আপনি কি করতেন?
০৩ রা জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৫:৪৫
মা যেদিন যে সময় থেকে বিধবা হলো সেই খবরটা আমি পেয়েছিলাম আমাদের পরিবারের অন্য সব সদস্যের পরে। আমার বাবা মারা গেছে সকাল ১০.২৯ মিনিটে। আর আমি খবর পেলাম অথবা পেলাম না, নিজেই আবিস্কার করলাম যে বাবা হয়তো আর জীবিত নেই। আমি যখন দীঘিরজান বাজার ক্রস করে হেড স্যারের বাড়ি ছাড়িয়ে ফাঁকা জায়গাটা মারাচ্ছি, তখন দেখা হল বাপ্পীদা'র সাথে। বাপ্পীদা জাল মেরে খালে মাছ ধরছিল। জিজ্ঞেস করল- কাকু এখন কেমন আছেন? আমি বুঝতে পারিনি যে, বাবার চলে যাওয়ার খবরটি বাপ্পীদা'ও জানে, অথচ আমি জানি না। আমার হাতে তখন বেশ কিছু অষুধ বাবার জন্য। একটা ইনজেকশান নাজিরপুর পাওয়া গেল না বলে ওটা খুলনা থেকে কতো তাড়াতাড়ি আনানো যায় সেই ব্যাপারে আমি তখনো উদ্বিগ্ন। বাপ্পীদা বলল- ঠিক আছে, যাও, দেখো আনাতে পারো কিনা। আমি পা বাড়াই। দেখি- সেজো দুলাভাই হন্তদন্ত হয়ে আমাকে ক্রস করছে। জানতে চাইলাম- এখন কি অবস্থা? দুলাভাই আমার চোখের দিকে তাকালো না। জবাবে বলল- একই রকম। দুলাভাই কখনোই আমার সাথে মেজাজ দেখিয়ে কথা বলে না। তার কখায় আমি কিছুটা মেজাজ, কিছুটা লুকোচুরি অথবা কিছুটা খেই হারানোর সুস্পষ্ট লক্ষণ পেলাম। কিন্তু আমি একটা জিনিসের তখন অর্থ বুঝিনি- দুলাভাই কেন একটা ৫০০ টাকার নোট এক হাত থেকে অন্য হাতে লুকানোর চেস্টা করল? অথচ নোটটি আমিও দেখে ফেলেছি। সে লুকানোর ব্যর্থ চেস্টা বা কেন করল?
দূর থেকে তখন মাইকে যে কণ্ঠস্বরটি ভেসে আসছিল, সেটি আমার পরিচিত এক বন্ধুর কণ্ঠস্বর। কণ্ঠস্বরটি কি বলছে, আমি তা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনার চেস্টা করেও পারলাম না। ঠিক নামটা যখন বলে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় না। হয়তো মাইকে ঘোষণা হচ্ছে ভ্যানগাড়িতে ঘুরেঘুরে। তাই কণ্ঠস্বরটা কাঁপাকাঁপা। ঠিক নামটা বলার সময় আমি আর স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি না। কিন্তু ঘোষণাটা একটি মৃত্যু সংবাদ প্রচার করছে। প্রচারক আমার বাল্যবন্ধু স্বপন। স্বপন বলছে যে- মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে আজ বিকাল ৫:০০টায়।
আমি তখনো খুলনা কিভাবে শর্টকাট যাওয়া যায় বা কাকে পাঠানো যায়, তাই ভাবছি আর বাড়ির দিকে এগোচ্ছি। পরান মৃধার বাড়ি ক্রস করলে একটু সময়ের জন্য মাঠের মধ্যে আমাদের ফাঁকা বাড়িটা দেখা যায়। দেখলাম গত কয়েকদিনের মতো আজও দলে দলে লোক আমাদের বাড়ি ভিড় করছে। কেউ আমাদের বাড়ি ঢুকছে, কেউবা বের হচ্ছে। হালদার বাড়ি ক্রস করলে বাকি পথটা একেবারে ফাঁকা। আমার বাবা খুব অসুস্থ। তাকে দেখতে দলে দলে লোক আসছে, যাচ্ছে। কিন্তু এখন যারা আসছে, যাচ্ছে, তারা কি দেখে যাচ্ছে বা কি দেখতে আসছে?
হঠাৎ আমার মা'র কথা মনে হলো- আচ্ছা আমার মা'র মনে এখন কি অবস্থা? মা কি করছে? কারণ, আমি ঢাকা থেকে ফিরে মা'র সাথে বলতে গেলে কথাই বলা হয়নি। আমি মনে মনে বিকালে খুলনা যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। বাবার ইনজেকশান আনতে হবে। আর যাবার আগে মা'র সাথে একটু কথা বলার ইচ্ছা।
ফাঁকা মাঠ পাড়ি দিতে কয় মিনিট লাগল? আমি আমাদের বাগান, পুকুর পাড় হয়ে বসত ঘর আর রান্নাঘরের মাঝখান থেকে চুলার উঠোনে প্রবেশ করা মাত্র মাকে পেলাম। আমার মা তখন সদ্য বিধবা হওয়া একটা শিশু। আমার বুকে হামলে পরল। আমার বাবার মৃত্যু খবরটি আমাকে কেউ দেয়নি। আমি মা 'কে বাবার কাছে নিয়ে গেলাম। দেখি বাবা খাটে নয় মাটিতে শুয়ে আছে। দিনটি ছিল শুক্রবার। তারিখ ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬।
বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
নীল-দর্পণ বলেছেন:
জান্নাতুল ফেরদাউসে হোক তার ঠিকানা
নতুন রাজা বলেছেন:
আল্লাহ আপনার বাবাকে বেহেশত নসীব করুন... আমীন...
বিপ্লব রহমান বলেছেন:
কেনো এতো মন খারাপ করে দিন স্যার?
পানকৌড়ি বলেছেন:
চশমাটা তেমনি আছে,আছে লাঠি ও পাঞ্জাবী তোমার.................. সত্যি সত্যিই আছে,আমাদের বাবার ব্যবহার করা সব জিনিসগুলো এখনো রেখে দিয়েছি । বাবা মারা গেছেন সেই ১৯৮৬ তে । যখন আমি ক্লাস থ্রি তে পড়তাম ।মন খারাপ করে পোষ্ট............. মাইনাচ ।
রেজা ঘটক বলেছেন:
আমার বাবার একটা জিনিস আমার কাছে আছে। বাবার শীতের মাফলার। ওটা আমি মাঝেমাঝে বের করে দেখি। আর ওর গন্ধ নেই।আর তখন আমার প্রিয় বন্ধুর কথা খুব মনে পড়ে।আমার বাবা ছিল আমার প্রিয় বন্ধু।
লুথা বলেছেন:
জান্নাতুল ফেরদাউসে হোক তার ঠিকানা
সাধারণমানুষ বলেছেন:
জান্নাতুল ফেরদাউসে হোক তার ঠিকানা
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














