গণকন্ঠ কর্তৃপরে ভাষ্য
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১শে মার্চ, ১৯৭৪ইং
গত ১৭ই মার্চ রাত ৩ টার সময় তিন ট্রাক বোঝাই রীবাহিনী ও পুলিশ কোনরূপ সরকারি নির্দেশ ছাড়াই গণকন্ঠ কার্যালয়ে প্রবেশ করে এবং সোমবার প্রকাশিতব্য শেষ ফর্মা (১ ও ৮ পাতায়) মেশিন হইতে নামাইয়া ফর্মাটি ভাঙ্গিয়া ফেলে। তাহারা কার্যালয়ের প্রতিটি করে জিনিসপত্র তছনছ করে ও কর্মরত কর্মচারীদের উপর নির্যাতন চালাইয়া ৭ জনকে গ্রেফতার করে। একই সময় বাসভবন হইতে গণকন্ঠ সম্পাদক কবি আল মাহমুদকেও গ্রেফতার করা হয়।
পীটার গীল ‘মুজিব একনায়কত্ব কায়েম করেছেন’ অভিমতে লিখেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তার দেশে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু লাথি মেরে ফেলে দিয়েছেন। গত শনিবার ঢাকায় পার্লামেন্টের এক ঘন্টা স্থায়ী অধিবেশনে মতাসীন আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শেখ মুজিবকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে এবং একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে মতা অর্পণ করেছে। অনেকটা নিঃশব্দে গণতন্ত্রের কবর দেয়া হয়েছে (সূত্রঃ ডেইলী টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ২৭ জানুয়ারী, ১৯৭৫)।
প্রেসিডেন্ট মুজিব- শীর্ষক আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অবস্থা যেমন আছে এবং মুজিব নিজে যেমন আছেন, তাতে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় জনসাধারণের কোন উপকার হবে না। রাতারাতি মুজিব পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র ছুড়ে ফেলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমস্ত কার্যকরী মতা গ্রহণ করেছেন। আমরা প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির সরকার বলতে যা বুঝি এটা ঠিক তা’ নয়। মুজিব যে সর্বাত্মক মতা দখল করেছেন তা মার্কিন প্রেসিডেন্টেরই নেই। (সূত্রঃ ফ্রনটিয়ার, কলিকাতা, ১ ফেব্র“য়ারী, ১৯৭৫)
২৫ জানুয়ারি ১৯৯৮ দৈনিক দিনকালকে আব্দুল্লাহ সরকার ও ময়েনউদ্দিন মানিক পৃথক পৃথক সাাৎকারে উল্লেখ করেন যে, ‘এই একদলীয় আইন পার্লামেন্টে পাস করার আগে কোন আলোচনা করতে দেওয়া হয়নি। প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আমরা সেদিন সংসদ থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম।
৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির বিশেষ ‘মতা’ বলে ‘সাপ্তাহিক মুখপত্র’ ও ‘স্পোকসম্যান’ সম্পাদক ফয়জুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামীরা চট্টগ্রামের দৈনিক ‘দেশবাংলা’ পত্রিকার অফিস জ্বালিয়ে দেয়। ৬ অক্টোবর এক নির্দেশ জারি করে আওয়ামী সরকার বলে, ‘সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেতার, টিভি ও রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের চিন্তা ও মতামত প্রকাশের পূর্বে সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। পূর্বানুমতি ছাড়া তাদের লেখা কোথাও ছাপা হতে পারবে না। (সূত্র দৈনিক বাংলা, ১৭ অক্টোবর, ১৯৭২)
পত্রিকা বন্ধের প্রতিবাদে বিকেলে জাতীয় প্রেসকাবে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে সম্পাদক আল মাহমুদ বলেন, ‘গণকন্ঠ অত্যন্ত বেআইনীভাবে বন্ধ করে দেয়ার ফলে পৌনে তিনশত সাংবাদিক-কর্মচারীরা বেকার হয়েছে। সাংবাদিক-কর্মচারীদের মূহুর্তমাত্র সময় না দিয়ে অফিস হতে কাজ অসমাপ্ত রাখা অবস্থায় বের করে দেয়া হয়েছে’। গণকন্ঠ বন্ধের ঘটনার বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক মহলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ৩১ মার্চ ২ ঘন্টার প্রতীক ধর্মঘট পালন করে এবং প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। (সূত্রঃ দৈনিক জনপদ, ১ এপ্রিল, ১৯৭৫)
ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্মল সেন কালাকানুন বাতিল আন্দোলনের এক প্রস্তুতি সভায় বলেন, ‘হাইজ্যাকার’ চোরাচালানী, কালোবাজারী, মজুতদার দমনের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্টের ৫০ নং আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু উক্ত দু®কৃতকারীদের বিরুদ্ধে এ আইনের সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। ব্যবহার হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এ আইনে উক্ত দু®কৃতিকারীরা গ্রেফতার হলেও উচ্চ মহলের তদবিরে মুক্তি বা জামিন পাচ্ছে’। তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীন দেশে কালাকানুন বহাল রাখা শহীদদের রক্তের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। শহীদদের নাম উচ্চারণের কোন অধিকার তাদের নেই।’ (সূত্রঃ দৈনিক জনপদ, ১৫ই আগষ্ট, ১৯৭৩)
১৯৭৪ সালের ৬ ফেব্র“রারি জাতীয় সংসদের মাধ্যমে পাস করা বিশেষ মতা আইন-১৯৭৪ দ্বারা সরকার প্রেস সেন্সরশীপের ব্যবস্থা নেয়ার অধিকারপ্রাপ্ত হয়। এই আইনে এমন সব বিধি-নিষেধ অন্তর্ভূক্ত হয় যার ফলে পত্র-পত্রিকায় প্রায় কোন কিছুই লেখা সম্ভব ছিলনা। ১৯৭৩-এর প্রিন্টিং প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স এ্যাক্টে আইয়ুবী আমলের বেশ কিছু ধারা ঢুকিয়ে দেয়া হলেও বিশেষ মতা আইনে শুধুমাত্র আইয়ুব আমলের কালাকানুন নয়, বৃটিশ আমল থেকে আইয়ুব আমল পর্যন্ত সংবাদ পত্র দলনের জন্য যত আইন প্রণীত হয়েছিল তার সবগুলো ধারা এ আইনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। (সূত্রঃ দৈনিক বাংলার বাণী, ১৪ জুলাই, ১৯৭৪)
১৯ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকে গণকন্ঠ সম্পাদক গ্রেফতার শীর্ষক সংবাদে বলা হয়, দৈনিক গণকন্ঠের সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে গতকাল সোমবার ভোর সাড়ে তিনটায় তাহার বাসভবন হইতে গ্রেফতার করা হইয়াছে। তাহার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আনয়ন করা হইয়াছে তাহা জানা যায় নাই। সকাল ১০ টার দিকে তাহাকে রমনা থানা হইতে কেন্দ্রীয় কারাগারে লইয়া যাওয়া হয়। জানা গিয়াছে যে, ঐ একই সময়ে রীবাহিনী টিপু সুলতান রোডস্থ দৈনিক গণকন্ঠ অফিস হইতে কাগজপত্র এবং সিদ্ধেশ্বরীস্থ গণকন্ঠের মুদ্রাণালয় হইতে সোমবারের পত্রিকার সিলোপিন সিজ করে। ফলে সোমবার পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ থাকে। গণকন্ঠ কার্যালয় হইতে তরিকুল্লাহ নামক এক প্রেস শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয়।
মেজর মোখলেছুর রহমানের ‘পঁচাত্তরের পনের আগষ্ট’ গ্রন্থে বলা হয়, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কমান্ডাররা দ্রুত বেতার বভনে আসেন। পরিকল্পনা মোতাবেক মেজর মহিউদ্দিন বেতার দখল করেন। মেজর ডালিম ভোর ৬ টা ১ মিনিটে ঘোষণা করলেন, আমি মেজর ডালিম বলছি- স্বৈরাচার শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। জননেতা খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মতা দখল করেছে। দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। সেনাবাহিনী প্রধান মেজার জেনারেল এম শফিউল্লাহ স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেছেন। তার জায়গায় সেনাপ্রধান নিয়োজিত হয়েছেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) পিএসসি, তিন বাহিনীর প্রধান নিয়োগ করা হয়েছে ব্রিগেডিয়ার খলিলুর রহমানকে এবং তাকে মেজর জেনারেল পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



