এই গল্পের শুরু হতে পারতো আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে। স্থান বাংলাদেশের একটি মফস্বল শহর। অনায়াসে থাকতে পারে কিছু মানবীয় চরিত্র, তার অদ্ভুত রসায়নে কাহিনী হতে পারতো সমৃদ্ধ। কিন্তু এটি নিছক গল্প নয়। তাই সব কিছুই আজ অন্যরকম।
অননের সাথে আমার পরিচয় আমি স্কুল পাশ করার পর। সে তখন স্নাতক শ্রেণীতে পড়ছে। বিজ্ঞান বিষয়ে পড়া যে তার একদম ভালো লাগতো না তা আমাকে বহুবার বলেছে, আমি হেসেছি আর বলেছি আমি বিজ্ঞান পড়ব, সে কিন্তু হাসেনি। ছাত্রী হিসেবে তোমার সুনাম কম ছিলো না। অনন আমার ৪ বছরের সিনিয়র। অথচ আমরা কত সহজেই বন্ধু হয়ে গেলাম! মানুষকে সহজ ভাবে নেয়ার যে অসাধারন ক্ষমতা আমি তার মাঝে দেখেছি তা সত্যি বিরল। এই সরল বন্ধুত্বে আমার ছিলো সীমাহীন আব্দার আর তার ছিলো অপরিসীম ধৈর্য্য। বন্ধু হয়ে, বড় বোন হয়ে, আবার আমার কাছে তালিম নিতে আসা ছোট্ট শিশু হয়ে আমার সাথে তার সম্পর্ক বহুমুখী মাত্রা পেয়েছে। দু' জনের মধ্যে মিল বলতে সংস্কৃতমনা হয়ে লিটল ম্যাগ এর সাথে জড়িয়ে পরা। তার রাজনৈতিক বিশ্বাস আমার থেকে আলাদা, এমনকি জীবন দর্শন ও। কতদিন তার সাহসী, দৃঢ় উচ্চারণের কাছে আমার যৌক্তিক মসৃণ শব্দমালা হারিয়ে গেছে। আমি তখন থেকেই কবিতা লিখতাম, সে ছিলো আমার কবিতার নিয়মিতো পাঠক ও সমালোচক, আমায় প্রায়শই বলতো কবিরা স্বার্থপর, আবার পরক্ষণেই দেখেছি তার প্রিয় কবিতা থেকে উদ্ধ্বৃতি দিতে। এমন শৈল্পিক বৈপরিত্য তোমাকেই মানায়।
মনে আছে অনন, এক অলস দুপুরে তোমার পা ভাঙ্গার খবর পেয়ে হাসপাতালে তোমায় দেখতে গিয়ে বলেছিলাম - এই তোমাকে দেখতে আমার ভালো লাগেনা, কেনো জানিনা তোমার প্রাণচাঞ্চল্য না দেখে আমার খুব হতাশ লাগছিলো। আমাকে সুস্থ দেখাতেই বললে, আয় তোর সাথে আজ একটা জটিল বিষয় নিয়ে আলাপ করি। কত সহজে মার্ক্সবাদের যে ত্রুটি আছে তার বৈজ্ঞাণিক সমাধান কি হতে পারে তা নিয়ে বেশ বড় একটা লেকচার দেয়ার পর যখন বুঝলে আমি কিছুই বুঝিনি তখন তোমার হতাশা আমাকে আহত করেছে। শুধু বুঝতে পেরেছিলাম আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসে যে বামের প্রভাব রয়েছে তা শুধরে দেবার জন্য তোমার এই চেষ্টা।
অনন, আমি জানতাম ভিন্ন ধর্মের একজনকে তুমি ভালবেসেছিলে, তোমার পরিবার থেকে তা মেনে না নেয়ায় ভালবাসার জন্য তোমার লড়াই, সমাজের প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই, সব ই জানতাম। তোমার সাহসকে আমি শ্রদ্ধা করি। স্বার্থপর কবিমন আমার দুর থেকে এ লড়াই উপভোগ করতে চেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কয়েক বছর পর, একদিন তোমার এক বন্ধুর কাছে জানতে পারলাম তুমি কতগুলো অখন্ড অভিমানকে খুব বেশি ভালবেসেছো। আত্মহত্যা করে কি তুমি কি মৃত্যুকে আরোও বেশি ভালবাসলে?
আজ এই প্রবাসে তারাজ্বলা আকাশ দেখে তোমার কথা খুব মনে পরছে। তোমার সাথে আবার যেদিন দেখা হবে সেদিন আবার বোলোনা- তুই বড্ড উলটা- পালটা প্রশ্ন করিস কারন আমার যে খুব জানতে ইচ্ছে করবে- যে মানুষটি এত সাহসী, যে অসাম্প্রদায়িকতাকে তার নিজের ধর্ম মানে, যে সব ভুলে ভালবাসতে জানে তার কি এভাবে চলে যেতে আছে? সে কি এভাবে কিছু না বলে চলে যায়?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

