somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ " আমি আসছি ফিরে....অন্যলোকে অথবা তোমাদের কোলাহলে "

০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১২:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রাহাত। নীল আকাশের ছোপ ছোপ সাদা মেঘের উপর দিয়ে ছুটে চলেছে একটি উড়োজাহাজ। আজকাল আকাশে ভেসে বেড়ানো এই উড়োযান তাকে অনেক বেশী উদাসী করে তোলে। এই মানুষবাহী যন্ত্রটি শুধু মানুষকে বহন করে না, সাথে বহন করে নেয় একরাশ স্বপ্ন, কিছু সুখ, অনেক স্মৃতি, মোহিত আবেগ আর নিরন্তর ভালোবাসা। একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বয়ে নিয়ে যায় হিমেল বার্তা অথবা সাম্য সংহতি। রাহাতের উদাসী হওয়ার পেছনে কারনটা অবশ্য একটু ভিন্ন।

রাহাত যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে তখন ওর বাবা সাইদুল হক মারা যান। সারা জীবনের অর্জন প্রায় ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার পতনের তর তিনি সইতে পারেন নি। স্টক এক্সচেন্জ এর সিঁড়িতে স্ট্রোক হয় তার, বুক চেপে বেসে পরেন। ধরাধরি করে হসপিটালে নেয়া হলে ডাক্তার বলেন হৃদ যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা গেছেন।

তেমন কোন আত্মীয় ছিল না ওদের। সুতরাং একমাত্র মামার বাসায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল। একসময় রাহাতের পড়াশোনার খরচ যোগার করতে মীনহাজ আরা হক একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুলে চাকরি নেন। স্বপ্ন দেখেন ছেলে বড় হয়ে পুরনো সুখের দিন ফিরিয়ে আনবে। একমাত্র এই ছেলেটি তার সবটুক জুড়ে।

ভাইয়ের অশান্তির সংসারে মীনহাজ আরা হক আর তার ছেলে রাহাত ছিলো অনাকাঙ্খিত উৎকোচের মতই। একটা ছোট ঘর আঁকড়ে কোনভাবে দিনপাত ছিলো মা ছেলের। মীনহাজ বেগম যা বেতন পেতেন তার সবটুকই খরচ হয়ে যেত ছেলের পড়াশোনায়। ছেলেকে নিয়ে গর্বের সীমা নেই তার। রাহাতের মত শান্ত আর মেধাবী ছেলে গোটা স্কুলে দ্বিতীয়টি ছিলো না। চেইন ছেঁড়া ব্যাগ কিংবা দুইবছরে একসাইজ ছোট হয়ে যাওয়া জুতা নিয়ে কখনো কোন আপত্তি ছিলো না রাহাতের। অল্প বয়সেই বুঝতে পেরেছিল পিতৃহীন সংসারটাকে।

একবার ঈদে মায়ের হাতে টাকা ছিলো না। ঈদের আগে স্কুলের সেমিস্টার ফি দিয়ে হাত খালি। সেবার বুঝতে পেরে রাহাত কোন আবদার করেনি, বরং মায়ের পাশে বসে বলেছে, " মা , এই ঈদে আমার নতুন জামা লাগবে না। আমি বড় হলে দেখবে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।" ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেললেন মীনহাজ আরা। মা ছেলের এই কান্না আর ভালোবাসার মহূর্ত ইশ্বর ছারা হয়ত অন্য কেউ সেদিন প্রত্যক্ষ্য করেনি।

দেখতে দেখতে কলেজে ভর্তি হলো রাহাত। খরচটা বেড়েছে তখন। নিজেই দুইটা টিউশনি জোগার করে নিল। প্রথম উপার্জনের টাকায় মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনেছিলো। ভালো কোন শাড়ি ছিলো না মায়ের। পাঁচ বছর যাবৎ দুইটা শাড়ি পড়তে দেখছে মাকে। মীনহাজ আরার চোখের জল সেদিন ছেলের উপার্জন করা শাড়িতে ফোঁটায় ফোঁটায় পরেছিল। তার স্বামীর মৃত্যুর পরে এতখানি আনন্দ সে আর পায়নি।

বড় ভাইদের কাছ থেকে জোগার করা পুরনো বই দিয়ে বছর পার করলেও এয়ার ফাইনালে কলেজের ফি জোগাড় করতে বাঁধে ঝামেলা। কেমেস্ট্রির টিচার রাহাতের প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন। প্রিন্সিপালকে বলে হাফ ফ্রি করে দেন তিনি। এভাবেই কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পদার্পন করে রাহাত।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ইন্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয়। ছোট খাট একটা জব হয়ে যায়। ইশ্বর তখন মুখ তুলে তাকাতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় বর্ষে পরিচয় হয় জেনি নামের আধপাগল এক মেয়ের সাথে। চঞ্চল ছটফটে বড় ঘরের মেয়ে। বাবা নামিদামী ব্যাবসায়ী। কিন্তু অহংকারবোধ এই মেয়েটার মাঝে ছিলো না। খুব সাধারন চলাফেরা আর হাশিখুশি প্রানবন্ত।

ফ্রেন্ড সার্কেলে সবসময় চুপচাপ আর মাথা নিচু করে থাকা রাহাতের প্রতি জেনির কিউরিসিটি দিন দিন বাড়তে থাকে। প্রথম থেকে এই ছেলে নিজে থেকে কিছু বলে না, শুধু শুনেই যায় আর কপাল ভাজ করে কি যেন ভাবতে থাকে। জেনি যখন নিশির কাছে রাহাতের সম্পর্কে জানতে পারলো তখন জেনির মাঝে একটা আবেগের জন্ম হয়, সেই আবেগ হয়ত ভালোবাসায় বদলে ছিলো।

একসময় জেনি নিজে থেকেই রাহাতের গায়ে পরে আলাপ শুরু করে। এই ব্যাপারটা অস্বস্তিকর ছিলো রাহাতের কাছে। কত বড় বেহায়া মেয়েরে বাবা! রাহাত প্রয়োজনের বাইরে কথার উত্তর দিতো না। রাহাতের নীরবতা জেনির প্রেমের গভীরতা দিয়েছিলো। একদিন বন্ধুদের আড্ডায় জেনি সরাসরি রাহাতকে ভালোবাসার কথা বলেই ফেললো। টিউশনির অজুহাত দেখিয়ে রাহাত পালিয়ে যায় সেখান থেকে।

জেনিকে অবশ্য ভালোই লাগতো রাহাতের, মেয়েটার পাগলামি ওকে একটু দূর্বল করেছে ততক্ষনে। কিন্তু বড় ঘরের সুন্দরী আদুরে কন্যার সাথে প্রেম করার সময় কোথায়? মা ছেলের সংসারে উপার্জনের চিন্তা ছারা আর কিছু মনে আনা কি সম্ভব? রাহাত সিদ্ধান্ত নেয় এই মেয়েকে এড়িয়ে চলার।

প্রথম থেকেই জেনি লক্ষ্য করেছে রাহাত ওকে এড়িয়ে চলছে। সেদিন আড্ডায় প্রোপোজ করার পরে রাহাতের নিশ্চুপ চলে যাওয়ার অপমান সইতে না পেরে ড্রয়ার থেকে একপাতা ঘুমের ট্যাবলেট সাবার করেছে। হাসপাতালে দুইদিন টানা ঘুম থেকে চোখ মেলে তাকিয়ে জেনি যখন বন্ধুদের পেছনে মাথা নিচু করে রাহাতকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলো তখন নিজের অজান্তেই এক টুকরো মুচকি হাসি বেড়িয়ে এলো।

জেনির পাগলামীতে বাধ্য হয়েই প্রেম করতে হলো। ছন্নছারা জীবনের নেগেটিভ দিক শত বুঝিয়ে লাভ হয়নি। মোবাইল টপ আপ থেকে শুরু করে প্রায় সব দামি গিফট জেনির কাছ থেকে অনিচ্ছা স্বত্বেও নিতে হতো। নিজের অক্ষমতায় না নিতে চাইলেও জেনির পাগলামী সহ্য করা ছারা উপায় নেই।

এরই মাঝে গ্রাজুয়েশন শেষ হয়ে যায়। জার্মানীর ইউনিভার্সিটি অব ফ্রান্কফুর্ট থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য একটা স্কলারশীপ পেয়ে যায় রাহাত। জেনি তখন বাঁধা দেয়নি। শুধু একটা কন্ডিশন ছিল যে তাকে এন্গেজ করে যেতে হবে। একমাত্র মেয়ের কথা ফেলতে পারেনি জেনির বাবা। ফ্যামিলির মতেই তাদের এন্গেজমেন্ট হয়ে যায়। তিন বছর আগে এক সময় মা আর জেনিকে ছেরে সুন্দর ভবিষ্যতের উদ্যেশ্যে রওনা হয় রাহাত।

ফাইনাল ডেজারটেশন জমা দেয়া হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে জার্মান গভার্নমেন্ট দুই বছরের ইমিগ্রেশন দিয়েছে। এবার হলিডেতে দেশে ফিরছে রাহাত। দেশে ফিরে মায়ের জন্য একটা ফ্ল্যাট কিনবে। নিজের ঘরে মাকে রেখে আসবে। ভাবতেই চোখে পানি চলে আসে রাহাতের।
ঈদের আগের দিন রাতের ফ্লাইট। আর মাত্র দশদিন বাকি। অপেক্ষার দিন যেন ফুরাতে চায় না আর। আকাশে স্বপ্নভেলা উড়ে যেতে দেখলেই আশায় বাঁধা বুকটা নেচে উঠে। কিছুদিন পরে এভাবেই উড়ে যাবে সে মায়ের কাছে, জেনির কাছে।

ইমিগ্রেশন পার করে ভিতরে ঢুকেছে রাহাত। কাল ঈদের দিন সকালে মায়ের সাথে থাকবে। জেনি আসছে এয়ারপোর্টে ওকে রিসিভ করতে। ভাবতেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি। জানালার দিকে তাকিয়ে রাহাত বলেই ফেললো, " মাগো আমি আসছি ফিরে। "


তারপর........










"গ্রীসের উপকূলে বিমান দূর্ঘটনা"
নিজস্ব প্রতিবেদক।

গতকাল রাতে কুয়েত এয়ারওয়েজের একটি বিমান জার্মানীর বার্লিন থেকে কুয়েত সিটি হয়ে ঢাকা আসার পথে যান্ত্রিক গোলযোগের কারনে গ্রীসের উপকূলে মেডিটেরানিয়ান উপসাগরে নিপাতিত হয়। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে বিমানটিতে থাকা দুইজন চালক ও নয় জন ক্রু সহকারে একশ তেইশ জন যাত্রীর সকলেই নিহত হয়েছেন। গ্রীসের কোস্ট গার্ডের তৎপরতায় সমুদ্র থেকে মৃত দেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে এই দূর্ঘটনায় অনেক দেশ থেকে শোক বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। কুয়েত এয়ারওয়েজের তথ্যসূত্রে জানা যায় বিমানটিতে রাহাত আহমেদ নামের একজন বাংলাদেশী যাত্রী ছিলেন।


রাহাতের আর মায়ের কাছে ফেরা হয়নি......।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ১০:২৪
৭৫টি মন্তব্য ৭৫টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×