প্রতিদিনই আমার মেলবক্স ভর্তি হ’য়ে যায় অবাঞ্ছিত ফরওয়ার্ড মেলে। কোনওটা ওরকুটের কমিউনিটিতে যোগ দেওয়ার, আবার কোনওটা বিরল শ্রেণীর রক্ত প্রার্থনায়। আই.আই.টি.কানপুরের কোন বাঙালি ছাত্র দূরারোগ্য কোলাবুকি (এমনই কিছু নাম ছিল) রোগে ভুগছে এবং তার জন্যে আমাদের কিছু করা আশু কর্তব্য--এই মেল তো গত দেড় বছর ধরে পেয়ে চলেছি। তার সাথেই নিয়মিত আসতে থাকে কোনও হোটেলে গেলে আয়নার পেছনে রাখা লুকানো ক্যামেরা চিনে ফেলা থেকে শুরু ক’রে কোকাকোলা অপুষ্টিগুণ বা এ.টি.এম. সেন্টারে ডাকাতের হাত থেকে বাঁচার হঠযোগ।
শুধু তাই নয়। মাঝে মাঝে সাইবাবা বা মা মেরীর ‘বিরল’ ফটোগ্রাফও পেয়ে থাকি। সেইসব মেল গাণিতিক হারে সৌভাগ্য বয়ে আনে। যথা, ৫ জনকে মেলটি ফরওয়ার্ড করলে ৫ সপ্তার মধ্যে তুমি ভালো খবর পাবে। ৫-এর জায়গায় ফরওয়ার্ড-এর সংখ্যা ৫০ ক’রে দাও। ৫ মিনিটে ছাপ্পড় ফাড়কে নসিব তোমার মাথার ওপর আছড়ে পড়বে। এখানেই ক্ষান্তি নেই। সাথে থাকে সতর্কবার্তা--এই মেল কাউকে না পাঠিয়ে ডিলিট ক’রে দেওয়ার ফলে চিলির কোন এক প্রেসিডেন্ট ৩ দিনের মাথায় মারা গিয়েছিলেন। পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফও বোধহয় এমন কোনও মেলকে অবজ্ঞা করার ফলেই তার গদি খুইয়েছিলেন। তা এইসব মেলের জ্বালায় তিতিবিরক্ত কোন এক বান্দা একটা মেল পাঠিয়েছিল। তার বয়ান ছিল অনেকটা এইরকম।
তোমাদের পাঠানো মেল পড়ে আমি জেনেছি কোকাকোলা খেলে পেটে আরশোলা জন্মায় এবং পিজ্জা খেলে মাথায় চিজের পাহাড় তৈরী হয়। তোমাদের পাঠানো সতর্কবার্তায় আমি পাঁচবার বিদেশী গুপ্তচরদের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসেছি। তার সাথেই পঁচিশ বোতল ও-নেগেটিভ রক্তদান ক’রে হাজার হাজার শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছি। বলা বাহুল্য, আমার কিডনিও চার-পাঁচবার দান করা হ’য়ে গেছে। শুনলে খুশি হবে তোমাদের পাঠানো মেল ফরওয়ার্ড করার পুরস্কার হিসাবে মাইক্রোসফট্ আমায় পঁচাত্তর হাজার পাউন্ড দান করেছে। তোমাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
আশা করব আমার জীবনকে আরো মসৃণতর ক’রে তুলতে আরো অনেক অনেক মেল ফরওয়ার্ড করতে থাকবে আমায়।
বোঝাই যাচ্ছে, কতটা বিরক্ত হ’য়ে এ মেল লিখেছেন সেই ভদ্রলোক। মজার কথা, ফরওয়ার্ড মেলের বিরুদ্ধে লেখা এই মেলটিকেও বারবার ফরওয়ার্ড করা হয়েছে। আমিই বার তিনেক পেয়েছি বিভিন্ন সময়ে। আসুন পাঠক, আমার মেলবক্সের আর একটু ভেতরে ঢোকা যাক।
রিমি চ্যাটার্জি আমার সহকর্মিনী। অফিসিয়ালি আমাদের কোম্পানীর মেল আই.ডি. অফিসিয়াল কাজের জন্যেই। কিন্তু রিমি ঐ মেল আই.ডি. থেকেই আমাদের তিতিবিরক্ত ক’রে তুলেছিল। কীভাবে? সকালে অফিস পৌঁছেই সুন্দর লাল-নীল-সবুজ ব্যাকগ্রাউন্ডের একখানা সুপ্রভাত মেল আমরা সবাই পেতাম। এটা ছিল দিনের শুরুবাদ। প্রভাতেই পুরো দিনের পূর্বাভাষ মিলত। সারাদিন ধরে চলত বিভিন্ন নকশার এবং নানাবিধ রঙের মেল। তাদের সারা শরীর জুড়ে থাকত বাচ্চাদের ছবি। কখনও মানুষের, মানুষের বাচ্চা কম পড়লে কুকুর-বেড়ালের।
তখন সদ্য-সদ্য জয়েন করেছি। ট্রেনিং-এর চাপ প্রচন্ড। কাঁহাতক আর ভালো লাগে সারাদিন ধরে ‘কিউট’ বাচ্চা দেখতে। রিমি আমার সামনেই বসত। তাকে একদিন সবিনীত অনুরোধ জানালাম-মেলের প্রাত্যহিক সংখ্যা পনেরো থেকে পাঁচে নামিয়ে আনলে কেমন হয়? তা শুনে ভদ্দরমহিলা এক্কেবারে খড়গহস্ত আমার ওপর। ‘আমি মেল না পাঠালে তোর মেলবক্সে কখনও মেল আসত? সারাদিন বসে বসে মাছি তাড়াতিস।’
শুধু তাই নয়। নিজের স্ক্রীনে ঝুঁকে পড়ে আবার দুটো বাচ্চাওয়ালা মেল ফরওয়ার্ড ক’রে দিল ঝটপট। বোঝো ঠ্যালা ! অগত্যা ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের ধান্ধায় লাগলাম। মেল আই.ডি.ব্লক করা ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই এবার। কিন্তু অনেক চেষ্টা ক’রেও রিমির মেল আই.ডি. আমি ব্লক করতে পারলাম না। শেষে আমাদের কোম্পানীর সংশ্লিষ্ট বিভাগের টেকনিশিয়ানদের ফোন করলাম। ওরা জানালো আমাদের কোম্পানীর দুটো আই.ডি. একে অপরকে ব্লক করতে পারে না।
কী আর করি? নিজের মনেই গর্জাতে লাগলাম আর সুলভে রিমির শিশুসুলভ মেল দেখতে লাগলাম। সাধে কী আর শ্রীকৃষ্ণ শিশুপাল বধ করেছিলেন?
তা এই বাচ্চাদের মেলের কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল অন্য আর একটা মেলের কথা। পাঠিয়েছিল আমার কলেজবন্ধু প্রনভীর। ছবিতে একটা শিশু মেয়ে জন্মদিনের পোশাকে হামা দিচ্ছে। নীচে ইংরাজীতে লেখা - ‘এর বয়স ১৬ হলে এই বিজ্ঞাপন বেআইনি ঘোষিত হত।’ এটা ছিল একটা বিজ্ঞাপন সংস্থার নিজেদের প্রচার।
কিন্তু অবাণিজ্যিক এবং নেতাই জনস্বার্থে প্রচারিত বিজ্ঞাপনেও এইধরনের ফোক্কুড়ি ঐ একই মেলে দেখেছি। এক হাইওয়ের পাশে দৈত্যাকার হোর্ডিং। তার দৈর্ঘ্যের অর্ধেকটা জুড়ে মোটা মোটা ক’রে তিন অক্ষরে লেখা -- ‘সেক্স!’ তার নীচে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা-- ‘আশা করি আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা গেছে। দয়া ক’রে গাড়ির গতি কমান, সামনে বিপজ্জনক বাঁক।’ এগুলো যদি মনে হয় দুষ্টুমীর আবরণে নিরীহ বিজ্ঞাপন, তাহলে চাঁদের উল্টো পিঠ দেখাই? এটা পাঠিয়েছিল আমার আর এক সহকর্মী সাধন। ছবি নয়। অ্যাটাচমেন্টে ছিল একটা ভিডিও ক্লিপ।
শপিং কমপ্লেক্সে কেনাকাটা করছেন এক ভদ্রলোক্ সাথে পাঁচ-ছ বছরের ছেলে। হঠাৎ সে বাবার শপিং কার্টে এনে রাখল চকোলেটের একটা বড় বাক্স। কিন্তু ভদ্রলোক আবার সেটা র্যাকে তুলে রেখে দিলেন। তিনি রাজি নন অত দামী আর বড় চকোলেচের বাক্স কিনতে (উনি পেপসোডেন্টের নাম জানেন না নিশ্চিত)। ব্যাস! ঐটুকু ছেলের বাঁদরামী শুরু হ’য়ে গেল। দোকানের জিনিস ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো সে এদিক-ওদিক। সাথে চিল-চিৎকার। একটা ছোটোখাটো ভিড় জমে গেল তাকে ঘিরে। বিব্রত ভদ্রলোকের মুখ এল ক্লোজ আপ শটে। তখনও আন্দাজ করছি কীসের বিজ্ঞাপন হ’তে পারে। আমার কৌতুহলে নিরসন ঘটিয়ে পর্দা জুড়ে হাজির হল -- ‘কন্ডোম ব্যবহার করুন।’
এমন অভাবনীয় বিজ্ঞাপন সচরাচর দেখতে পাই না। তবে এ প্রসঙ্গে আরো একটা মেল-অ্যাটাচমেন্টের উল্লেখ না করলে অপরাধ হবে। মেলটা কে পাঠিয়েছিল খেয়াল নেই। তবে মেলের শুরুতে একটা ভূমিকা ছিল। লাতিন আমেরিকার বিজ্ঞাপননির্মাতাদের প্রায়ই অশ্লীলতার দোষে অভিযুক্ত করা হয়। নীচের ছবিটা লাতিন আমেরিকায় বানানো সবচেয়ে ‘ডিসেন্ট’ বিজ্ঞাপন। এবার ছবিতে আসা যাক।
একটা জাহাজঘাটা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে সমান দূরত্বে বসানো আছে কাছি বাঁধার মোটা মোটা খুঁটি। পরপর তিনটে খুঁটি। চতুর্থ খুঁটি নেই। তার জায়গায় লঙস্কার্ট পরে বসে আছে এক মেয়ে। পরিচ্ছন্ন ছবি। কীসের বিজ্ঞাপন বলুন তো? ব্রাজিলের এক জনপ্রিয় লুব্রিকেন্টের। সত্যিই ‘ডিসেন্ট অ্যাড’।
আর বিজ্ঞাপন নয়। এবার আসা যাক, কিছু জোকস্-এর কথায়। জানি ফরওয়ার্ড জোকসের কথায় অনেকেই হাই তুলছেন। মোটামুটি কয়েকটা ভাগ থাকে এই মেলগুলোর-সান্টা-বান্টা, হাম-তুম, বস-অফিস আর এক্কেবারে রগরগে স্থূল রসিকতা। মনে রাখতে হবে আমায় যারা মেল পাঠায়, তারা আমার মতোই সফটওয়্যার ইঞ্জিনীয়ার। তাই সেসব হাস্যকৌতুকের মান নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভালো। আমি এখানে একটা মাত্র মেলেরই উল্লেখ করব। আমাদের চন্ডিগড় অফিস থেকে জনৈক ভদ্রলোকের লেখা। এ বাক্স, সে বাক্স ঘুরে আমার বাক্সে জমা পড়েছিল।
একটা গল্প। পিন্টু আর চিন্টু দুই আরশোলা ঘুরে বেড়াত কফি ভেন্ডার মেশিনের আশেপাশেই। কখনও চিনি, কখনও দুধ খেয়ে তারা সুখেই দিন অতিবাতিহ করছিল। পিন্টুর একদিন দুমর্তি হল, সে কফি পানের লোভে এক কফি মাগে ডাইভ দিল। যে ভদ্রলোকের মাগে পিন্টু পড়েছিল, তিনি এলাচ ভেবে পিন্টুকে মুখেও তুলে নিয়েছিলেন (কফিতে এলাচ!)। অবশ্য একটু পরেই সন্দেহ হওয়ায় মুখ থেকে বের ক’রে আনেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ঘটনাস্থলেই পিন্টু দেহত্যাগ করে। এখানেই শেষ নয়, চিন্টু সেই একইদিনে অন্য আর একজনের লেবু চায়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়। জীবন্ত অবস্থায় তারা ছিল এক প্রাণ। মরণেও তারা একইভাবে গন্তব্য বেছে নিল। বন্ধুত্বের এই অমর কাহিনী যুগ যুগ ধরে অক্ষয় হ’য়ে থাকবে চন্ডিগড়ের কফি মেশিনে।
তবে আজকাল এই জোকসের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিবাহের বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন ম্যাট্রিমনি সাইটে অসাধারণ ইংরাজিতে পোস্ট করা বিজ্ঞাপন পেয়ে থাকি মাঝে মাঝে। তবে সেগুলো নেহাতই ভাষাগত বিভ্রান্তি। ভাবনার দিক থেকে অসামান্য এক বিজ্ঞাপন পাঠিয়েছিল কোমরুলদা-মিশনের সিনিয়ার এবং বর্তমান সহকর্মী। ঐ একই মেল পেয়েছিলাম কবি যশোধরা রায়চৌধুরীর কাছ থেকেও ( কবিরাও মেল ফরওয়ার্ড করেন বৈকি)। এই মেলটা বাংলা ভাষায় সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের ‘পাত্রী চাই’ কলাম থেকে স্ক্যান ক’রে পাঠানো-- যা ছিল আমি হুবহু তা-ই টুকে দিলাম।
অতি সৎ, সচ্ছ্বল ও নির্লোভ, শিক্ষিত পরিবারের সুপ্রতিষ্ঠিত ভাইদের বোন কাম্য। পার্থিব বস্তু নয়, মানবতাই যাঁর একমাত্র লক্ষ্য এরকম সত্যবাদিনী, মৃদুভাষিণী, শান্তিপ্রিয়া, প্রাণবন্ত দৃঢ় মনের আদর্শবতী/নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্না, উদার, নম্র, ভদ্র, নিঃরোগ, মাতৃত্বে অক্ষম (ডাক্তারী পরীক্ষা সাপেক্ষে)/ অনিচ্ছুক অপরিহার্য। ভাগ্যই সর্বোপরি হলেও, আগে বিয়ে করে, পরে মানিয়ে চলার কিংবা ডিভোর্সের অশান্তি এড়াতে, আগে বন্ধুত্ব করে, পরে উভয়ের সম্মতিতে বিয়েই শান্তির একমাত্র উপায়। তাই অভিভাবকের অনুমতিতে পাত্রীর সাথে নূন্যতম ১-১০০০ ঘন্টার সার্থক আলোচনাও অপরিহার্য। পাত্রীর নিরাপত্তার খাতিরে সাক্ষাৎ বর্জনীয় হলে, ফোন কিংবা পত্রালাপ গ্রহনীয়। কলকাতা ভিত্তিক মুম্বাইবাসী, ব্রাহ্মণ (পূঃবঃ হলে ভাল, শ্রীহট্ট হলে আরও ভাল), ৩৫-৪০, ৫’-৫’২, ফর্সা, স্লিম, সুশ্রী, লাবণ্যময়ী, রন্ধনে পটীয়সী, সুকেশী, ঘরোয়া, সমস্ত ইতিবাচক অভ্যাসযুক্তা, মাতৃত্বে অনিচ্ছুক অগ্রগণ্যা। অত্যাধিক সৎ, ঈশ্বরভীরু, সংবেদনশীল, স্পষ্টবাদী, আদর্শবান, নেশাহীন, স্বঅভিবাভক, ৪৭ (দেখতে ৩৫-৪০), ৫’৪, উঃমাঃ, উঃ শ্যামবর্ণ, চশমাধারী) +.৫-১.৫), ২৮ বছরের কর্মজীবন ত্যাগী, পাত্রের কোন দাবি নেই।
মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা, মেলবক্স থেকে এবারের মতো সাইন অফ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

