::পুরো লেখাটা বিডিনিউজে::
...রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও প্রকৃতি নির্ধারণের প্রশ্নে সংবিধান হল সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ। যে চরিত্রেরই হোক না কেন, সংবিধান একটি রাষ্ট্রের আরম্ভ-বিন্দুকে বৈধভাবে চিহ্ণিত করার দলিল। এবং একটি কার্যকর সংবিধান মোটাদাগে একটি কার্যকর রাষ্ট্রকে চিহ্ণিত করে, সে সংবিধান গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক যাই হোক না কেন। উপনিবেশিক-অউপনিবেশিক কায়েমি শাসক ও শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ন্যায় বিচার, স্বাধীনতা, সমতা ইত্যকার বিবিধ রাজনৈতিক প্রশ্নে এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের যে সাধ্য-সাধনা-আন্দোলন, ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠনের ঘটনায় তার পরিণত প্রকাশ ঘটে। একই বছরের ১০ এপ্রিল তারিখে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাকে সংবিধান গ্রহণের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্র গঠনে গণ-সম্মতির প্রাথমিক দলিল রূপে গ্রহণ করা হয়। একইসাথে, এই ঘোষণাটিতে ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে রেট্রোসপেকটিভ ইফেক্ট দেয়া হয়, যাতে ঘোষিত রাষ্ট্রের কোন শূন্য মুহূর্ত চিহ্ণিত না হয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর ইতিপূর্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধান রচনার জন্য আওয়ামীলীগের নির্বাচিত গণ-পরিষদ সদস্যদেরকে নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়। বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য নির্বাচিত গণ-পরিষদ সদস্যদের অংশগ্রহণ, এর বৈধতা, এর গণতান্ত্রিক বা গণবিরোধী চরিত্র ইত্যকার সকল বিতর্ককে পাশে রেখে মোটামুটি এই ঘটনাপঞ্জি দেয়ার একটা মূল সূত্র আছে। সেটি হল, রাষ্ট্রের সংবিধান-বিহীন কোন শূন্য মুহূর্ত চিহ্ণিত যাতে না হয় সেই চেষ্টাতে নোক্তা। কারণ রাষ্ট্র কখনো সংবিধানবিহীন থাকতে পারে না। থাকলে রাষ্ট্র থাকে না।
.......................................................
রাষ্ট্র সংবিধানবিহীন থাকতে পারে না। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে ‘রাষ্ট্রে কোন নির্দিষ্ট সংবিধানটি কার্যকর আছে’ এমন প্রশ্ন যদি দেখা দেয় তখন? সর্বসম্প্রতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ঘটনাপঞ্জিতে আদালতকে ব্যবহার করে কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা ও বিতর্ক ঘটে গেছে- যার প্রেক্ষিতে ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কোন নির্দিষ্ট সংবিধানটি কার্যকর আছে সেই কথাটি ঠিক করে বলা মুশকিল। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে, এই মুহূর্তে রাষ্ট্র ঠিক কোন সংবিধানের অধীনে চলছে বা নাগরিকরা ঠিক কোন সংবিধানের অধীনে আদালতে প্রতিকার চাইতে পারে সে বিতর্ক উঠেছে।
.......................................................
মোস্তাক-সায়েম-জিয়াউর রহমান, এদের ক্ষমতারোহনের মূল ভিত্তি ছিল তাদের মুখের কথা, সামরিক আইন বা ফরমান যার কোন সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। ফলত সংবিধানিক বিচারে তাদের ক্ষমতারোহন অবৈধ হতে বাধ্য। এ নিয়ে কারো কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বরং যে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হল সাংবিধানিকভাবে ‘অবৈধ’ একটি ক্ষমতা থেকে উদ্ভূত যে ‘এখতিয়ার’, হাইকোর্টের সেই জুডিশিয়াল রিভিউর এখতিয়ারের ‘সাংবিধানিক বৈধতা’ কীভাবে তৈরি হবে। আবার, যে ক্ষমতাটি সাংবিধানিকভাবে অবৈধ, তার কিয়দ্বংশকে ঠিক কোন এখতিয়ার বলে আদালত গ্রহণ বা ক্ষমা করার ক্ষমতা রাখেন- এটিও জরুরী প্রশ্ন। কারণ, আদালতের এই কাজটির অর্থ হল আদালত সংবিধানে নতুন বিধান সংযোজন করতে ব্রতি হয়েছেন- যার কোন এখতিয়ার আদালতের নেই- বিদ্যমান সংবিধান অনুসারেই। ব্যাপারটিকে এইভাবে বলা যায়, সংবিধানে জিয়ার সামরিক ফরমানের জায়গায় আদালতের জুটিশিয়াল ফরমান স্থলাভিষিক্ত করার কথা বলা হয়েছে। যা মূলত জিয়ার সামরিক ফরমানের মতই পুরোপুরি অসাংবিধানিক। এবং অসাংবিধানিক হলে অবৈধ হতে বাধ্য।
.......................................................
একদিকে সাংবিধানিক বৈধতার হট্টগোল, অন্য দিকে ঠিক এমন মুহূর্তেই পরষ্পর বিরোধী বক্তব্যের ভিতর ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট সংবিধানটি বর্তমানে বাংলাদেশের বৈধ সংবিধান, এই বিষয়টি নিয়ে নতুন বিতর্ক জন্ম নিয়েছে। আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী পুনর্মুদ্রিত সংবিধানটি, নাকি এই রায়ের আগে বহাল থাকা পূর্বেকার সংবিধান- যেখানে পঞ্চম সংশোধনী, সপ্তম সংশোধনী এইসব বহাল আছে? অনেকেই এটিকে চিহ্ণিত করছেন বাংলাদেশের ‘সংবিধান-বিহীন কাল’ হিশেবে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুযায়ী সংবিধান-বিহীন শূন্য রাষ্ট্র অসম্ভব। সাংবিধানিক শূন্যতা মানে রাষ্ট্র রাষ্ট্র হিশেবে সেই পরিস্থিতিতে নিজেকে নির্দিষ্ট করতে পারে নাই। তাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশে নাগরিক অবস্থান থেকে এই বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা দরকার, যে, আমরা ঠিক কোন নির্দিষ্ট সংবিধানের অধীনে আমাদের ‘অধিকার’, ‘আইন’, ‘সুবিচার’ এবং ‘প্রতিকার’গুলো চিহ্ণিত করতে সমর্থ হবো। এ বিতর্কের সাথে, দলবাজির সীমাহীন দৌরাত্ম্যে বুদ হয়ে থাকা অবস্থা থেকে রাষ্ট্র ও তার সংবিধানকে বের করার তাগিদ এবং সংবিধান সম্পর্কিত রাষ্ট্রের গঠন দশা থেকে একটি গণতান্ত্রিক ও কার্যকর সংবিধানের জন্য যে মৌলিক বিতর্কসমূহের জরুরত ছিলো তার নতুনতর সূচনাও দরকার বলে আমরা মনে করি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

