যাক, তোমরা হর সাল এক রোজ আমাকে ইয়াদ কর, ইহা তোমাদের মেহেরবানী। আমি যে সূরজী বাঙ্গালা সালকে চান্দী হিজরী সালের সাথে মিশাইয়া দিয়াছি, ইহাতে আমি মুরতাদ না জামাতী কি প্রমাণ হইল সেই বাতচিত না আগাইলেই আমি খুশী। আমার আব্বাজান হুমায়ুন বাদশাহ শের শাহের কাছে যুদ্ধে হারিয়া এদিক সেদিক যখন পালাইয়া বেড়াইতেছিলেন তখন আমার জন্ম। লেখাপড়ার সুযোগ তেমন পাই নাই। তবে অল্প বয়সে বাদশাহ হইয়া আমি অনেক বুজর্গ ওয়াজির পাইয়াছিলাম। আমি তাহাদের পরামর্শেই কাজ করিতাম। তোমাদের প্রশ্ন থাকিলে তামাদ্দুন বিষয়ক উপদেষ্টা মিয়া তানসেন বা বীরবলকে পুছ করিও না, এমনকি আমার ওয়াজির-এ-খাজানা তোদের মালকেও (তোমাদের আবুল মাল নয়) না, কারণ বিষয়টি ফাতেহুল্লাহ সিরাজী নামে এক আসমানী পন্ডিত ঠিক করিয়া দিয়াছিল।
তোমাদের তখতে বিশ সাল ধরিয়া জেনানা বসিয়া আছে। মুগল আমলের আগে সুলতানী আমলে সুলতানা রাজিয়া অল্প কয়েকদিন দিল্লীর তখতে বসিয়া জান হারাইয়াছিলেন। তোমরা নারী জাতিকে অনেক শ্রদ্ধা কর। আমিও যোধা বাঈকে অনেক সম্মান করিতাম, আমার কিল্লায় তাহার জন্য পূজার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলাম। অবশ্য উহার রাজনৈতিক কারণও আছে। তবে শাহজাদা সেলিম যেভাবে নাদিরা ( আমার দেয়া নাম আনারকলি) নামের এক বাইজীকে বিবাহ করিবার গোঁ ধরিয়া বংশের মান-সম্মান ডুবাইতে গেল, তখন আমি শক্ত ছিলাম। আমাদের সময়ে কোন নারী-নীতি ছিল না। আমার এই ছাগল আওলাদ পরে আমার ইন্তিকালের পরে ব্যাঘ্রবিজয়ী বীর শের আফগানকে খুন করাইয়া তাহার জরু মেহেরুন্নিসাকে ভাগাইয়া আনে এবং নিজে আফিমে আসক্ত হইয়া তাহার হাতেই হুকুমত ছাড়িয়া দেয়। শরমের বাত।
বাঙ্গালা সুবার সাথে আমার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল না। বাঙ্গাল সব সময়েই ফাঁকিবাজ। আমার খাজনা দিতে চাহিত না। পরে রাজা মানসিংহকে পাঠাইয়া ঈসা খাঁর সাথে একটা সমঝোতা করি। তখন পদ্মা-যমুনা দরিয়ায় আব্বা-এ-বাঙ্গাল পুল থাকিলে বুঝাইয়া দিতাম। এত নদী খাল বিল! দিল্লীর সৈন্যরা বার বার অস্ত্র-শস্ত্র ঘোড়া লইয়া নৌকায় উঠিতে পসন্দ করিত না। ইংরেজরা অবশ্য এক ফন্দী বাহির করিয়া দুই শ বছর রাজত্ব করে। সেটি হইল লোকাল মীর জাফর বাহির করিয়া তাহাদের সাহায্য নেওয়া। এমন ফিকির আমাদের সম্মানে বাধিত।
যাহা হঊক, আজকাল দেখি তোমরা নওরোজের দিন নানান মিছিল বাহির কর, গাছের নীচে কাউয়ার আয়ত্তের বাহিরে আয়েশ করিয়া বসিয়া ঘন্টার পর ঘন্টা একই গীত গাও ও শোন। সেই গীতে মঊসুমের কথা আছে, গরমের কথা আছে, ফলের কথা আছে, আওরতদের কথা আছে; কিন্তু খাজনার কথা নাই, আকবরের কথা নাই। বাইজী না হইয়াও অনেক আওরত মুজরায় নাচে। সেই নাচ দেখিয়া বহু সেলিম লেখাপড়ার কথা ভুলিয়া যায়, বাপের পয়সার চেহলাম করিয়া মিয়ারা না-কামিয়াব হয়।
শুনিলাম দুই বাঙ্গাল বিদেশী তমঘা পাইয়া মশহুর হইয়াছে। সাবাশ! এক মিয়া সাহেব গরীব বেওয়াদের কাছ থেকে নাকে দড়ি দিয়া খাজনা আদায়ের রাস্তা বাতলাইয়াছেন। আমার সময়ে তিনি থাকিলে, তাঁহাকেই ওয়াজিরে খাজানা বানাইতাম। তবে তিনি নাকি ওয়াজির হইতে চান না। তাঁহার খায়েশ শাহেনশা হওয়ার। তাহা হইলে অবশ্য আমার সাথে কাজিয়া বাধিত। আমি মাঝে মাঝে নিষ্ঠুর হইয়া যাই, কাজীর বিচারের ধার ধারি না।
আরেক তমঘাওয়ালা মিয়া ইয়াহুদী কা জামাই অবশ্য আমার গুণগান গাহিয়াছেন। বলিয়াছেন - বাঙ্গাল দেশের মুসলমানের উচিত ১৪০০ বছরের পুরানা মাল বাদ দিয়া আকবার শাহের দীন-ই-ইলাহী গ্রহণ করা। উমদা বাত। ইঁহাকে আমি পরম সম্মান করি, এবং ইঁহাকে আমার হারেমের ভার দিতাম, যোধার মহলেরও । তবে ৭৮ বছর বয়সে দিমাগ ঠিক মত কাজ করে না, সাবধান হওয়া ভালো। সেরা হেকিমকেই দায়িত্ব দিতাম খোজা করার জন্য।
-- আবুল ফাত জালালুদ্দিন মুহাম্মদ (আকবর)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

