শনিবার - ১৮ জুন ২০১১
খাওয়া-দাওয়া সেরে সবকিছু গুছিয়ে বিছানায় যেতে যেতে রাত ১১টা বেজে যায় নীলয় এর। বালিশ-টাকে দেয়ালের সাথে দাঁড় করিয়ে তাতে পিঠ ঠেকিয়ে সিগারেট ধরায়। দিনের শেষ সিগারেট। সিগারেট-এর ধোঁয়ার সাথে মাথায় ঢোকে বর্ণ। সারাদিন থাকে মনে, এই সময় থেকে মাথায়। এখন সমস্ত চিন্তা-ভাবনা শুরু হবে ওকে নিয়ে।
বর্ণ.......বর্ণালী। নীলয় ওকে ডাকে বর্ণ। অবশ্য যখন একা একা বর্ণ-কে ভাবে তখনি। সামনাসামনি ও এখন বর্ণ-কে বর্নালী বলেই ডাকে। পারতপক্ষে নাম-টা ব্যবহার করেনা। কিন্তু যতবার ডাকে, ততবার বর্ণ এমনভাবে তাকায় যেন ওর পৃথিবীতে এইমাত্র একটা ভূমিকম্প হোল। বর্ণ-র কি তখন মনে পরে যায় নীলয় এর সেই কথা....? “তুমি আমার বর্ণ। আমার ভালোবাসার বর্ণমালা। ভালোবাসার অ, আ যে আমি তোমার কাছেই শিখেছি।” বর্ণ-র আহত দু’চোখের দিকে তাকিয়ে নীলয় মুচকি হাসে। নীলয় কেন এটা করে ও নিজেও জানেনা। বর্ণ-কে কষ্ট দেয়ার জন্যে কি? কিন্তু কেন? ওই-তো চেয়েছিলো বর্ণ সরে যাক ওর জীবন থেকে। যখন সত্যিই সরে গেল তখন অবশ্য নীলয় তাল হারিয়ে ফেলেছিলো। তখন ওর মনে হয়েছিলো বর্ণ-কে ছাড়া ওর চলবেনা। সেটা আজ থেকে আরো পাঁচ বছর আগের কথা। অনেকটা সময়। একটা সময় নীলয় নিজেকে সামলে নিয়েছিলো। তারও বছর খানেক পর ওর জীবনে আবার বর্ণ-র আগমন। ততদিনে জীবন তার গতি পাল্টেছে; শাখা-প্রশাখা ছড়িয়েছে। দুজনের সামাজিক নিয়মে এক হবার পথে হাজারো প্রতিবন্ধকতা তৈরী হয়েছে। তাতে অবশ্য কার কি এসে যায়!! বর্ণ-কে ফেরাতে পারেনি নীলয়; শত চেষ্টা করেও পারেনি। ডুবেছে......আবার ডুবেছে সে বর্ণ-র ভালোবাসায়.....যেমন করে ডুবেছিলো পাঁচ বছর আগে। বর্ণ-র ভালোবাসা-কে উপেক্ষা করার ক্ষমতা ওর নেই। কখনো ছিলোনা।
কাল রাতে বর্ণ-কে বড্ড বেশি বলা হয়ে গেছে। রাত তিনটা পর্যন্ত দু’জনে অনলাইনে। অথচ কথা ছিলো বর্ণ-র সাথে চ্যাট করতে করতে নীলয় ঘুমিয়ে যাবে। এটা কখনো হয়?! তাই একটা পর্যায়ে গিয়ে নীলয় এর বেশ রাগ হয় বর্ণ-র উপর। যেন বর্ণ ওর ঘুম কেড়ে নিয়েছে। গত বেশ কিছুদিন ধরে শরীর ভালো যাচ্ছেনা। সেই সাথে ঘুমটা যেন একেবারে ছুটি নিয়েছে। অফিস কামাই হয়েছে গত ১৫ দিন এই শরীর আর ঘুমের জন্যে। আগামীকাল অফিস। কাল রাতের ঘুমটা দরকার ছিলো। তাই একদম শেষ সময়ে বর্ণ-কে বলতে গিয়ে একটু বেশি-ই বলা হয়ে গেছে। সেটা যখন ও বুঝেছে তখন যদিও একটা ম্যাসেজ দিয়েছে। কিন্তু ওতে কাজ হবে বলে মনে হয়না। বর্ণ-টা আজকাল একদম স্ট্রেস নিতে পারেনা। মানসিক জোর কমে গেছে ওর একদমই। তাই বুকের ভেতরটা কেমন খচখচ করে নীলয় এর।
মিষ্টি একটা সুঘ্রান হঠাত করেই নাকে লাগে নীলয় এর। অদ্ভুত তো! আগে তো কখনও এমন ঘ্রাণ পায়নি ও। কিসের? হুম........হাসনাহেনা বলেই তো মনে হয়। আশেপাশে হাসনাহেনা-র গাছ আছে নাকি! চোখে পড়েনিতো। কেমন মদির লাগে নীলয় এর। চোখদু’টো বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। এর মধ্যেও ওর অবাক লাগছে এমন করে ঘুম লাগার জন্যে। আশ্চর্য! কালকেই ও বর্ণ-কে বলছিলো “তোমাদের যে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসে, সেরকম অনুভূতি একবার যদি আমার হোত!” বর্ণ-কে ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে যায় নীলয়।
************************
সন্ধ্যায় ক্লাসের উদ্দেশ্যে বের হয় বর্ণালী। রিক্সার অপেক্ষা করতে করতেই পাশে এসে হাজির হয় তামিম ওর স্পোর্টস বাইক নিয়ে। জুনিয়র ক্লাসমেট। বেশ চটপটে ছেলে। ভালোবেসেছিলো যাকে সে নেই এখন ওর জীবনে। “অমন মেয়ে আসবে যাবে” এই বলে হেসে উড়িয়ে দেয় তামিম। কিন্তু বর্নালী বোঝে তামিম এখনও ভালোবাসে মেয়েটিকে। বর্নালী যে বোঝে এটা বোধহয় তামিম-ও বুঝতে পারে। আর তাই দু’জন যেন খুব দ্রুতই আপন হয়ে যায়।
- হাই আপি। আসো আসো। (হেলমেট খুলে ডাকে বর্ণালী-কে)
কিছু না বলে মিষ্টি হেসে বর্ণালী চড়ে বসে তামিম এর পেছনে। হাওয়ার বেগে ছোটে তামিম। শনিবার। রাস্তা ফাঁকা। তার উপর আবার আগারগাঁও এর রাস্তা। যেকোন হাইওয়ের সাথে যার তুলনা চলে। বর্নালী-র ভালো লাগে বেশ। হালকা করে বাঁধা খোঁপা থেকে বের হয়ে আসা কিছু আলগা চুল উড়ছে যেন বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে।
বর্ণালী-র মনে পড়ে যায় গতরাতে নীলয় এর সাথে চ্যাটের কথাগুলো। চোখ ভিজে ওঠে ওর। নীলয় ঘুমাতে পারছেনা বেশ কিছুদিন ধরে। এত মায়া লাগে বর্ণালী-র। কিন্তু কি করবে ও? ওর তো ক্ষমতা নেই নীলয় এর মাথায় হাত বুলিয়ে, চুল টেনে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কাল রাতে ও চায়নি নীলয় অনলাইনে আসুক। নীলয় বলেছিলো তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে ঘুমানোর চেষ্টা করবে। ঘুম ঘুম করে ছেলেটা পাগল হয়ে গেল। অথচ কাল চ্যাটিং চললো রাত তিনটা পর্যন্ত। একথা সেকথায় বর্ণালী-র একবারও মনে পড়লোনা নীলয়-এর ঘুমাতে হবে। আর সেটাকে নীলয় আরো এমনভাবে বুঝিয়ে দিলো যে ভীষণ হাসি-খুশি ভাবে শুরু করা চ্যাটিং বর্ণালী-র শেষ হোল কাঁদতে কাঁদতে। শেষদিকে নীলয় লিখে গেছে, আর বর্ণালী চোখের পানি মুছতে মুছতে শুধু পড়েছে। কিছু লিখতে পারেনি। নীলয় এর শেষের কথাগুলো .....
- আমার খুব অবাক লাগছে! সত্যিই আমি খুব অবাক হোলাম আজ।
- তুমি জানো আমার শরীরটা ভালো নেই। তুমি জানো গত কয়েকদিন ঘুমের জন্যে আমি কি করেছি।
- আমি ভেবেছিলাম আমার ঘুম নিয়ে টেনশন তোমার মধ্যেও আছে, এত ফিলিংস যার আমার জন্যে!
- আমি খুব অবাক হলাম বর্নালী। তুমি জানো ঘুমের অনিয়মের জন্য অপু মরতে বসেছিলো?
- তুমি খুব স্বার্থপর। সেই প্রথম থেকেই। সবসময় নিজের ইচ্ছেটাকেই গুরুত্ব দাও তুমি।
অপু নীলয় এর ছোট ভাই এর মত। বর্নালী-র বুকের ভেতরটা ভেঙ্গে যেতে চায় কাল রাতের এসব কথা মনে পড়ে। কতদিইইন নীলয় ওকে ‘বর্ণ’ বলে ডাকেনা। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। নীলয় ঠিকই বলেছে, সবসময় ও কেবল নিজের ইচ্ছেটাকেই গুরুত্ব দেয়। কাল রাতে কথা বলতে ভালো লাগছিলো বলেইনা ও ভুলে গেল নীলয় এর ঘুমের কথা। নিজের গালে চড় মারতে ইচ্ছে করে বর্ণালী-র। অথচ মনে মনে কতভাবেইনা ও নীলয় এর ঘুম কামনা করে। নীলয় যে ওর কি, সেটা কি বিধাতাও বোঝেনা?! কি যে ইচ্ছে করে ওর নীলয় এর দু’চোখের পাতায় রাজ্যের ঘুম এনে দিতে। একটা রাত, অন্তত একটা রাত যদি ও ছেলেটাকে একটু শান্তিমত ঘুম এনে দিতে পারতো! কত কি যে উথাল পাথাল করে বর্ণালী-র বুকের ভেতর। কাল রাতে পরে নীলয় ওকে ম্যাসেজ দিয়েছে যেটা পেয়ে বর্নালী বুঝেছে ওর মন কেমন করছে বুঝেই নীলয় এর ওই ম্যাসেজ।
চীন-মৈত্রী’র মোড়-টাতে এসে হঠাত ওড়নায় হ্যাচকা টান লেগে বর্ণালী পড়ে যায় বাইক থেকে। অন্যমনস্ক থাকার কারণেই কখন ওড়নাটা বাইকের চাকার সাথে জড়িয়েছে খেয়াল করেনি। বাইক চলছিলোও খুব দ্রুত। সেই গতির বেগেই বর্ণালী পিছলে কঠিন পিচঢালা রাস্তার একেবারে মাঝখানে গিয়ে পড়ে। আর তখনি বাইক-এর চাইতেও দ্রুত গতিতে ধেয়ে আসা একটা লোকাল বাস সাঁ করে চলে যায় ও-র উপর দিয়ে। হতভম্ব তামিম কোনমতে বর্ণালী-কে নিয়ে হসপিটালে যায়। ভীষণ কমন রক্তের গ্রুপ ‘বি’ পজেটিভ আজ দুস্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। রাত ১১টায় কর্তব্যরত ডাক্তার বর্ণালী-কে মৃত ঘোষনা করেন।
************************
রবিবার _ ১৯ জুন ২০১১
নীলয় পেপার পড়েনা। তাই অন্যান্য দিনগুলোর মত আজও ওর জানা হোলনা গতকাল দেশের কোথায় কি ঘটেছে, কে কোথায় রাজ্য উদ্ধার করেছে বা আরো সাত-সতেরো। এমনকি পত্রিকার শেষ পাতায় ছোট্র করে ছাপা হওয়া চীন-মৈত্রী’র মোড় এর বাইক এ্যাক্সিডেন্টের খবরটা নিয়ে যখন ওর দুজন মহিলা কলিগ আলাপ করছিলেন মৃত তরুনীর অসতর্কতা প্রসঙ্গে, তখন ও খবরটাকে গুরুত্বহীন করে দিলো আরো এমন অনেক দুর্ঘটনার উদাহরণ দিয়ে। অনেকদিন পর অফিসে এসেছে। এমনিতেই কাজের চাপে ওর নাভিশ্বাস ওঠে। আজতো খবর আরো খারাপ। শরীর এখনো ঠিক হয়নি। কিন্তু কাল রাতের গভীর ঘুমটা ওকে একেবারে চাঙ্গা করে দিয়েছে। বর্ণ-কে একটা ম্যাসেজ দিলো “কেমন আছো? কাল রাতে তুমি কি আমার ঘরে এসেছিলে? এমন মিষ্টি ঘ্রান তো একমাত্র তুমি এলেই আমার ঘর জুড়ে থাকে যা আমি কাল রাতে পেলাম! তুমি কি আমায় ঘুম পাড়াতে এসেছিলে বাবুসোনা?” শেষের শব্দটা নীলয় ইচ্ছে করে জুড়ে দিলো। জানে এই শব্দটা পেলেই হাসি ফুটবে ওর ভালোবাসা’র ঠোঁটে; নীলয় এর দুষ্টুমির কথা মনে করে হাসি। কাজের চাপে ডুবে গেল নীলয় পুরোপুরি। কোনদিকে আর খেয়াল থাকলোনা ওর। থাকলে হয়তো দেখতো বর্ণ-র কোন রিপ্লাই আসেনি, যা একেবারেই অসম্ভব একটি ঘটনা।
বিকেল সাড়ে পাঁচটায় অফিস থেকে বের হয়ে হাঁটতে থাকে নীলয়। সারাদিন বর্ণ-র কোন খোঁজ নেই। একটা অবসাদ ওকে ঘিরে রাখে। ফোন করতে ইচ্ছে করেনা, ম্যাসেজ দিতেও না। বাসায় ফেরে রাত আট-টায়। ভাত-টা রাইস কুকারে চাপিয়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায় ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্যে। তরকারী সব ফ্রিজে আছে। খাওয়া শেষ করে একবার ঢু মারে ইয়াহু’র মেইল বক্সে। নাহ....কোন মেইল করেনি বর্ণ। এতটাই মন খারাপ করেছে। অনলাইনেও তো নেই। ল্যাপটপের সময় এর দিকে চোখ যেতেই দেখে রাত ১১টা। ল্যাপটপ শাট ডাউন দিতে দিতেই আবার সেই হাসনাহেনা-র ঘ্রান। যাহ....খেয়ালই করা হয়নি হাসনাহেনা-র গাছটা আছে কোথায়। বিছানায় শুয়ে দিনের শেষ সিগারেট-টা ধরাতে গিয়েও আবার রেখে দেয় নীলয়। বর্ণ-টা সেই প্রথম দিকে সিগারেট ছাড়তে বলতো খুব। এখন অবশ্য এটা নিয়ে জেদ করেনা। বড় হয়েছে বলে দাবী করে বর্ণ। ভালোবাসার প্রগাঢতা অনুভব করে নীলয় বুকের গভীরে। ঘুমে দুচোখ বন্ধ হয়ে আসছে। দুচোখের পাতায় অদ্ভুত এক মাদকতা; মনে হয় কেউ যেন তার নরম ঠোঁট ছুঁয়ে দিচ্ছে। আহ! কতদিন পর! কত্তদিন পর এমন ঘুম আমার চোখে। “বর্ণ.....তোমার নীলয় এর চোখে কোথ্থেকে এত ঘুম আসছে...............”
গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় নীলয়।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৪:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



