somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"ডে'জ অব মাই কনটেন্ট"

১৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সে তো অনেক বছর আগে।
আমেরিকার দক্ষিনাংশে, ভার্জিনিয়া রাজ্যের এক কোনে, আমার ছোট্ট গ্রাম ছিল দুই রাস্তার সংযোগস্থলে। নিষ্পাপ গ্রীষ্মের মধুর দিনগুলো ছিল শুধু আমাদেরই। বিশ্বাস করো, দুঃখ পেতামনা কখনো। যদিও জীবনের অনেক কিছুই বয়ে যেত তার আপন গতিতে-কখনো ছন্দে, কখনোবা..।

সাতটা মাত্র বাড়ি ছিল, একেকটা একেক ঢং এর। ওটাই ছিল আমাদের কমিউনিটি। দু'টো রাস্তার একটা ধুলোর চাদর গায়ে উঠে গেছে পাহাড়ের দিকে। ওদিকে যেতাম না খুব একটা। শুনতাম ওদিকে এক বুড়োর হুইস্কির ডিস্টিলারী আছে। ওখান থেকে শহরে হুইস্কি যেত। আরেকটা রাস্তা গেছে নেমে গেছে নিচে - নদীর দিকটায়। আমার কাজিন কেনেথ আর আমি প্রায়ই চলে যেতাম ওই নদীতে। কেঁচো দিয়ে মাছ ধরতাম মজা করে।

গ্রীষ্মের উষ্ণতা বাতাসে সুগন্ধ ছড়াতো। বেগুনি উইষ্টেরিয়ার মিষ্টি গন্ধে আমাদের সকাল হতো। পাথরের দেয়ালের জংলা গোলাপের গন্ধে আমাদের দুপুর, বিকেল আচ্ছন্ন হয়ে থাকত।

সময়ের মানদন্ডে ওটা ছিল একটা আদিম অঞ্চল। না ছিল বিদ্যুৎ, রাস্তাগুলো ছিল কাঁচা। আমাদের বাড়ীতে জলের কল ছিল না। গৎবাঁধা গ্রীষ্মের দিনগুলো ছিল এতসব না থাকার ভিড়ে-ও পরিপূর্ণ। বিদ্যুৎ ছিলনা বলে আমরা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গতো, বাড়ীর সামনের বাগানের ঘাসে শিশির জমে থাকত। মহিলারা রোজ সকালে কেরোসিন ল্যাম্প পরিষ্কারে লেগে যেত। বাচ্চার ঝর্ণায় যেত জল আনতে। আমরা জল নিয়ে ফেরার পথে দেখে নিতাম বাগদা পোনাগুলো কত বড় হলো।

দৃশ্যমান পৃথিবীর সবকিছুই ছিল আনন্দমুখর। ক্ষুদে ডানার হামিংবার্ড গুলো ফুল থেকে ফুলে উড়ে যেত। ওরা এত ঘন ঘন পাখা নাড়াতো -দেখে মনে হতো ওদের কোন পাখা-ই নেই!
মধ্যদুপুরে আরামপ্রিয় গ্রাম্য মহিলারা জানলা খুলে দিত। মেঝেতে বিছিয়ে দিত কম্বল। আয়েশী স্বপ্নে বিভোর হতো প্রায়শঃই। দুরের গম ক্ষেতের পাশে কোন গাছের ছায়ায় গরুর দল চড়তে থাকে। বিকেল নামত ঝুপ করে ..শান্ত, তবুও শব্দমুখর। ক্লোভার লতায় মৌমাছি আর দুরের মাঠের ধোঁয়া তোলা মাড়াই মেশিনের শব্দ কানে আসত ক্ষীণভাবে। বারান্দার টিনের চালে পাখিদের লড়াই চলত অন্ধকার নামার আগ পর্যন্ত।

পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে নেমে আসা ধুলো দেখে বুঝতাম কিছু একটা নেমে আসছে।
"গাড়ী আসছে!"- কেউ চেঁচিয়ে বলত। বাড়ীর লোকজন বেড়িয়ে আসত সবাই। নেমে আসা ধুলোর দিকে তাকিয়ে নানান অনুমানে গুঞ্জন উঠত।
কখনো কখনো এটা হয়ে যেত ঘটনাবহুল, যখন রাস্তা দিয়ে কোন গাড়ী আমাদের গ্রাম-কে অতিক্রম করে যেত।
" কে গেল রে ওটা"
"মনে হয় প্যাকি পেইন্টার.."
"আরে না, ওর গাড়ী তো এরকম না"
ধুলোর কুন্ডুলী স্তিমিত হয়ে আসার সাথে সাথে থেমে যেত কোলাহল। সেইসময় তুমি যদি আমাদের ঘরের দিকে পা বাড়াতে, দেখতে কি অপার রহস্য নিয়ে মুরগীগুলোর তাদের খোয়াড়ে ডিমের যত্নে বিভোর জীবন্ত। দেখতে কিভাবে বুনো ষাঁড়ের দল নেমে আসে পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে। কিভাবে কোন অভিযানপ্রিয় সাহসী বালক একবারো পেছনে না ফিরে ছুটে যায় মাঠের দিকে-নিজ বাড়ীর আঙ্গিনা থেকে কত দুর যেতে পারে সে- এযেন তারই পরীক্ষা।

পরিশ্রান্ত পুরুষেরা সূর্য ডোবার সাথে সাথে বাড়ী ফিরতো। ঝর্ণার জলে ধোয়া তাদের পরিশ্রান্ত মুখগুলো কোন চেনা হাসিতে আমাদের সব ভয় দুর করে দিত। তাদের একটা গোপন ব্যাপার জানতাম। জানতাম কিভাবে কিচেনের তাকে সোডার বোতলের পেছনে লুকোনো থাকতো তাদের হুইস্কির বোতল। আমাদের কাছ থেকে কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে তারা কিচেনে যেত আর বাড়ীর পেছনে গিয়ে হঠাৎ করেই হাসিতে ফেটে পড়তো কেন-তা আমি ঠিক জানতাম। আমি এও জানতাম মহিলারা ব্যাপারটা কি চোখে দেখতো। প্রায়ই দেখতাম ক্ষণিক ঝগড়া, ক্ষণিক হাসির হিল্লোল।

সূর্য ডুবে গেলে বাড়ীর বারান্দায় বসতাম সবাই মিলে। অন্ধকার গাঢ় হলে জোনাকীরা ঘরে ঢুকে পড়তো যেন আমাদের কাঁচের জারে বন্দি হওয়ার জন্য। রাত বাড়লে কোন বাদুড় ডানা ঝাপটে উড়ে যেত জানালার পাশ দিয়ে। আমি ভয় পেতাম না মোটেও।

পরিষ্কার আকাশে তারার আলো দ্যীপ্তি ছড়ালে, কখনো কখনো বারান্দায় শুয়ে থাকার অনুমতি পেতাম। গ্রামের কোন অসুস্থ বৃদ্ধার মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করতো না, শুধু আগ্রহী করে তুলতো। তখন জানতাম মানুষ মরে গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। আমরা চারটি প্রানী বসে থাকতাম অনেক রাত পর্যন্ত।
হঠাৎ ছুটে যাওয়া তারা দেখে কেউ একজন বলত- " কিছু একটা কামনা করো, প্লীজ।"
আমি জানতাম না এর অর্থ কি!
আমি জানতাম না কিভাবে কামনা করতে হয়!

(এটি একটি স্মৃতিচারণ। মূল লেখাটি ইংরেজিতে, মার্কিন লেখক রাসেল বেকারের। ১৯৭৯ সালের ২২ এপ্রিল দি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ছবিগুলো নেট থেকে নেয়া )
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০৯
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:২৫



ক্লাস ফাকি দিয়ে তারা আড্ডা মারছে। এই দিকে পিতা মাতা হয়তো মনে করবে যে আমার মেয়ে ক্লাস করতে গিয়েছে। এই স্থানটি খুবই নিরিবিলি। দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। এমন ফাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×