somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বেলুন

১৭ ই এপ্রিল, ২০১১ রাত ৯:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাগজানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল স্যারের নাম সহসা কেহ মুখে আনিত না, দূর্ভাগ্যবশঃত কদাচ তাঁহার চেহারাখানা যদি কাহারো অন্তরে ভাসিয়া উঠিত তাহলে আতংকিত মুখখানা দেখিয়াই বলিয়া দেওয়া যাইত যে অতীতে সে স্যারের হাতে কতখানি ধোলাই সেবন করিয়াছে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মুখে মাঝে মধ্যেই শোনা যাইত, “ আহ! কত পিটুনি খাইছিরে।”

কামাল স্যারকে যতখানি পাষাণ মনে হইত তিনি আসলে ততখানি ছিলেন না। ছাত্রদের সহিত তিনি বন্ধুদের ন্যায় মিশিতেন এবং কখনো কখনো তাহাদের সহিত ক্রিকেট খেলিবার সময় যখন ব্যাট করিতেন তখন অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী বালকগণ তাঁহার গা লক্ষ্য করিয়া জোরে বল ছুঁড়িয়া মনে মনে উচ্চারণ অযোগ্য শব্দমালা আওড়াইত। কামাল স্যারও বিশেষ অদক্ষ ছিলেন না; তিনিও জোরে বল পিটাইয়া জবাব করিতেন। বিরল সুযোগে কেহ কৃতকার্য হইলে তৎক্ষণাৎ সে স্যারের সমব্যাথি হইত কিন্তু খেলা সাঙ্গ হইলে যতদূর সম্ভব পরিচিত দুষ্ট বালকগণকে পাওয়া যাইত তাহাদের সহিত ইহা লইয়া হাসি তামাশার কোন কমতি হইত না।

স্যারও কম যান না, কেউ পড়াশুনায় গাফিলতি করিয়াছে কিংবা ভুলেও কিছু একটা ভুল করিয়াছে তো তার আর রক্ষা নাই, সঙ্গে সঙ্গে বেত আনিয়া ইহার উপযুক্ত একটা বিহিত করিতেন। মারের প্রাক্কালে মার্জনাভিক্ষায় সাহসি হইয়া কেহ যদি বলিত, “ স্যার এবারের মত মাফ করে দেন” তো স্যার তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতেন ,“আমার কাছে কি মাফের বস্তা আছে হে ?”
মাফের তো বস্তা হয় না, তাই অভিযুক্ত যখনই বলিত, “ না স্যার” অমনি শুরু হইত ধুম ধাড়াক্কা কিল।

একবার এক ছাত্র পঞ্চম শ্রেণী পাশ করিয়া গন্ডিমুক্ত হইয়া কামাল স্যারের কাছে গেল দোয়া চাইতে। স্যার দোয়া করিলেন। ছাত্র আবার বলিল , “ স্যার দুষ্টামি তো কম করি নাই, নিজগুণে অধমকে ক্ষমা করে দেবেন।”
স্যার ফিক করিয়া হাসিয়া বলিলেন, “ মাফ কিরে, যখনকার পাওনা তখনই তো বুঝে দিয়েছি! স্যারের সময়ানুবর্তী কর্তব্যনিষ্ঠা দেখিয়া অনুতপ্ত ছাত্র হো হো করিয়া না হাসিয়া থাকিতে পারিল না।

কামাল স্যার যেমনি পিটাইতেন ঠিক তেমনি ভালোওবাসিতেন। তাঁহার মারের গুরুত্বের কথা প্রায় সকল অভিভাবকের মুখে মুখে শোনা যাইত, যাঁহারা ভাবী ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারের পিতা হইবার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকিতেন তাঁহারা নিজ সন্তানদের আচ্ছামত শাসন করিবার জন্য স্যারের কাছে বিশেষ অনুরোধ করিতেন; বলিতেন ‘স্যার, ছাত্রের হাড়গুলো আমার আর গায়ের মাংস সব আপনার, যা ইচ্ছা হয় তাতে তাই করেন।’ এত ক্ষমতা পাইয়াও স্যার কখনই ইচ্ছামত যখন তখন ছাত্রছাত্রীর মাংস ভূনা করিতেন না।

এই যে শাসন সোহাগ মিলাইয়া এতখানি হৃদয়রাজ্য দখল করিয়াছেন যিনি তাঁহার বিরুদ্ধেও আমার একখানা গুরুতর অভিযোগ আছে।

তৃতীয় শ্রেণী পাশ করিয়া সবেমাত্র চতুর্থ শ্রেণীতে প্রবেশ করিয়াছি। নূতন ক্লাসে নূতন অনুভূতি,পুরাতন দুষ্টামিগুলি হইতে আগের মত আর মজা পাইতেছলাম না। ইহার মাঝে পুরাতন একজনের সাথে বেশ ভাব হইয়া গেল। ইহার প্রধান শখ হইল রং বেরংয়ের বেলুন উড়ানো, আমিও তাহাতে সাগ্রহে যোগ দিলাম।

আমার দৈনিক বরাদ্দ ছিল এক টাকা। ইহার মধ্য হইতে বারো আনার ডালমুট খাইতাম আর চার আনা দিয়া একটা বেলুন কিনিতাম। সস্তা বেলুন কিনিতে কোন সমস্যা হইত না, কিন্তু তাহা ফুলাইতে গেলে বিশেষ অসুবিধা ঘটিত, কেমন জানি অপরিচিত একটা বোঁটকা গন্ধে নাক আপনা আপনিই বন্ধ হইয়া আসিত, কখনো কখনো বমি হইবারও উপক্রম হইত। আমরা বড় পাটকাঠি যোগাড় করিয়া নাসারন্ধ্র উপযুক্ত দুরত্বে রাখিয়া চার আনার বেলুন চতুর্গুণ উৎসাহে ফুলাইতাম।

দিন ভালই কাটিতেছিল। একদিন হইল কি বন্ধুর নিকট পয়সা নাই, বেলুন কিনিতে আমি তাহাকে পয়সা ধার দিলাম, অতঃপর দুইজন মিলিয়া ঈষৎ গোলাপী রঙের বেলুন উড়াইতে লাগিলাম। চারিদিকে ছেলেমেয়েরা খেলা করিতেছে, আমরাও করিতেছি ; হঠাৎ লক্ষ্য করিলাম কামাল স্যার দূর হইতে ইশারায় বেলুন উড্ডীনকারী আমাদের দুইজনকে ডাকিতেছেন। আমরা ভাল করিয়াই জানিতাম, স্যারের নিজে মুখে আহ্বানের অর্থ কিছু একটা গোল বাধিয়াছে। খানিকটা ভয় পাইয়া দুরু দুরু বুকে নিকটবর্তী হইতেই তিনি বেলুন দুইখানা কাড়িয়া লইয়া দুই করতলের সাহায্যে ফটাস করিয়া ফাটিয়া দিলেন। আমরা অবাক হইয়া লক্ষ্য করিলাম যে, ক্রীড়াসামগ্রীদ্বয় বিনিষ্টকরণ সমাপ্ত করিয়াই কামাল স্যারের দুই হস্ত হাস্য করিতে করিতে আমাদের শ্রবণযন্ত্র অভিমুখে আসিতেছে। পালাইবার চিন্তা করিবার পুর্বেই দুইজনেই ধৃত হইলাম। তাহার পরে উভয়ের কানের উপর যে কি পরিমান অত্যাচার সাধিত হইল তাহা ভাষায় প্রকাশ করিতে পারিবনা। কানের যদি মুখ থাকিত তবে স্যার নিশ্চিত অপমানিত হইতেন।
প্রায় মিনিটখানেক শাস্তিভোগের পর অব্যাহতি পাইলাম। জীবনে আর এই বেলুন লইয়া খেলা করিব না এমন শপথবাক্য পাঠ করিয়া দুই বন্ধু মুক্তি পাইলাম।

নিজের চার আনা ক্ষতি হইল, বন্ধুকে যে পয়সা ধার দিয়াছিলাম তাহা ফেরৎ পাইবার বেলুন ব্যাতীত আর অন্য কোন খাত ছিল না, সুতরাং তাহাও মার গেল। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়, এই যে এত কিছু ঘটিল তবুও নিজের অপরাধখানা ঠিক ধরিতে পারিলাম না।
বহুদিন পার হইয়াছে, একদিন হঠাৎ করিয়া আবিষ্কার করিলাম যে, যে বেলুন স্যারের রাগের উদ্রেগ করিয়াছে তাহা সাধারণ বেলুন নহে, শিশুক্রীড়ার সামগ্রীতো নয়ই বটে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এই বেলুনের গুরুত্বের কথা জানিতে পারিয়াছি আরো অনেক পরে। সেদিন বুঝিয়াছি স্যার যদি উপযুক্ত সময়ে আমাদের না থামাইতেন তাহলে কি যে ক্ষতি হইত !
কান মলিয়াছে মলুক, ব্যাথা যাইবার সঙ্গে সঙ্গে রাগও পড়িয়াছে, কিন্তু আট আনা ক্ষতি করিবার জন্য স্যারকে মনে মনে কতবার দোষারোপ করিয়াছি ; কিন্তু যেদিন প্রকৃত ব্যাপারখানা বুঝিয়াছি সেদিন শুধু শোকই ভুলি নাই, হাসিয়া গড়াগড়িও খাইয়াছি।

এফ এইচ রিগ্যান
২৩.০৩.১১
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×