somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নোটবুক: ২৮ আগষ্ট ২০০৮

২৯ শে আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কাগজের নৌকা

বটবৃদ্ধটি বলে হাসে; জেবনডা বড়ো শীতকাল
তার কেশর ছুতে গেলে সে একটি পাখির শরীর
ভয় লাগে, তাই হাঁটছি, ভয়টাকে জড়িয়ে ধরতে
ওর শরীরটা কী রূপ? আমি তার গন্ধ নিতে চাই


বোকা, করুণ, মন খারাপ করা সন্ধ্যার মতো দিন। ভোরে, তুমুল বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙল। ঘুমের ভিতর থেকে উঠে, জানালাটার পর্দাটা সরিয়ে, সময় দেখি। কতো ভোর হবে এখন। বৃষ্টির মধ্যে, বৃষ্টির ভেতরে সময় খুঁজতে খুঁজতে, ধাধা লাগে। দেখতে দেখতে, আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতেই, বেলা বাড়ে। কী ঘনঘোর শেষ বেলার অন্ধকারের মতো আলো। আর বৃষ্টি।

সেই মন খারাপ করা দিনের প্রায়ান্ধকারের ভিতর, একটি শান বাধানো পুকুর ঘাট। তার উপরে একটি দশ বারো বছরের ছেলে, কার সাথে অভিমান করে, পানিতে পা ডুবিয়ে, বসে আছে একা। বৃষ্টিতে ভিজছে। তার মুখ দেখা যায় না, এমন অন্ধকার হয়ে আছে দিন। একটি প্রাচীন হিজল গাছ, ডালপালা ছড়িয়ে তার চারপাশে ভূতের মত দাঁড়িয়ে আছে।

ছেলেটি একটি নীল কাগজের নৌকা ভাসাল বৃষ্টির পুকুরে। ভাসিয়ে নামতা পড়ছে, এক একে এক, দুই একে দুই, তিন একে- । বৃষ্টিতে নাচছে নৌকা। নাচতে নাচতে, নাচতে নাচতে, একসময়, নৌকাটি ভিজে জবজবে হয়ে যায়। নৌকাটি ডুবে যাচ্ছে। হায়, ডুবে যাচ্ছে নৌকা - ছেলেটি নামতা ভুলে গিয়ে পানিতে নেমে গেল- বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টি তারপরও পড়তেই আছে।

বুকে থম ধরিয়ে দেয়া এই দৃশ্যটি, আমার মনে পড়ে। তারপর কোথায় যে হারিয়ে যায়! আমার মনেই পড়ে না।



শুভ্র আসে না আর

বিকেলপাড়া, তার মানে এখন বাড়ি যাবার প্রস্তুতি।
তুমি এখনো কাপ আর পিরিচ নিয়ে চড়ুইভাতি খেলছ
ভাবছ; কোন ঘরে কোন রঙ দেবো। সাজঘরটা কোনদিকে?
এদিকে বিকেলতো হয়ে এলো।
মেহেদীর বাটি নিয়ে এসো,
তোমাকে সাজাই,
তুমি যাবে না?


শুভ্র'র বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। বাড়ির লোকেরা বলেছে, ওকে অনেকদিন এই তল্লাটে দেখা যায়নি। বাড়ির লোক বলতে দুজন। ওর স্ত্রী আর মা। কী এক অদ্ভূদ কারণে ওরা দুজনেই এখন শাদা বসন পরতে শুরু করেছে। আগে ওর মা পরত শাদা থান কাপড়ের শাড়ী। কী যে শুভ্র লাগত ওঁকে। এখন শুভ্রর বউটাকেও ওর মায়ের মত লাগে, সকালের মত অদ্ভূত শুভ্র! বউটা ছিল খুব ছটফটে, এরকম শান্ত স্বভাব কখনো ছিল না তার।

শুভ্র'র কথা জিজ্ঞেশ করতেই ওর বউটার চোখে একটু দীপ্তি দেখা গেল। বেশ শান্ত। বলল, আপনাদের আড্ডাটা এখন আর জমে?

আহ, সে-ই আড্ডা।

আমরা পাঁচজন ছিলাম সেই দলে। আমি, মহিমা, আসিফ, অরু আর রুশো। শুভ্র মাঝে মধ্যে আসত। সে বেশ কদাচিত। সে আসলেই একটা অদ্ভূত কাণ্ড হয়ে যেত আমাদের মধ্যে। কী যেন হত, ঠিক বর্ণনা করা যায় না। আমাদের আড্ডার চায়ে লাল নীল সবুজ অনেক রঙ খেলত, কিন্তু সে আসলেই সমস্তটা শুভ্রতায় পরিপূর্ণ হয়ে যেত। শাদা পাঞ্জাবী আর পাজামা পরনে থাকত ওর- ধবধবে শাদার মধ্যে নীল দিয়ে ধোয়া। ঠিক কবির মতো, ওর কাঁধে একটি ছোট্ট ঝোলা ঝুলত সব সময়। ঝোলার ভিতর অনেক জিনিশ। ওর ভবগুরে জীবনের সম্পত্তিগুলি। একটি শাদা ডায়েরী, যার পৃষ্ঠাগুলি খুলে মাঝে মধ্যেই সে আমাদেরকে নিজের ছোট ছোট অনুভূতির কথা পড়ে শোনাত। মহিমাটা বিরক্ত হতো বেশ। আসিফ আর রুশোও খুব বেশী মনোযোগী হতো না। আড্ডাটার রঙ পাল্টে গেলো- সেই শোকে ওরা আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়ত। আমিও যে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম তা না। কিন্তু, শুভ্রকে আমার অসম্ভব ভাল লাগত। অরুও খুব পছন্দ করত শুভ্রকে। কিন্তু অরু কখনোই এই কথাটি শুভ্রকে উচ্চারণ করে বলেনি।

মহিমার একটা চমৎকার টি-পট ছিল, যার মধ্যে চা রাখলে অনেকক্ষণ গরম থেকে যায় চা। সে সবাই-র মধ্যে চা বিতরণ করত। অরুকে বলত, অরু, তোর কাপটা দে। আড্ডায় আসার সময় আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের উপকরণগুলি নিয়ে আসতাম। অরু হেসে দু'টি কাপ বাহির করে দিত ঝোলা থেকে। দ্বিতীয়টি শুভ্র'র জন্য। মহিমা ভ্রুকুটি করত, শুভ্র, তোরটা বার কর তাড়াতাড়ি। শুভ্র মৃদু হাসত। বার করে দিত। ওর কাপ মানে একটি সৌখিন বাঁশের ঘটি। অরু মহিমার দিকে চোখ বড় করে বড় অভিমান ভরে তাকিয়ে থাকত। শুভ্র কিম্বা মহিমা কেউই অরুর এই চোখের দিকে তাকাত না কখনো। মহিমা বরং অরুর দুটি কাপই চায়ে পূর্ণ করে দিত। বলত, অরু, তোর জন্য দু কাপই বরাদ্দ আজ। খেয়ে ফেল। অরু নিঃশব্দে তার জন্য বরাদ্দ একটি কাপ হাতে নিত। শুভ্র পূর্ণ তৃপ্তিতে ওর ঘটিটাতে চুমুক দিতে থাকত। অরুর অতিরিক্ত কাপটি নিয়ে হুটোপুটি পড়ে যেত আমি, আসিফ আর রুশোর মধ্যে।

অনেকদিন হয়ে গেল, অরু আর শুভ্র দুজনেই আড্ডায় আসে না। অরুর কোথায় যেন বিয়ে হয়ে গেছে।

এদিকে শুভ্রর বউটি কেমন শুভ্র হয়ে শুভ্র'র জন্য অপেক্ষা করে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:৫৯
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×