এই ভাবে কথা বলতে বলতে আমরা ভাল একটা বন্ধু হয়ে গেলাম। ফোন নাং আদান প্রদানের পাশাপাশি আমাদের ছবি দেখা পর্ব হয়ে গেল।
একটা সময় ফোনও কথা হত। তবে সেটা খুবই কম। তবে প্রচুর sms আদান প্রদান হত। অনেক মাস পর আমরা একদিন দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
কথামত কাজ রাইফেলস স্কয়ারে দেখা করলাম। দেখি মডেলদের মত লম্বা একটা মেয়ে সাথে এক বান্ধবী সহ এসেছে। আমি তো ভয়ে অস্থির, এ তো দেখি আমার থেকেও লম্বা । ভাগ্য ভাল সামান্য একটু ছোট হবে.... সাহস করে কোনদিন মাপতে যাই নাই...চাই ও না... যদি ছোট হয়ে যাই...
সবচে অসস্তিকর ছিল তার বান্ধবীর অভজারভেশন, বান্ধবিটা আমাকে এক্সরে মেশিনের মত পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করতে থাকল। মনে হচ্ছিল যেন পাত্র দেখতে এসেছে।
ওহ! এত কথা বললাম অথচ তাদের নামই বলা হল না। প্রথমে যার সাথে নেটে পরিচয় হয়েছিল তার নাম 'আফরিন" আর বান্ধবীর নাম 'নাসরিন'। আফরিন-নাসরিন হল দুটি দেহে একটি প্রানের মত। এজন ছাড়া অন্যজনের চলে না। যাকে বলে জিগারীদোস্ত।
যাই হোক কিছু দিনের মধ্যে তার বান্ধবী 'নাসরিন'ও আমার ফ্রেন্ড হয়ে গেল। তার সাথেও নেটে কথা হত। তবে বান্ধবীটা একটু গরম মাথার মানুষ। একটু এদিক সেদিক হলেই মাথা গরম হয়ে পড়ে। মাথা গরম হলে 'তুই তুই' করে কথা বলত। ব্যাপরটা আমি খুব মজা পেতাম। তাই সারাক্ষনই তাকে ক্ষেপানোর ধান্ধায় থাকতাম।...
একটা কথা বলতে হয় দুটি মেয়েই পারসন হিসাবে খুবই ভাল, স্মার্ট এবং সুন্দর মনের। দুজনই খুবই হেল্পফুল। এই রকম সুন্দর মনের মেয়ে বর্তমান সময়ে কমই দেখা যায়।
বর্তমানে তারা দুজনই গ্রামীনফোন এ একই ডিপার্টমেন্টএ চাকরি করছে।
গ্রামীন ফোন সংক্রান্ত যে কোন সমস্যায় পড়লে আমি জাস্ট ওদের কাউকে ফোন দিলেই হল, লাইন কেটে দিয়ে কল বেক করবে, আর সাথে সাথে সমস্যার সমাধান করে দেয়। ওরা হল আমার কাষ্টমার কেয়ার সেন্টার। ওরা বাসায় থাকলেও আমার সমস্যার সমাধান করে দেয়।
আমার অফিসের অনেক কলিগও আমার মাধ্যমে ওদের কাছ থেকে সাহায্য নেয়।
'আফরিন'কে তো আমি বলি ''আমার ১২১'' ( যা কিনা জিপি হেল্প সেন্টারের নম্বর)।...
এখনো আফরিন-নাসরিনের সাথে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা চ্যাট হয়। আমার বন্ধু মহল থেকে অফিসের কলিগ, সবাই জানে আমার চ্যাট মানেই হল "আসমান-জমিন'এর সাথে চ্যাট। আসমান-জমিন হল আফরিন-নাসরিন। নামটা আমার কলিগরা মজা করে দিয়েছে।
এই ফাকে চুপে চুপে একটা কথা বলে রাখি, আফরিনের সাথে গতরাত ১২ থেকে ৩ টা পর্যন্ত চ্যাট করছি। এটা সম্ভব হয়েছে কারন আজ ওদের ডে অফ। আফিস নাই।
.... নাসরিন শুনতে পেলে আমার খবর আছে। নাসরিন আবার ঘুম নষ্ট করে চ্যাট কার পছন্দ করে না?। কিন্তু প্রায়ই রাতে ম্যাসেন্জারে লগ করে ঘুমিয়ে পরে। নাসরিন আবার একটু প্রাকটিকেল টাইপ। কিন্তু খুবই আবেগ প্রবন একটা মেয়ে। ওকে খেপানো খুবই সহজ, একটু খোচা দিলেই খেপে যায়। যদি বলি তোমরা তো পচা কম্পানিতে জব কর, ব্যাস ক্ষেপে উঠবে।
একদিনের একটা ঘটনা বলি, অফিস শেষে গেলাম ওদের সাথে দেখা করতে। দুজনকে নিয়ে গেলাম বনানী ডলসি'তে আইসক্রিম খেতে। আইসক্রিম এর অর্ডার দিয়ে বসে বসে গল্প করতে করতে মাথায় একটা আইডিয়া চলে আসল। নাসরিন কে ক্ষেপানো শুরু করলাম।
কিছুই না ওর দিকে তাকিয়ে বিনা কারনে মিটিমিট হাসতে থাকলাম। ব্যাস ক্ষেপতে শুরু করল।
আমি নাসরিনের দিকে তাকিয়ে আফরিন কে আস্তে আস্তে বললাম 'আইসক্রিমটা ভালই, বেশ মজ্যা তাই না?' নাসরিন মনে করল তাকে নিয়ে আমি কথা বলছি। ক্ষেপে উঠল, দ্বিতীয় বার যেই নাকি আফরিন কে বললাম একই কথা, সাথে নাথে নাসরিন বলে আমি কিন্তু চলে যাব। বলেই আমাকে বলে গাড়ির চাবি দাও। আমি ভাবলাম চাবিটা হয়তো দেখতে চাইছে। চাবিটা হাতে নিয়ে উঠে দাড়াল বলল আমি চলে যাব। আমি তো অবাক কি বলে, বিশ্বাস করতে পাললাম না যে সত্যিই চলে যাবে। তাকিয়ে দেখি সত্যিই আইসক্রিম র্পালারের বাহিরে চলে গেল। আমি তো হা করে বসে আছি, আফরিন বলল তারাতারি যাও ওকে আটকাও। আমি দৌড় দিলাম, দোকানের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে... ততক্ষনে নাসরিন আমার গাড়ীর কাছে চলে গেছে। দেখি গাড়ীর দরজা খুলে ওর একটা ফাইল ছিল ওটা বের করল। আমি গিয়ে বললাম 'আমি সরি প্লিজ ফিরে চল" কে শুনে কার কথা একটা রিক্সা ডেকে উঠে পড়ল।
এর পরের ঘটনা বাংলা সিনেমার মত, আমি বললাম রিক্সা দাড়ও, রিক্সা দাড়াল আমি নাসরিন কে রিক্সা থেকে নামার অনুরোধ করলাম। বেচারী নাছোড় বান্দা রিক্সওয়ালাকে বলে 'রিক্সা যাও' আমি রিক্সার হাতল ধরে দাড়িয়ে বলছি 'না রিক্সা যাবে না"; নাসরিন বলছে 'রিক্সা যাও' আমি বলছি 'না রিক্সা যাবে না".... রাস্তার লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে আমাদের তামশা দেখছে... নাসরিন তখন আমকে বলল 'সিন ক্রিয়েট করো না...আমাকে যেতে দাও, না হলে আমি হেটেই চলে যাব...' অবশেষে রিক্সা ছেড়েই দিতে হল...নাসরিন চলে গেল... যাবার সময় শুধু একটা কথাই বলল 'বাসায় গিয়ে রাতে ফোন দিব..."
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রাস্তায় দাড়িয়ে রইলাম...নিজেকে অনেক অসহায় আর অপরাধী মনে হতে থাকল...। ফিরে গেলাম আইসপার্লারে আফরিনের কাছে... শুনে আফরিন বলে তুমি কেন ওকে ক্ষেপাতে গেলে এখন ঠেলা বুঝ...আমি অসহায়ের মত চুপ করে রইলাম...কি আর করা আইসক্রিম খেয়ে দুজন মন খারাপ করে বাসায় চলে গেলাম...সত্যিই সেদিন নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয়েছিল... আজও সে কথা মনে হলে খারাপ লাগে...নিজেকে সান্তনা দেবার কোন ভাষা খুজে পাই না...
তারপর অনেকদিন ধরে নাসরিনএর সাথে নেটে দেখা হয় কিন্তু আমার সাথে কথা বলে নাই...আর আমিও ভয়ে ওর সাথে কথা বলি নাই... পরে অবশ্য ঠিক হয়ে গেছে... এখন আবার কথা হয়...তবে এখন কথা বলি "খুব খিয়াল কইরা..."
আমার এই লেখাটা পড়ে হয়তো নাসরিন হাসবে ..খিক খিক খিক...বলবে..এইটাই ''তোর'' শাস্তি...
(লেখাটা মূলত একটা পোষ্টের মন্তব্যে লিখা হয়ে ছিল , কিন্তু ব্লগার "কালপুরুষ" এর অনুরোধ ও একটা কলিগের ফোন পেয়ে আবার পোষ্ট করলাম।)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০০৭ রাত ২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



