তখন ১৯৯৯-২০০০ শিক্ষাবর্ষ। জাবিতে সাবজেক্ট ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা হয়ে থাকে। নানারকম অভিজ্ঞতা ও প্রতিকূলতার মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে আমি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেও চান্স পেলাম সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি সাবজেক্টে। ভর্তি হওয়ার পরে আমার কপালে জুটল বিশ্ববিদ্যালয়ে মেন্টাল হসপিটাল নামে পরিচিত মীর মশাররফ হোসেন হল ( সংক্ষেপে এম, এইচ হল)। বিখ্যাত স্থপতি মরহুম মাযহারুল সাহেবের অসাধারণ এক নকশার মূর্ত প্রতীক এশিয়া মহাদেশের কথিত বৃহত্তম ছাত্রাবাসটি। প্রজাপ্রতি আকৃতির এই হলটির সৌন্দর্য নিজ চোখে না দেখলে বুঝা সম্ভব নয়। ছাত্রাবাসটির চতুর্দিকে একবার ঘুরে আসতে প্রায় ১ ঘন্টা সময় দরকার। হলটির স্থাপত্য শৈলীর কারনে সবগুলো কক্ষেই প্রকৃতির বাতাস প্রবেশ করে। ( এমনকি বাথরুম ও টয়লেটেও)। হল/ভবনটির অভ্যন্তরে বিশাল আকৃতির দু'টি পুষ্পসজ্জিত মাঠ রয়েছে। প্রথমদিন হলের কিছু অফিসিয়াল কাজ ও সিটের সন্ধান করতে গিয়ে আমরা নবাগত সবাই ভয়াবহ রকমের কিছু বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। আমরা যারা ভর্তি পরীক্ষার সময় হলে অবস্থান করেছিলাম তাদের তুলনায় যারা হলে একেবারেই নবীন তাদের বিপদ হয়েছিল অনেক বেশি। কারন ছাত্রাবাসটিতে নতুন কেউ প্রবেশ করলে কয়েক ঘন্টা ঘুরাঘুরি করলেও হল থেকে বের হওয়ার পথ /সিড়ি হয়তো শেষ হবে না। এমনকি পরবর্তীতে দেখেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সালাম-বরকত হলের ৪র্থ বর্ষের এক ছাএ এমএইচ হলের এ ব্লকের আমার রুম থেকে বের হওয়ার পর ঘন্টাখানেক ঘুরাঘুরির করে আবার আমার রুমে এসে লজ্জা ভেঙ্গে বলেছিলেন ছোট ভাই আমার সাথে একটু আসতে হবে , কারন আমি হল থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিনা। তাই - নিশ্চয় বুঝতেই পারছেন একজন নতুন ছাত্রের অবস্থা কি হতে পারে। সিট প্রাপ্তির আশা ও অফিসিয়াল কাজে হলের গেটে আসতেই আমাদের কে বিভিন্ন গ্রুপে ১/২/৩ জনকে হলের হাউস টিউটর পরিচয়ে বিভিন্ন বড় ভাইদের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার আমাদের সাথে যে আচরণ করা হয়, সেটা ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসে যে ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার কথা ২য় পর্বে লিখেছিলাম তার চেয়ে বহুগুন ভয়াবহ। এসব আচরণ এতটাই বিব্রতকর ছিল যে , তার একটাও ব্লগে লেখার উপযোগী নয়। কারো কারো ভাগ্যে ৫ থেকে ১০ বার পর্যন্ত এসব বিব্রতকর ঘটনা কপালে জোটেছিল।
নবাগতদেরকে দিয়ে যা যা সাধারনত করানো হয়-
১. জীবনে কখনো কোনোভাবে সেক্স করেছে কিনা কথার মার-প্যাচে বিব্রত করা
২. পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যদের জড়িয়ে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার
৩. সবার সামনে পুরোপুরি নগ্ন করে নাচানো
৪. সবার সম্মুখে চরম অশ্লীল চটি তথা খারাপ বই পড়তে বাধ্য করা
৫. সবার সম্মুখে বীর্যপাত করতে বাধ্য করা
৬. জোর করে প্রমান করানোর চেষ্টা করা যে নবাগত ছাত্রটি শিবিরের রাজনীতি করে।(এটা করতে পারলে পিটিয়ে মেরে ফেলার রেকর্ড আছে)।
৭. সবার সম্মুখে ২/৩ জনকে সমকামীতা বা গ্রুপ সেক্সে বাধ্য করা।
৮. দাত মাজার পেস্ট খাইতে বাধ্য করা।
৯. সবার সম্মুখে পর্ণো দৃশ্য দেখতে বাধ্য করা .....ইত্যাদি।
হলে প্রবেশের সময় দোতলা থেকে নবাগত কয়েকজন ছাত্রের উপর বোতল থেকে গরম পানি নিক্ষেপ করে উষ্ণ সম্বর্ধনা জানান তত্কালীন ক্ষমতাসীন দলের দুর্দর্ষ ক্যাডার পদার্থ বিজ্ঞানের ২৬ ব্যাচের মিঠু দা ( দাদা হিন্দু হলেও অজানা প্রায়ই কারনে খালি গায়ে হাফপ্যান্ট ও টুপি পরে থাকতেন)। আর এ উষ্ণ সম্বর্ধনার গরম পানি ছিল দাদার প্রস্রাব।
- এসব ঘটনার ফলে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে গিয়েছেন, আর ফিরেননি কোনোদিন।
- প্রচন্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হওয়া সিরাজগন্জের সরল ছেলে সজল যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে নির্যাতনের কয়েকদিনের মাথায় দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়।
- গভীর রাতে প্রচন্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার অনেককেই সেন্সলেস্ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল সহ বিভিন্ন মেডিকেলে ভর্তি করা হতো। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকেছে নীরব।
এমনকি মেয়েদের হলে ও বিভাগের বড় আপুদের র্যাগিং ছিল আরো ভয়াবহ রকমের খারাপ। পরের পর্বে সে ব্যাপারে লিখব , ইনশাল্লাহ্। আর পরবর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে নিজে অনেক কাহিনী দেখেছি ও শুনেছি, সেগুলো ধারাবাহিকভাবে লেখা চেষ্টা করব। (চলবে)
পর্ব ১
Click This Link
পর্ব ২
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


