন্তু ওকে আমি নাম ধরে ডাকতে পারিনা কখনও! প্রাচ্যদেশীয় মেয়েরা যতই আধুনিক হোক এই সংস্কারটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আমিও না। অবশ্য দরকারই বা কী! পোষাকী নামে না ডেকে যখন যে নামে খুশী ডাকবো, সেই ভালো না!
"আসছি ধূমকেতু! একটু দাঁড়াও।"
"ধূমকেতু! এই নামে ডাকার কি হেতু বালিকা?"
"ধূমকেতুর মতই তোমার গতি আর আমার কক্ষপথে পরিভ্রমণ!"
"বটে! তুমি বলতে চাচ্ছো আমি খালি তোমার পেছনে ঘুরি?"
হুহ! গলায় আলগা গাম্ভীর্য এনে রাগ দেখানোর চেষ্টা করছে! ওকে কি আমি
চিনিনা? কতই না রাগ করতে পারে আমার ওপর মহা বাহাদুর! করুক, আরেকটু রাগ করুক, রাগ ভাঙানো কোন ব্যাপার?
"কি হল, কথা বলছনা কেন?"
"আমি তো কথা বেশি বলি। খালি বকবক করি। কি বলতে না কি বলে ফেলি। তাই চুপ করে গেলাম। স্যরি।"
আমার 'রাগ'পুত্রকে বড়ই বিচলিত দেখাচ্ছে এখন। যেন এক হতচকিত রাজপুত্র। আমার রাজপুত্র!
"এই আমি আবার কখন বললাম যে তুমি বকবক কর? তুমি না খালি ভুল বোঝ আমাকে।"
এইবার ওর দরকার একটা আশ্বাসের, ভালোবাসার হাসি। ভালোবাসার এই সমুদ্দুরে সাঁতরাতে সাঁতরাতে ডুবে যেতে যেতে আনন্দে চোখে জল এসে যায়। ভাগ্যিস এই সমুদ্দুরটা ছিলো। নাহলে আমার ছিচকাঁদুনে স্বভাবটাকে নিয়ে নিশ্চয়ই খোঁচাতো। হু, তোমার অপ্সরী অনেক কাঁদতে জানে। কিন্তু তোমার জীবনকে হাসিতে ভরিয়ে দিতে কান্নার ছলকে পড়া জলকে বরফ করে দেবে, জেনে রেখো। আমার হাসি দেখে সেও হাসে। পরক্ষণেই আবার তাগাদা দেয়,
"যাবেনা?"
যাবো বৈকি। না গিয়ে কি পারি! ওর খুব ঘুরে বেড়ানোর শখ। ঘরকুনো এই আমাকে চুড়ান্ত রকম ভ্রমনবিলাসী করে ফেলেছে। শহরের যাবতীয় দ্রষ্টব্য স্থান তো বটেই, কোথায় আজ কোন আন্দোলনের পোস্টারিং করতে যাবে, চল সাথে! কোথায় আজ কদম ফুল ফুটেছে থোকা থোকা, চল দেখে আসি! শহরের পুরোনো অংশটায় নতুন কি দারুন খাবার এসেছে, চল যাই! আজ আবার কোথায় যাবার প্ল্যান করেছে কে জানে।
আমাকে বলেনি এখনও। সারপ্রাইজ দিতে খুব ভালোবাসে। আমিও অবশ্য পেতে ভালোবাসি! বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। উনি আবার কবিতা টবিতা লিখে থাকেন। নতুন কোন থিম এসেছে মনে হয়। আমাকে একবার বলেছিলো,
"জানো অপ্সরী, ভালোবাসার মধ্যে না একধরনের যন্ত্রণা আছে। এই যন্ত্রণাটুকু যদি না থাকতো, আকন্ঠ সুখী ভালোবাসায় ডুবে থাকতাম, তাহলে হয়তোবা আমার কবিতা লেখাই বন্ধ হয়ে যেতো।"
আমি ঠিক বুঝতে পারিনি কথাটা। যন্ত্রণা থাকবে কেন? আর যন্ত্রনার মাঝেই কি ও সুখ খুঁজে পেতে চায়?
"আমার আবার ওসব যন্ত্রণা ফন্ত্রণা ভাল্লাগেনা" -বলেছিলাম আমি। মৃদু হেসে ও জবাব দিয়েছিলো,
"একদিন তোমাকে একটা গল্প লিখে দেবো, যেটা পড়লে তোমার খুব কান্না পাবে। সেদিন বুঝবে যন্ত্রণার মধ্যে, কান্নার মধ্যেও কত আনন্দ আছে।"
তো মশাই কি এখন বিড়বিড় করে সে গল্পই কন্ঠস্থ করছে নাকি! উনার আবার কাগজ কলম না হলেও চলে। ভাবুক মানুষ!
"এই, আমি রেডি, চল চল চল!"
"হু, চল।"
"কোথায় যাচ্ছি আজকে আমরা?"
"গোধূলি দেখতে।"
"হু, সব জায়গায় তো পদধূলি দেয়া হয়েছে গোধূলির আলোয় তা আরেকটু শানিয়ে নিই।"
"গোধূলির আলো তোমার কাছে বিষণ্ণ লাগেনা অপ্সরী।"
"তা তো লাগেই।"
"আজকে তোমাকে সেই গল্পটা বলব"
যা ভেবেছিলাম। আমার কষ্টবিলাসী রাজপুত্রটা!
"চল মাঠের ওখানে বসি"
আমরা বসলাম সবুজ ঘাসের ওপর পূর্ণচাঁদের আলোয়। অদ্ভুত মায়াবী সবকিছু। গোধুলির বিষণ্ণ লগ্ন পাড়ি দিয়ে আমরা এখন জোৎস্নানগরীতে।
"কি হত যদি চাঁদ নিভে যেতো আজকে রাতে হঠাৎ?"
"এটাই কি তোমার সেই বিষণ্ণ গল্পের সূচনা?"
"হয়তোবা! কি হত যদি চোখের তারাগুলি স্থির হয়ে যেত হঠাৎ?"
"হু,মন খারাপ করা গল্পই বটে। বলতে থাকো"
"কি হত যদি আমি কখনও আর বলতে না পারি, ভালোবাসি?"
"খুব খারাপ খুব খারাপ খুব খারাপ!"
এবার আমি আর নিবিষ্ট পাঠকের শান্ত ভঙ্গি ধরে রাখতে পারিনা।
"খুব খারাপ হত,শোন তোমাকে আর কোন বিষণ্ণ গল্প বলতে হবেনা। আমাকে একবার খালি বল যে ভালোবাসো।"
মেঘ এসে চাঁদকে ঢেকে দিয়ে যায়। ওকে খুব কাছে থেকেও অস্পষ্ট আর অচেনা লাগে। মন খারাপ করা গল্পের এরকম জোৎস্নাগ্রাসী প্রভাব পড়বে আগে জানলে কি বলতে দিতাম! তারার আলো চুরি করে আমি ওর চোখের তারার দিকে তাকাই। স্থির আর নিস্পন্দ। আমি ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে থাকি।
"এরকমতো হবার কথা ছিলোনা গল্পটা! এত নিষ্ঠুর গল্প! ওঠো তো, চল আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। এই কি হল কথা বলছনা কেন???"
আমি ভুলে গিয়েছিলাম ফিরতে চাইলেই ফেরা যায়না। আর না ফেরার দেশের নিষ্ঠুর মানুষেরা কখনও ফিরে আসেনা। তবুও আমাকে ফিরতে হয়। ক্লান্ত ভঙ্গিমায় হেঁটে চলি শুকনো পাতা মাড়িয়ে। প্রতিবছর এই দিনটায় আমার এমন হয়। আমার হারিয়ে যাওয়া ওকে আমি খুঁজে ফিরি। ওর সাথে ঘুরি ফিরি, কিন্তু সমাপ্তিতে সবসময় ও ঐ বিষণ্ণ গল্পটা বলে। তারপর আবার হারিয়ে যায়। কিন্তু আমাকে ফাঁকি দিয়ে আর কতদিন? গল্পের শেষটা একদিন ঠিকই বদলে নেবো। ওর নিস্পন্দ চোখের তারায় হাজার ঝাড়বাতি জ্বেলে দেবো। পালিয়ে আর যাবে কোথায়? নাহয় আমিও চলে যাব না ফেরাদের দেশে।
তোমাকে যে আমার খুঁজে পেতেই হবে ধূমকেতু...
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০১২ রাত ১২:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



