প্রত্যেক মাসের অমাবস্যার রাতে আমাদের মধুমতী নদীর তীর ধরে একটা কাল বিড়াল ঘুরঘুর করে। মুরব্বিরা বলেন, ওটা নাকি কাল বিড়াল নয়, ওটা আসলে একটা ভেউ। কেউ একা একা গভীর রাতে ওই পথ মারালে তার আর রক্ষে নেই। আমার সেজো কাকা একবার গভীর রাতে মধুমতী দিয়ে নাও বেয়ে একা একা যাচ্ছিলেন। সময়টা ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের অমবস্যার রাত। আমরা সে বছর আমাদের এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। আমার কাজিন কালামও আমার মতো পরীক্ষার্থী। ৬ মার্চ বৃহস্পতিবার আমাদের পরীক্ষা শুরু। প্রথম দিন বাংলা প্রথম পত্র ও বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। আমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোনো কমতি নেই। কালাম ছাত্র হিসেবে আমার চেয়ে একধাপ পিছিয়ে থাকায় ও ভোররাতে উঠে পড়া ধরল। যাতে দুর্নামটা কিছুটা কমানো যায়। আমাদের ছোট দাদী মানে আমার দাদুর ছোট গিন্নি, আমরা যাকে বু ডাকি, তার ঘুম খুব পাতলা। গাছের পাতা নড়লেও বু তা টের পান। কালামকে ভোররাতে ওঠার ব্যাপারে বু-ই বেশি সহযোগিতা করেন। কালাম উঠতে না পারলে বু ডেকে দেন। কালামের অভ্যাস হলো খুব শব্দ করে পড়া। ওর পড়ার শব্দ শুনে চুপচুপি আমিও উঠে পড়ার অভ্যাস করলাম। ভোররাতে আমাদের পাশাপাশি ঘরের মুখোমুখি দুটো বারান্দায় দুটো হেরিকেনের আলো নিভুনিভু জ্বলছে। তার মধ্যে সেজো কাকা উঠানে এসে চিৎকার করে পড়ে গেলেন। আমরা প্রথমে এ ওর নাম ধরে ডাকাডাকি করে ভয় তাড়ানোর চেস্টা করলাম। কিন্তু চিৎকারটা কে করছে বুঝতে পারলাম না। বু আমাদের থামালেন। বললেন- হেরিকেন নিয়ে শিগগির উঠানে নাম। পাশের ঘর থেকে কালাম আর বু নামলেন দেখে আমিও দরজা খুলে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এই সময় দেখি আমার পিছনে বাবা দাঁড়িয়ে। আমার আগেই বাবা উঠানে পা বাড়ালেন।
তারপর হাতে হাতে সেজো কাকাকে ধরে সবাই ঘরে তুলল। কাকা ভীষণ ভয় পেয়েছেন। বাবা জানতে চাইলেন- তুই কোন পথে আইলি? সেজো কাকা শুধু বললেন- বাঁশবাইড়ার হাট কইরা ভাইজোড়া দিয়া। বাবা আরো প্রশ্ন করলেন- দেখলি কি?
- কালো বিলাই।
- কোতায় দেখলি?
- বাঘাজোড়ার মুখে।
- গাঙে আর কোনো নাও ছিল?
- না, আমি একাই আছিলাম মিঞাভাই।
- তোরে না কইছি, রাইত বেরাইত একা একা নাও বাইস না।
- কইছিলেন, কিন্তু বাঁশবাইড়ার হাটে বেচাকেনা ভালো।
- এতো রাইত কইরা ফিরলি ক্যা?
- কাইল বাবুরহাট করব বইলা।
- খালি বিলাই দেখলি?
- মিঞাভাই, এই দেখেন আমার গায়ের লোম খাড়া হইয়া যাইতাছে।
- ক্যা, কি দেখলি?
- বিলাইটা পাড় লইলা হাঁটতে আছিল। মাঝেমাঝে মেও মেও করতেছিল।
- তারপর?
- মুই ছুরা কালাম পইড়া বুকে ফূঁ দেলাম ঘনঘন। মনের ভয় আর যায় না।
- তারপর?
- ফাঁকেফাঁকে কুলের দিক চাই। বিলাই কুল লইয়া হাঁটতে আছে।
- তো তোর সমস্যা কি?
- আমি ওরে বইঠা উচাইয়া একবার তাড়াইতে গেলাম। অমনি সে বিলাই থেইকা জানোয়ারে রুপ নিল। আর কইতে পারুম না মিঞাভাই। আমি যা দেখছি, তা আর কওনের পারুম না।
তারপর আমরা বাবার তাড়া খেয়ে যারযার ঘরে গেলাম। বাকিরাত ঘুমাইছি কিনা এখন আর মনে পড়ে না। সকালে সবাইরে কইতে শুনলাম-
কালো বিলাইটা নাকি জানোয়ারে রুপ নিয়ে মধুমতীর দক্ষিণ পাড়ে বাঘাজোড়ার দিকে এক পা রাখছিল, আর আরেক পা ছিল নাকি মধুমতীর উত্তর পাড়ে মালিখালীর ইস্কুল বরাবর। বিশাল আকাশ সমান শরীরটায় নাকি কোনো মাথা ছিল না। কালো বিলাইর দু'পার নিচ থেকেই নাও ক্রস করার সময় নাকি সেজো কাকার বুকের মধ্যে ধরফর করে উঠেছিল। প্রচণ্ড জোড়ে নাকি একটা বাতাসও ওই সময় ঝড়ের মতো সারা মধুমতীতে তুফান তুলেছিল। সেজো কাকার নাও নাকি অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল। আর তা সম্ভব হয়েছিল নাকি সেজো কাকার অনবরত সুরা-কালাম পড়ার কারণে। সুরা-কালাম না পড়লে নাকি নাও এমনিতেই ডবে যেতো।
বাঁশবাড়িয়া থেকে মধুমতী সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে মাটিভাঙ্গার কাছে পূবদিকে বাঁক নিছে। আর পশ্চিম দিকে মধুমতী থেকে ছোট বলেশ্বর সোজা চলে গেছে বাংলাবাজারের দিকে। মধুমতী আর বলেশ্বরের মোহনায় আমরা কখনো নামার দুঃসাহস দেখাতাম না। দক্ষিণের মধুমতীর বাকি পথটুকু কেবলই চওড়া থেকে চওড়া। এপার থেকে খালি গলায় ডাকলে ওপার থেকে শোনা যায় না। এমনকি নদী থেকে কেউ ডাকলে বেড়িবাঁধের ভিতর পাশের বাড়িঘর থেকেও সেই ডাক শোনা যায় না। অতএব, সোজা কাকারও কাউকে ডাকার সুযোগ ছিল না। কালো বিলাইর অমন অদ্ভুদ কাণ্ডকারখানা ঘটানোর পর বাকিপথটুকু সেজো কাকা যে একা একা জান বাঁচিয়ে বাড়িতে ফেরত আসতে পেরেছিলেন, তাই নিয়ে আমরা তখন তুমুল বিতর্কে লিপ্ত। আমাদের তখন ধারণা ছিল- আমাদের বাড়িতে সবচেয়ে দুঃসাহসী লোক হলেন সেজো কাকা।
তারপর দেখতে না দেখতে সেজো কাকা বিছানায় পড়লেন। নানান ওঝা-বদ্দি-কবিরাজ-ডাক্তার-হাসপাতাল ঘুরে মার্চের এক তারিখে সেজো কাকাকে আমরা চিতলমারী থেকে প্রথমে নায়ে করে বরইবুনিয়া পর্যন্ত আনি। বাকি পথ বিশেষ কায়দায় মইয়ের উপর সেজো কাকাকে শুইয়ে দিয়ে আমরা ঘাড়ে করে বহন করে বাড়ি পর্যন্ত আনি।
দলে দলে হাজার হাজার মানুষ আসা শুরু করল সেজো কাকাকে দেখতে। সবার মুখেই তখন একই কথা। বাঁচবে না। দেখতে না দেখতে আমাদের বাড়িতে সবচেয়ে তাগড়া জোয়ান সেজো কাকা কেমন হাড্ডিসার হয়ে গেলেন। বিছানায় তখন শুধু সেজো কাকার হাড়গোড় গুলো শুয়েছিল। বুধবার ৫ মার্চ ১৯৮৬ বিকাল সাড়ে চারটায় সেজো কাকা মারা গেলেন।
পরদিন সকালে আমাদের এসএসসি পরীক্ষা শুরু। সারারাত সবাই গবেষণা করে যে সিদ্ধান্ত দিলেন তা হলো- কালামের পরীক্ষা দেওয়ার দরকার নেই। সেজো কাকাকে মাটি দিতে দিতে রাত দেড়টা দুইটা বাজল। আমরা কেউ সেই রাতে ঘুমোতে পারিনি। সকালে ঢুলুঢুলু চোখে আমি পরীক্ষা দিতে গেলাম। কালাম গেল না মুরব্বীদের নির্দেশ মানতে গিয়ে। পরীক্ষার হলে অপরান্থে আমার বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা চলছে। মাঝে মাঝে ঘুমে আমার কলম থেমে যাচ্ছিল। সবশেষে লিখছিলাম রচনা। পৌঁষ-পূর্ণিমা। সেই রচনায় সেজো কাকার দেখা অমাবস্যার রাতের কালো বিলাইকে আমি পৌঁষ-পূর্ণিমায় আবিস্কার করার ব্যর্থ চেস্টা করেছিলাম। কালো বিলাইটাকে সেদিন কিছুতেই ধরতে পারিনি। কালো বিলাই একবার মধুমতীর দক্ষিণ পারে যায়, একবার উত্তর পারে। কালো বিলাই ধরতে না ধরতেই প্রথম দিনের পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বেজেছিল। আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। অন্য রচনা লিখলে নিশ্চিত বেশি নম্বর পেতাম। তবুও সেজো কাকার দেখা অমাবস্যার সেই কালো বিলাই আমি পৌঁষ-পূর্ণিমায়ও ধরতে না পারার বেদনা আজও আমার বুকের মাঝে বাজে। আহা, কালো বিলাইটাকে যদি ধরতে পারতাম, ওকে শুধু একটা প্রশ্নই করতাম- সেজো কাকাকে তুমি কেনো ভয় দেখিয়েছিলে? তুমি কি জানো কালো বিলাই, তোমার ভয় দেখানোর কারণে আমার কাজিন কালামের আর পড়াশুনা হয়নি।
আলোচিত ব্লগ
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এমন কেন?
একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।
শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।