আমায় যারা নিয়মিত মেল ফরওয়ার্ড করে তাদের মধ্যে অন্যতম হল অনীশ সান্যাল। অনীশ আদতে বাঙালি। কিন্তু বাড়ি মহারাষ্ট্রের কোলাপুরে। আমার কলেজের বন্ধু। সেই সূত্রে অনীশের মা ঊর্মিলা কাকিমার কবিতাও সৃষ্টিতে প্রকাশিত হয়েছে একাধিকবার। যাই হোক, অনীশের দুটো জিনিস আমার খুব প্রিয়। ওর সুন্দর বাংলা আর ওর পাঠানো মেল। মেলের প্রসঙ্গে পরে আসছি অনীশের বাংলার দু’একটা উদাহরণ দিই।
অনীশের অনেকদিন পর্যন্ত ধারণা ছিল শুভেচ্ছা মানে হল শুয়ারের বাচ্চা। ও তখন জয়, রানা আর মৃন্ময়ের সঙ্গে একই রুমে ছিল। তাই চাপে পড়ে সমস্ত কথা ওকে বাংলাতেই বলতে হত। একবার জয়ের গা-হাত চুলকাচ্ছিল গরমে। সেই নিয়ে ও একেবারে জেরবার হ’য়ে পড়েছে। আর মাঝে মাঝে ‘ধুত! ধ্যাত!’ ইত্যাদি শব্দ করছে। অনীশ একপাশে রানার এনে দেওয়া বর্ণপরিচয়ের পাতা ওলটাচ্ছিল।
ও জয়কে প্রশ্ন করল--‘চুল কেন কাচ্ছে?’ অর্থাৎ ‘চুলকাচ্ছে কেন?’-র অনীশীয় সংস্করণ। অনীশকে ভালো লাগার আরও কয়েকটা কারণ আছে। কিন্তু সেসব লিখলে ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাবে। তাই এবার আসি অনীশের মেলের প্রসঙ্গে।
গল্পটা একটু ঘষেমেজে শোনাচ্ছি। কিন্তু কাঠামোটা ঐ মেল থেকেই পাওয়া। গল্প না বলে সিনেমা বলাই ভালো। তবে এখনকার সিনেমা নয়। আরও এক দশক পরের সিনেমা। ২০২০-র। সময় বদলেছে। তাই প্রেক্ষাপটও বদলেছে। বদলেছে কাহিনীর উপকরণ। কিন্তু প্রধান চরিত্র সেই তিনজনই-- নায়ক, নায়িকা আর ভিলেন। তিনজনই সফট্ওয়্যার ইঞ্জিনীয়ার।
নায়ক দিনের আঠারো ঘন্টা ইন্টানেটে মুখ গুঁজে বসে থাকে। আর নায়িকা আট ঘন্টা। বাকি সময়টা সে টিভি দেখে বা ঘুমোয়। নায়ক-নায়িকার প্রথম দেখা হয় প্রোজেক্ট পার্টিতে। নায়কের ফ্লপি ডিক্সের মতো চওড়া বুক আর ৫ জি.বি. হার্ডহিস্কের মতো পেটানো চেহারা দেখে নায়িকার আর চোখ সরেনা। নায়কও নায়িকার পেনড্রাইভসুলভ কমনীয়তায় মুগ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু চিত্রনাট্যের জন্যে প্রথম মোলাকাত মধুর হল না।
দু’চারটে বাক্যালাপের পরই মেল আই.ডি. চেয়ে বসল নায়িকা। মেল? নায়কের দুচক্ষের বিষ। মাইক্রোসফট্ আউটলুক ২০১৮-র দোষত্রুটি নিয়ে সরব হ’য়ে উঠল সে। একবার একটা মেল এক বন্ধুকে ফরওয়ার্ড করতে গিয়ে আউটলুকের গুণপনায় তার বসের কাছে চলে গিয়েছিল। মেলের বিষয় ছিল --"How DUMB ur Boss is?' এর ফলস্বরূপ এক তো ইমেল এটিকেটের ওপর ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেকচার শুনতে হয়েছিল; তার ওপর সেইবার এ্যাপ্রেজালে যা গ্রেড মিলেছিল, তা না বলাই ভালো। তাই নায়কের মতে ইন্সট্যান্ট মেসেঞ্জারই ভালো।
হুঁ। মেসেঞ্জার? নায়িকার মুখ রাগে ফুলে ৭০০ এম.বি.-র সি.ডি. হয়ে যায়। অফিসের ছেলেগুলো তো ওটা দিয়েই জ্বালিয়ে মারে মেয়েদের। খেয়েদেয়ে সব কাজ নেই--- ‘গুড মরনিং।’ সাথে একটা দাঁত বের করা স্মাইলিং। ওদের ব্লক করতে করতে আঙুল ব্যথা হয়ে যায়্ তার থেকে বরং আউটলুক অনেক ভালো। যাকে পছন্দ করো তাকেই শুধু মেল করো। অ্যাড্রেসবুকে বসের মেল আই.ডি. না রাখলেই হলো... বসের সাথে অতো পিরীতের দরকার কী? কাজ থাকলে বস নিজেই যোগাযোগ করবে। যত্তোসব! ভিলেন কাছেই দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। সে এই সুযোগটা কাজে লাগালো। আউটলুক ২০১৮ কত্তো ভালো পাঁচমুখে বলতে লাগলো নায়িকার সামনে। ফলস্বরূপ নায়িকার সাথে এক টেবিলে বসলো ভিলেন। আর উলটোদিকে বেজার মুখে ডিনার সারলো নায়ক।
কিন্তু প্রমের গতি বিচিত্র। নায়িকা আর আগের মত কোডিং-এ মন বসাতে পারে না। প্রোজেক্ট মিটিং-এ বসে প্রোজেক্টারে ভেসে ওঠে তারই মুখ। খেতেও অরুচি। ভিলেন মাঝে একদিন তাকে কাফে কফি ডে--তে নিয়ে গিয়ে জন্মদিনের ট্রিট দিল। কিন্তু সে কিছুই খেল না প্রায়। নায়কের অবস্থাও তথৈবচ। রাত জেগে সে লাইব্রেরী থেকে চেয়ে আনা ‘জীবনকে ভালোবাসার ১০০ উপায়’ পড়তে থাকে। অনিদ্রায় তার চোখের কোলে কালি পড়ে যায়।
অবশেষে একদিন নায়ক খুঁজেপেতে নায়িকার মেল আই.ডি. যোগাড় করে লজ্জার মাথা খেয়ে আউটলুক থেকেই একটা মেল করে বসলো--- ‘তোমার জন্যে মন খারাপ। দেখা করবে?’ সাথে সাথে এল-- ‘২ নম্বর ফুডকার্টে ১২টা ৩৫শে দাঁড়িয়ে থেকো।’ তারপর যা হয়... এতক্ষণ পর সিনেমার দ্বিতীয় গানটা এলো (প্রথমটার কথা বলিনি বুঝি? ওটা সেই প্রোজেক্ট পার্টিতে হয়েছিল; কিন্তু সেটা নেহাতই আইটেম নাম্বার ছিল। তাই বলা হয়নি।)। গানের সাথে নায়ক আর নায়িকা হালকা চালে একটু নাচলো। এমনকি ফুডকার্টে যারা খাচ্ছিল তারাও কোমর দোলালো। এই গানের পর দুজনের প্রায়ই দেখা হতে লাগলো। কখনও জিমে তো কখনও বারিস্তায়। আর ভিলেন এইসব দেখেশুনে প্রতিশোধের উপায় খুঁজতে লাগলো।
এবার সিনেমার শেষদিক। একদিন দুপুরে নায়কের মেজাজ খারাপ। একটা প্রোগ্রাম কমপাইল করা যাচ্ছেনা... হঠাৎ মেসেঞ্জারে নায়িকার মেসেজ-- ‘হেল্প মি!’ ব্যাস... তারপরই অফলাইন হয়ে গেল সে। নিশ্চয় ভিলেন কিছু শয়তানি করছে। দুরুদুরু বুকে নায়ক ছুটতে লাগলো নায়িকার কিউবিকল্ লক্ষ্য করে। সেখানে পৌঁছে দেখে নায়িকা হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে আর ভিলেন তার কম্পিউটারে ঝুঁকে কি যেন করছে। নায়ক একটা ধাক্কা মেরে তাকে সরিয়ে দিল। কিন্তু কী--বোর্ড থেকে গেল থেকে গেল ভিলেনের হাতে।
অট্টহাস্য করে উঠল সে --- ‘এবার আমাকে কেউ আটকাতে পারবেনা।’ নায়ক দ্রুত দেখল নায়িকার কম্যান্ড প্রম্পটে ফুটে উঠছে-- ‘Format C:' অর্থাৎ সি-ড্রাইভ ফর্ম্যাট করতে চাইছে শয়তানটা। একদিকে অসহায় নায়িকা, অন্যদিকে কী-বোর্ড হাতে ভিলেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে "I will... I will rock u... rock u...' (কবে যে এরা হলিউড থেকে নকল করা বন্ধ করবে. খোদায় মালুম!)। নায়ক কী-বোর্ড লক্ষ্য করে ঝাঁপালো এবং ছিনিয়ে নিল সেটা ভিলেনের হাত থেকে। কিন্তু ধরাশায়ী ভিলেন তখনও হাসছে। ঠোঁটের কষ থেকে রক্ত মুছে নিয়ে বলল-- ‘নায়ক, আমায় আটকানোর সাধ্য তোমার নেই। আমি Enter টিপে দিয়েছি।’ তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে নায়কের মুখে -- ‘ ভিলেন, বেঞ্চে থেকে থেকে তুমি মাইক্রোসফট্ ডস ভুলে গেছো।’ এবার সরে দাঁড়ালো সে।
পর্দায় দেখা গেল ফুটে উঠেছে-"Are you sure? (y/n)' । নায়ক n টিপে দিল। আর্তনাদ করে উঠলো ভিলেন --- ‘না-আ-আ-আ-আ!’ সেই সময় এসে গেল সিকিউরিটি গার্ড (কফি ব্রেকে ছিল এতক্ষণ)। ভিলেনকে ধরে নিয়ে গেল। নায়িকার বাঁধন খুলে নায়ক তাকে তুলে নিল নিজের বুকে।
লজ্জাবনতা নায়িকা নায়কের বুকে মুখ রেখে বলল -- ‘তোমার মেসেঞ্জারের জন্য আজ আমার কেলভিন হবসের পুরো কালোকশান বেঁচে গেল। হিমেশ রেশম্মাইয়ার কিছু অ্যান্টিক গানও ছিল।’ (কিছু কিছু দর্শক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেন যে ফর্ম্যাট করে দিল না সি ড্রাইভটা!) নায়কও এবার ফিল্মি-- ‘আর তোমার আউটলুক যে আমাদের প্রথম দেখা করিয়ে দিয়েছিল।’
এই সিনেমা সবার হয়তো ভালো লাগবে না। স্বাভাবিক। ২০২০-র সিনেমা এখন রিলিজ হলে ফ্লপতো হবেই। তার থেকে বরং শোনাই প্রনভীর সিং-এর পাঠানো একটা মেলের গল্প। এই মেলে কয়েকটা দর্শন ঘেষাঁ সমীকরণ আছে। শোনা যাক।
মানুষ= আহার+নিদ্রা+কর্ম+উপভোগ
গাধা= আহার+নিদ্রা
---------------------------------------
অতএব, প্রতিস্থাপন পদ্ধতি অনুযায়ী--
মানুষ = গাধা + কর্ম + উপভোগ বা, মানুষ - উপভোগ = গাধা + কর্ম অন্য ভাষায় --- মানুষ, যে জীবন উপভোগ করতে জানেনা= গাধা, যে কাজ করে।
এবার দ্বিতীয় সমীকরণ--
পুরুষ = আহার + নিদ্রা + উপার্জন
গাধা = আহার + নিদ্রা
----------------------------------------------
(বিয়োগ করলে) পুরুষ - গাধা = উপার্জন বা, পুরুষ - উপার্জন = গাধা
অন্যভাষায় --- পুরুষ, যে উপার্জন করেনা= গাধা।---- (ক)
আবার অন্য দিক দিয়ে,
মহিলা = আহার + নিদ্রা + ব্যয়
গাধা = আহার + নিদ্রা
---------------------------------------------
আগের মতোই, মহিলা - ব্যয় = গাধা
অন্যভাষায় --- মহিলা, যে ব্যয় করেনা = গাধা। ----- (খ)
(ক) আর (খ) থেকে এটাই বোঝা যায় যে.
পুরুষ উপার্জন করে যাতে মহিলা না গাধা হয়ে যায় এবং মহিলা ব্যয় করে পুরুষকে গাধা না হতে সাহায্য করে।
(ক) আর (খ) যোগ করে পাওয়া যায় --- পুরুষ ও মহিলা = ২টি গাধা। কী উদ্ভট সমীকরণ!
এই পর্যন্ত পড়ে যারা হাই তুলছেন। তাঁদের এবার একটা তুলনামূলক ভালো গল্প শোনানো যাক। বলাই বাহুল্য, এটাও আমার মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। একটা সত্যি গল্প। আমি পেয়েছি অবশ্যই একটা ফরওয়ার্ড মেল থেকে। আসুন গল্পটা শোনা যাক।
২৩শে মার্চ, ১৯৯৪। চিকিৎসকরা একমত হয়ে রায় দিলেন রোনাল্ড ওপাসের মৃত্যু হয়েছে মাথায় শটগানের গুলি লেগেই। ওপাস আত্মহত্যার জন্যে লাফিয়ে পড়েছিলেন দশতলার একটা বাড়ির মাথা থেকে। সুইসাইড নোটও পাওয়া গেছে তাঁর ঘর থেকে। তদন্তে জানা গেল, ছাদ থেকে পড়ে ওপাসের মৃত্যু হওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ কিছু মেরামতির জন্যে চারতলার লাগোয়া একটা জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন কিছু মিস্ত্রি। কিন্তু মারে হরি রাখে কে.. লাফিয়ে নিচে পড়ার সময় ন’তলাতে শটগানের গুলি এসে লাগে তাঁর মাথায়। আইন অনুসারে, আত্মহত্যাকারী যেভাবেই মারা যান না কেন আত্মহত্যার প্রয়াসে তিনি মারা গেলে সেটা আত্মহত্যা হিসাবেই পরিগণিত হবে।
কিন্তু শটগান থেকে কে গুলি করলো? জানা গেল, এক বয়স্ক দম্পতি ঝগড়ায় মেতে ছিলেন। পতিদেবতাটি শটগান হাতে স্ত্রীকে ভয় দেখাচ্ছিলেন। উত্তেজনার মাথায় গুলি চালিয়ে বসেন এবং স্ত্রীর বদলে জানালার বাইরে তিনি পতনশীল ওপাসকে লক্ষ্যবিদ্ধ করে বসেন। আইনের কচকচানিতে না গিয়েও বোঝা যায়, একজনকে হত্যার প্রয়াসে অন্য একজনের হত্যা ঘটালেও সেটা তো আদপে হত্যাই। তাই এই পর্যন্ত এসে বোঝা গেল ওপাসের মৃত্যু আত্মহত্যা নয় হত্যা।
কিন্তু ন’তলার ঝগড়ারত দম্পতি এটা মানতে নারাজ। দুজনেই জানালেন শটগানটিতে কখনো গুলি ভরা থাকতো না। ভদ্রহমিলা জানালেন ঝগড়া হলেই তাঁর স্বামী শটগান হাতে নিয়ে ভয় দেখাতেন। দুজনেরই অজ্ঞাতে কেউ ওতে গুলি ভরে রেখেছিল। সেদিন ঝগড়ার সময় দুর্ঘটনাবশতঃ ট্রিগারে আঙুল পড়ে এবং গুলি চলে যায়। ঐ বাড়ির কাজের লোক সাক্ষ্য দিল যে, ঘটনার প্রায় সপ্তা ছয়েক আগে সে ঐ দম্পতির ছেলেকে দেখে শটগানে গুলি ভরতে। কেন? বেকার ছেলের অকর্মণ্যতার জন্যে তার হাতখরচের টাকা এক্কেবারে কমিয়ে দিয়েছিলেন ঐ ভদ্রমহিলা। প্রতিশোধ নিতে তার মাকেই মারতে চেয়েছিল ছেলেটি। সে জানতো তার বাবা মাকে শটগান নিয়ে ভয় দেখাবে এবং ভাগ্য ভালো থাকলে মা মরবেই। তাহলে ব্যাপারটা এরকম রোনাল্ড ওপাসের হত্যার জন্যে দায়ী ঐ দম্পতির ছেলেই।
এবার সবথেকে বড় চমক। ঐ বয়স্ক দম্পতির ছেলে আর কেউ নয়... রোনাল্ড ওপাস নিজেই। মাকে মারতে চেয়ে ছ’সপ্তার অপেক্ষায় সে সব আশা ছেড়ে দিয়ে নিজের ওপর ঘৃণায় আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নেয়। ভাগ্যের পরিহাস, নিজের গুলিতেই মরেছে সে। তাই শেষ পর্যন্ত সেই আমড়াতলার মোড়েই ঘুরে এল ঘটনা। রোনাল্ড ওপাসের মৃত্যু আত্মহত্যাই। আর নয়, এর পরেরবারও যদি সম্পাদক আমায় ছাপতে রাজি হন; আবার আসবো আমার ড্রাফট্ ফোল্ডার নিয়ে। তব তক্ কে লিয়ে...
-- এই লেখাটি গতকাল মুখোমুখি ডট কম-এ প্রকাশিত হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

