রাত ৯টায় ক্লাস থেকে বের হয়ে যখন দেখলাম ঝপঝপ বৃষ্টি হচ্ছে তখন ভীষন ভালোলাগা বৃষ্টির উপর আদরমিশ্রিত রাগ হতে থাকে। ছাতা নেই, রেইনকোট নেই। ভার্সিটির করিডোর থেকে গেট পর্যন্ত যেতেই ভিজে চুপসে যেতে হবে। তারউপর দেখাই যাচ্ছে গেট-এর সামনে কোন রিক্সা নেই। যেতে হবে অনেকটা পথ..........নির্জন পথ; একা। মন খারাপ হোতে থাকে আমার। মাঝে মাঝে টের পাই, বাইরে থেকে দেখা বেশ সাহসী এই আমি ভেতরে ভেতরে কতটা ভীতু, একা; নির্ভর করতে ইচ্ছে করে কেউ একজনের উপর....কখনো কখনো। ইদানিং প্রায়ই মনে হয় আমার জন্যে কোথাও কেউ নেই।
আরো অনেক স্টুডেন্ট অপেক্ষা করছে বৃষ্টি থামার। দু্’একজনের সাথে পড়াশোনা নিয়ে আলাপ। সবকিছুর ভেতরেও মনে-মস্তিষ্কে অর্ক-র আনাগোনা। পরশু রাত থেকে ওর উপর আমার মেজাজ খারাপ। প্রথমে কোন কারনে মন খারাপ ছিলো। অভ্যাসবশে সেই মন খারাপ শেয়ার করতে যাওয়া ওর সঙ্গে। বিপত্তি বাধে তখন। এরকম বিপত্তি আরো অনেকবার বেধেছে। তবু আমার শিক্ষা হয়না। আমি ওকে বলবোই আমার সব ভালো লাগা, না লাগা। কিছু করার থাকেনা আসলে আমার। দেখেছি, যখন আমি খুব অস্থির, অর্ক-র সাথে কথা বললে (যদি তখন অর্ক কোনরকম উল্টাপাল্টা না করে) ঝুপ করে আমার অস্থিরতাটা কমে যায়। আর তাই ছুটে যাওয়া ওর কাছে.... বার বার। কষ্ট পেতে ভালো লাগেনা বলে ওর কাছে যাই; আরো বেশি করে কষ্ট পাই। আমাকে কষ্ট দিতে ওর কেন এত ভালো লাগে জানিনা আমি। পরশু রাতে যখন একটা ম্যাসেজ দিলাম, প্রত্তুত্বরে এমন একটা ম্যাসেজ পেলাম যে সাথে সাথে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সেই মেজাজ খারাপ বাড়তেই থাকলো, কারন তাকে কমানোর কোন চেষ্টা অর্ক করছেনা। বরং মেজাজ দেখাচ্ছে উল্টো। ও খুব ভালো করে জানে যে আমি খুব বেশিক্ষন ওর থেকে দূরে থাকতে পারবোনা। কত চেষ্টা করলাম ওর এই ধারনা পাল্টে দেবার। সব বিফলে। হয়না; পারিনা আমি আসলেই। “সত্যিই কি পারিনা? কখনোই? অর্ক?”
আজকের পুরো দিনটা ওর সাথে কেটে গেল কথা না বলে। ভাবা যায়! ভেবেছিলাম অফিস শেষ করে ও ফোন করবে। কিন্তু করলোনা। আমিও করবোনা করবোনা করেও একবার করে ফেললাম....ভুল করে। ওর উচ্ছাসভরা কন্ঠ “আরে তুমি! কি খবর” শোনামাত্র আবার রাগ হোল। এমন ভাব দেখানো হচ্ছে যেন কিছুই হয়নি। “উফ্ ..... এমন কেন তুমি?”। একটু আগে আরেকজনকে লেখা ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিলাম ওকে। সেটা নিয়েও রাগ হচ্ছে আমার নিজের ওপর। ম্যাসেজটাতে একটু মন খারাপ ভাব ছিলো। ওকে তো আমি জানাতে চাইনা কিছুই। বুঝতে দিতে চাইনা গতকাল রাতে কেমন পাগল হয়ে কেঁদেছি আমি। ম্যাসেজটা যে ওকে দিইনি এটা ওকে জানানো উচিত।
“আপু, যাবেননা?” এম.বি.এ-র ক্লাসের জুনিয়র স্টুডেন্ট এর ডাকে ঘোর কাটে।
“হুম, যাবো। কিন্তু রিক্সা তো নেই। রাতও হোল অনেক। কি করি বলো তো?” আমার সত্যিই টেনশন হচ্ছে। রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। যেতে হবে অনেকটা পথ। পথ-টাও হেঁটে যাওয়ার জন্যে সুবিধার না এত রাতে। বিধাতা সহায় হোলেন কিনা বুঝলামনা। ক্লাসের আরেকটি ছেলে তার গাড়ি নিয়ে এসেছে। লিফট দিচ্ছে বন্ধুদের। আমাকে নিয়ে নিলো ফার্মগেট পর্যন্ত লিফট দিতে। গাড়িতে বসেই অর্ক-র ম্যাসেজ। বৃষ্টিতে আটকা পড়েছি জানিয়েছিলাম। সেটা নিয়ে কোন টেনশন নেই। রাগ ঝাড়া হচ্ছে আমার উপর। মেজাজ খারাপ বাড়তে থাকে আমার। আমি জানি বাড়তে বাড়তেই এই মেজাজ খারাপ হঠাৎ করে নেই হয়ে যাবে। জানে সেও।
ফার্মগেট এর এমন জায়গায় নামলাম যেখানে কোন রিক্সা নেই। হাঁটতে শুরু করলাম। মন-মেজাজ খারাপ থাকলে যা হয়। সব কিছুই কষ্ট লাগে। এমনিতে হাঁটতে খারাপ লাগেনা। কিন্তু আজ যেন পা চলছেনা আমার। উপরন্তু পেটের ডান সাইডে প্রচন্ড ব্যথা করছে। বৃষ্টির জোড় কমে এসেছে। ঝিরঝির করে হালকাভাবে ঝরছে। বৃষ্টিকে খারাপ লাগেনা আমার কখনোই। অবশ্য আড়ং থেকে কেনা একেবারে নতুন স্যান্ডেল-টার জন্য একটু মায়া হচ্ছে। এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও স্যান্ডেল-এর জন্যে মন খারাপ! মনে মনে হাসি-ই পেল। পেট চেপে ধরেই হেঁটে যাচ্ছি ফুটপাথ ধরে। চলে এসেছি চন্দ্রিমার মোড়টাতে। একটু দাঁড়ালাম। যদি কিছু পাওয়া যায়। নাহ কিচ্ছু নেই। আবার হাঁটা শুরু। হঠাৎ একটা মোটর বাইক ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে।
“হেল্প লাগবে আপনার”।
এদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা কোন মেয়ের জন্যেই স্বস্তির না। আমিও ঘাবড়ে গেলাম। কথা না বলে হাঁটতে লাগলাম। আবার পাশে বাইক “হেল্প লাগবে ম্যাডাম?” অজান্তেই আমার পেট থেকে হাত সরে গেল। ব্যথা ভুলে গেলাম। ভয়েই কিনা কে জানে। বললাম “থ্যাঙ্কস, হেল্প লাগবেনা।“ বাইকে বসা ছেলেটা পোশাক-আশাকে ভদ্র। হেলমেট পরা থাকায় মুখতো পুরোটা দেখা যাচ্ছেনা। এই ফুটপাথ কখনোই লোকারন্য থাকেনা। আমার ভয় হতে লাগলো। বাইকের সাথে তো আমি পারবোনা। রাস্তা দিয়ে হাঁটবো কিনা ভাবছি। কিন্তু বাইক তো রাস্তাতেই চলছে। বাইকওয়ালা কিছুদুর গিয়ে থেমে থাকে। আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। কান্না পাচ্ছে আমার। অর্ক-র সাথে রাগারাগি হোলেই কোন না কোন অঘটন ঘটবে। এর আগে একদিন ছিনতাইকারী আমার কান খামচে দিলো। অর্ক-র উপর রাগ কমতে লাগলো...কোন কারণ ছাড়াই....ওর কোন ভালোবাসা ছাড়াই। খুব কষ্ট হোতে লাগলো।
“তোমার কি কখনো আমার জন্য টেনশন হয়না?”
“তুমি কি কখনো মনে কোরনা ভেতর ভেতর আমি ভীষন ভীরু একটা মেয়ে। অত সাহস আমার নেই যতটা তোমরা ভাবো।“
আলো-আঁধারি ফুটপাথ ফাঁকা। রাস্তা ফাঁকা। সাঁই সাঁই করে একেকটা গাড়ি, বাইক চলে যাচ্ছে। একটা দুটো রিক্সা যাত্রী নিয়ে ছুটে যাচ্ছে। হুড তোলা রিক্সার যাত্রী-রা কয়েক পলক ফেলে দেখে নিতে চেষ্টা করে আমাকে। কি ভাবে কে জানে। কেউ দাঁড়াচ্ছেনা। শুধু কয়েকগজ দূরে পেছনের লাল লাইট জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাইক..............আমাকে হেল্প করবে বলে। পেটের ব্যথাটা টের পাচ্ছি আবার।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৪:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



