সমস্ত দিনটা আর কাটতে চায় না।তাকে আর একবার দেখতে পাবো এই আশায় বিভোর হয়ে রয়েছি।যে আমাকে চিরদিনের মতো ছেড়ে চলে গিয়েছিল,আবার তার সাথে দেখা হবে কল্পনাও করি নাই।অসম্ভব,কিন্তু সম্ভব হয়ছে।সে আসছে এবং আমি তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষায় পাগল হয়ে উঠেছি।যদিও মাত্র ৫ মিনিটের জন্য,যদিও তার স্বামী সংগে থাকবে,তবুও এই ঘটনাটি আমার জীবনের বৃহত্তম ঘটনা বলে মনে হচ্ছে।অমিতার দেয়া চিঠিটা আবার খুলে পড়লাম: :-
শ্রীচরণেষু,
উনি চট্টগ্রাম বদলি হয়েছেন।কমলাপুর হয়েই আমরা যাব।আমাদের ট্রেন কমলাপুরে রাত্রি সাড়ে আটটায় পৌছাবে।পাচঁ মিনিট মাত্র থামবে।আপনি যদি ষ্টেশনে আসেন তবে খুশীর সাথে সুখীও হব।অনেকদিন আপনাকে দেখিনা।দেখতে অনেক ইচ্ছে করে।আসবেন তো??
আশাকরি,আমাকে একেবারে ভুলে যাননি।
----অমিতা।
অতীতের সেই স্বপ্নময় দিনগুলি তাদের সমস্ত ভালবাসা নিয়ে আবার ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।বিশেষ করে মনে পরছে সেই দিনটির কথা,যেদিন অনেক ইতস্তত করে আশা-আশন্কা-উদ্বেল হৃদয়ে তাকে প্রথম প্রণয় নিবেদন করেছিলাম।মনে ভয় ছিল,যদি সে ভুল বুঝে-যদি সে রাগ করে।তাকে তো কথা দিয়েছিলাম,বন্ধুর দৃষ্টিতে দেখবো-কখনো দেখবো না ভালবাসার দৃষ্টিতে।তবে অমিতা আমার আচরণে বুঝে নিয়েছিল,আমি তাকে ভালবাসি।সে-নিজেই আমাকে প্রেম নিবেদন জানাতে বাধ্য করেছিল।তার একটা প্রশ্নের জবাব দিতেই বলতে হয়ছে -অমিতা আমি ভালবাসি তোমাকে।হ্যা অমিতা আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি।
লজ্জামুখে সহজ ভাবে সে আমার নিবেদন শুনছিল।তার লজ্জারুন কপাল,আকম্পিত অধর,আনন্দিত নয়ন-তার সেদিনকার সম্পূর্ণ রুপ আমার মনের পরতে পরতে উজ্জল বর্ণে আকাঁ রয়েছে।কথনো ভুলব না।
ভুলি নাই একদন্ডের জন্যও তোমাকে ভুলি নাই,ভুলতে পারি নাই।তোমাকে এই জীবনে বহির্লোকে পাইনি তা সত্য,কিন্তু আমার অন্তরলোকে যে আসন তুমি অলন্কৃত করেছ,সে আসন এখনো অবিচলিত আছে এবং চিরকাল থাকবে।
অমিতাকে ভালবেসেছিলাম।অমিতা ও আমাকে ভালবেসেছিল।অমিতার পিতা-মাতার আপত্তি ছিলনা।আমারতো পিতা-মাতাই ছিলনা।তবু আমাদের বিয়ে হলো না।
সবকিছু যখন ঠিকঠাক,একদিন কাশিঁতে কাশিঁতে এক ঝলক রক্ত আমার মুখ থেকে বের হলো।জীবাণুতত্ববিৎ পরিক্ষা করে বললেন,যক্ষার জীবানু পাওয়া গেছে।সব শোনার পরেও অমিতা কিন্তু আমাকে চেয়েছিল।অমিতাকে অনেক ভালবাসি তাই আমি পারলাম না।বিবেক বাধাঁ দিল।অমিতার বিয়ে হয়ে গেল অন্য জায়গায়।
অমিতার মতো পাত্রী পড়ে থাকেনা।সুন্দর স্বভাব,সুন্দর চেহারা,সুন্দর শিক্ষা।অমিতার মতো মেয়ে বাংলাদেশে বেশী নাই।আমার চোখেতো আর একটাও পড়েনি।রুপসী শিক্ষিতা মেয়ে হয়ত অনেক আছে ; কিন্তু অমন মৃদু,অমন স্নিগ্ধ,অমন সুরভিত সুমিষ্ট স্বভাব তো আর কোথাও দেখলাম না।
আইনত অমিতার সুখে থাকবার কথা।হয়ত সুখেই আছে।কিন্তু কেন জানিনা,আমার অন্তর নিবাসী অবুঝ ব্যক্তিটির বিশ্বাস,অমিতা সুখে নাই।
আমার ধারণা,অমিতা আমাকে পেলেই বেশি সুখী হত।যদিও আমি অমিতার স্বামীর চেয়ে সব দিক দিয়েই নিকৃষ্ট,তবুও মনেহয় অমিতা এখনো মনেমনে আমারই প্রতিক্ষা করছে।অত্যন্ত যুক্তিহীন এই স্বপ্নকে আমি মনে মনে আকড়েঁ আছি যে,তার স্বামীর বড় বংশ,ভালো চাকরী,সুন্দর রুপ,অটুট স্বাস্হ্য স্বত্বেও সে ততটা সুখী নয়,যতটা সুখী সে হতে পারতো যদি আমি তাকে বিয়ে করতাম।হয়ত এটা আমার অহমিকা,
অমিতা তো এরচেয়ে অনেক বেশী সুখেও থাকতে পারে?
দেখা হলে কি বলব তাকে ! এতদিন পর দেখা-পাচঁ মিনিটের জন্য !
ষ্টেশনের ভীড়ে পাচঁ মিনিটের মধ্যে কি তাকে বলব ! অখচ বলবার কত কথা মনের মধ্যে জমে রয়েছে।কিন্তু পাচঁ মিনিটের মধ্যে সমস্ত কথা গুছিয়ে বলব কিভাবে ! হয়ত কিছুই বলা হবেনা।হয়ত অতি সাধারণ প্রশ্ন দিয়েই এই অতিশয় মূল্যবান পাচঁটি মিনিট অতিবাহিত হয়ে যাবে।জীবনে হয়ত তার সাথে আর দেখা হবেনা। হয়তো.........................................।
সমস্ত দিন বাজারে ঘুরেছি।চট্টগ্রামের নিউ মার্কেটের বাদাম-বুট অমিতার খুব প্রিয় ছিল।অনেক জায়গা ঘুরেও ঠিক সেরকম বাদাম-বুট যোগাড় করতে পারলাম না।হয়ত এখানকার জিনিস তার এখন আর পছন্দ হবেনা।অষ্ট্রেলিয়ান খাবার খেতে খেতে হয়ত বাংলার কমদামী খাবার সে খাবেনা।হঠাৎ মনে পড়ল,কিছু গোলাপ ফুল নিয়ে যাই,লাল নয়-সাদা গোলাপ।
হাত ঘড়িটার দিকে তাকালাম দেখলাম,সাড়ে ছয়টা বাজে।এখনো দেরী আছে।বড় বড় সাদা গোলাপগুলি অতি সুন্দর।অমিতা নিশ্চয়ই খুশি হবে।রাস্তায় নেমে হাত ঘড়িটা দেখে আর একবার নিশ্চত হলাম।ট্রেন আসতে এখনো এক ঘন্টা বাকী।মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে।
বাদাম-বুট ও গোলাপ নিয়ে আমি অন্য-মনস্ক ভাবে প্লাটফর্মে পায়চারি করছি।সমস্ত অন্তরজুড়ে একটা বেদনাময় অনুভূতি ধীরে ধীরে অনুভব হচ্ছে।কতক্ষণে আসবে ট্রেনটা ??????
অনেক্ষণ পর.................................................।
একজন রেলওয়ে কর্মচারী অদূরে দাড়িয়ে ছিলেন।তাকে বললাম,এয়ারপোটগামী ট্রেনটি আসতে আর কত দেরী?
তিনি নির্বিকার ভাবে বললেন-"সে ট্রেনতো আটটা পয়ত্রিশে চলে গেছে।"
সে কি !! নিজের হাত ঘড়িটা দেখলাম।
সাড়ে সাতটা বেজে আছে।হঠাৎ মনেহল,আজ সকালে ঘড়িতে দম দেই নাই।অমিতার চিঠি পেয়ে এমন অন্যমনস্ক হয়েছি যে,ঘড়িতে দম দেবার কথা মনেই ছিলনা্।মূর্তির মতো দাড়িয়ে রইলাম সেখানে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

