somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুদ্ধের কবিতা : আমার কখনো কিছু ছিলো না...

০৮ ই অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৪:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা, মানে নতুন প্রজন্ম যা শিখেছি, জেনেছি, অধিকাংশই পাঠ্যবইয়ের ভুল ইতিহাস থেকে সত্যটা বের করে, যুদ্ধ-সংক্রান্ত উপন্যাস-গল্প পাঠ করে... আমি যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পেরেছি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে। আমার নানা সশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন, তাঁর মুখ থেকে এবং পরিচিত আরো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যুদ্ধের সময়কার বাংলাদেশের কথা শুনে শিহরিত হয়েছি... সেই শিহরণ থেকেই একজন মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি এই কবিতায়... আরেকটা কথা এটা অতীতের একটা লেখার পুনরাবৃত্তি... এর আগে খণ্ড-খণ্ড আকারে লিখেছিলাম... অনেকটা অসম্পূর্ণই ছিলো! কোনো এক কারণে আমি কবিতাটা শেষ করতে পারছি না! এবার আপনাদের জন্য যেটুকু লেখা হয়েছে পুরোটা একত্রে তুলে দিলাম...


উৎসর্গ : ১৯৭১ এর সকল মুক্তিযোদ্ধাদের...

আমার কিছুই ছিলো না; নিতান্ত স্বপ্নহীন যুবকের মতো হাঁটছিলাম
এই বাংলার চির সবুজ মোহময় পথ ধরে... এক লাজুক কিশোরীর
সমুদ্রে ডুবসাঁতার কেটে হয়ে উঠছিলাম স্বপ্নগ্রস্ত। কিন্তু এইসব স্বপ্নের
অলীক মোহে খুব দীর্ঘকাল হতে পারলাম না স্থির ! যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল
এক ভীষণ যুদ্ধ... নিঃশ্বাস ফেলবার সময়টুকুও ছিলো না আমার।
কাশফুলের মতো মসৃণ কাঁধে লাফিয়ে উঠলো রাইফেল... ভারতে
শিখলাম যুদ্ধের কৌশল; কিন্তু এটাও জানি - যুদ্ধের আসল অস্ত্র হলো
হৃৎপিণ্ড। শুধু প্রয়োজন সেটার সঠিক ব্যবহার... এক প্রবল ঘৃণা।
শুধু ঘৃণাই দুমড়ে-মুচড়ে বিনাশ করে দিতে পারে শকুনের ঝাঁক !
মনে পড়ে, সেই যুদ্ধের অবেলায় রক্তলোভী হায়েনারা ধ'রে নিয়ে
গিয়েছিলো, সদ্য স্কুল পড়ুয়া কিশোরীটিকে... আমি নপুংসকের মতো
কেবল দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, ভীত চোখে, চোখে সুরমা দেয়া, মাথায়
টুপি পরা কয়েকজন বিষম রাক্ষস লোলুপ দৃষ্টিতে দর-কষাকষি করছিলো
সেই কিশোরীর কচি ধানের মতো স্বচ্ছ শরীর বেয়ে আজ রক্তের বন্যা
বইয়ে দেয়া হবে; সঙ্গমলিপ্সু প্রাচীন পাকিস্তানি কুকুরের দল ছিঁড়ে
ছিঁড়ে খাবে কিশোরীর রক্ত-মাংস !

আমি কিছু্ করতে পারিনি; না...
আমি কিছুই বুঝতে পারি নি। তবে বুঝে উঠছিলাম কেবল... সেই
২৫ মার্চের রাতেই স্থির হয়ে গিয়েছিলো; জল-কাদা-বৃষ্টির সবুজ গ্রাম
ছেড়ে পাড়ি দিলাম রণক্ষেত্রে। একটা ময়লা লুঙ্গি, হাফ-হাতা সবুজ সার্ট
আহা ! কতবার যে ছিঁড়ে গিয়েছে; নাকের 'পর দিয়ে চলে গেছে তীরের
মতো ছুটে আসা শত্রুর বুলেট... হিসেব নেই। মনে পড়ে, কামানের
গোলা বৃষ্টির মতো ছুঁড়ে হত্যা করা হয়েছিলো এক নবীন সহযোদ্ধাকে।
আমি ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, মরি নি, মৃত্যুভয় ফুলের পাঁপড়ির মতো
ছিঁড়ে গিয়েছিলো। খুব কাছাকাছি এসেও কিছু করতে পারিনি, কিছুই করতে পারিনি... সশস্ত্র এক মুক্তির যোদ্ধা হয়েও আমাকে ডুকরে কাঁদতে
হয়েছিলো। সঙ্গীর বিমর্ষ লাশের ওপর সারি সারি লাল পিঁপড়ের দল উদভ্রান্তের মতো হাঁটছে, হেঁটেই যাচ্ছে, কোনো ক্ষোভ নেই, ক্লান্তি নেই, মৃত্যু নেই, স্বপ্ন আছে ! দেশকে স্বাধীন করতে হবে, রক্তলোভী পশুদের হাত থেকে কেড়ে নিতে হবে সবুজ-লাল পতাকা, এই স্বপ্ন বুকে বেঁধে আবারো অস্ত্র তুলে নেই, পরের দিন, সাথে তিনজন সহযোদ্ধা, আছে প্রাইমারি স্কুল পড়ুয়া এক কিশোর, যে গোপন খড়ের গাদায় লুকিয়ে দেখেছে- বোনের শ্লীলতাহানি, মায়ের আর্তচিৎকার, ধর্ষণ... ধর্ষণ কেবল... ঘৃণা আসে, মুখ ভর্তি ঘৃণা... দেশমাতার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে পিশাচগুলোকে কেবলই ধর্ষণ করতে দেখি, আরো এক লুক্কায়িত ক্রোধ ঝিলিক দিয়ে ওঠে আমার গোপন অভ্যন্তরে, বুকের খুব ভেতরে...

এবারের সশস্ত্র যুদ্ধে শাণিত হবে তরবারি, সৌরযুদ্ধে ঝলকিত তীর-লাঠি
বল্লম, মায়ের শাড়ির আঁচল, নক্ষত্র, ক্ষুধার্ত শিশুর চোখ...ওরা
এসব ধ্বংস করেছে, এরা এসব হত্যা করেছে নিজ হাতে, জ্বলে
উঠছে সবুজ গ্রাম, যে গ্রামে কেটেছে আমার নিহত শৈশব, চাতকপাখি,
বিরহী শ্রাবণ, মেঘদুপুর, প্রেমিকার উষ্ণ চিবুক, হঠাৎ বিধ্বংসী
সবুজ পতাকা, মাঝখানে সাদা চাঁদ জ্বলে উঠতে দেখি মসজিদ-মিনারে...
একমুহূর্ত বিলম্ব না করে, বীরদর্পে সহযোদ্ধাদের পাহারায় রেখে ছিন্ন
করি ঐ নগ্ন পতাকা, যে পতাকা কেড়ে নিয়েছে আমার পরিবার, প্রেম,
ভীষণ তার্কিক শিক্ষক, যে পতাকার মাঝখানে খচিত আজন্ম অন্ধকার-রাজাকার! আর আমার নিহত স্বজনদের লাশের জ্যান্ত প্রতিমূর্তি যে
পতাকা, গাঢ় সবুজের মাঝে লাল বৃত্ত আঁকা, মাঝখানে তার হলুদ মানচিত্র...যে মানচিত্রের শপথ নিয়েছি আমি, পাথরের জমিনে বসে, ইস্পাত-দৃঢ় এলএমজি হাতে নিয়ে, ওদের আছে কামান, গোলা, মর্টার, গ্রেনেড, আর আমাদের লাঠি-বল্লম, কৃষকের সোনালি ফসল পুড়ে ছারখার ধূসর, কোথাও-বা রক্তের লাল রং-ধর্ষণ! রক্তাক্ত পাটক্ষেত, রোকেয়া হল... আহা! এ যে রক্তের স্বাধীনতা...অর্থহীন উপাসনা, উপবাস, আলপনা।
এই রক্ত অনেক টাকায় বিক্রি হবে, এই রক্তের বদলে ওরা পাবে পেট্রোল, ফুয়েল, আমাদের মা-বোন, উপাসনালয়গুলোতে গড়ে উঠবে ধর্ষণকক্ষ, ব্রোথেল হাউস...ওরা মানুষ না, ওরা পশ্চিম পাকিস্তানি, ২৫ মার্চের আগে সেটাই জেনেছি আমি, তবে ওরা মানুষের মতোই কঠিন, মানুষের চেয়েও হিংস্র চতুষ্পদ জন্তু, ওরা আমাদের ত্রাণকর্তা, ধর্ষণযজ্ঞে পারদর্শী দুপুর-বিকাল-সকাল-রাত্রি-নক্ষত্র-জোছনা-নস্টালজিয়া আর মৃত সরীসৃপের মিছিল! ওদের হীনতায় ধর্ষিত এই মাতৃভূমির পবিত্র দেহ, রেজাকার-আল বদর-আল শামস্, গোলাম আযম-নিজামী-মুজাহিদ, ওরা শকুন, ওরা নগ্ন, ওরা কাপুরুষ, ওরা লুণ্ঠিত বিবেকের দোসর! আমি হাতে গ্রেনেড তুলে নেই, নিজেই ধ্বংস করি একের পর এক পাক-সেনা, আমি বাঙালি, আমার যে মন খারাপ হয়, হত্যা, রক্তপাত, চাই না আমি আর...

অবশেষে পেলাম দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা... মাতৃগর্ভে শিশু সুপ্ত অবস্থায় থাকে দশ মাস দশ দিন; বাংলা ফিরে পেলো স্বাধীনতা দীর্ঘ নয় মাস পর, অনেক ধর্ষণ-রক্ত-মিছিল-ধ্বংসের পর, অনেক নারকীয় পিশাচ-উল্লাসের পর... অনেক মৃত্যুর পর... ভূমিষ্ঠ হলো এক অপরিণত শিশু : বাংলাদেশ যার নাম....

আজ এই স্বাধীন বাংলাদেশের পরাধীন বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে
আমি, এক যুদ্ধাহত কাপুরুষ মুক্তিযোদ্ধা...
সতর্ক চোখে দেখি- সেই যুদ্ধাপরাধীদের
যাদের লালসায় আত্মহত্যা করেছিলো সেই মেয়েটা
একটা নয়, অনেকগুলো মেয়ে, কন্যাশিশু...
আজ কান পেতে সর্বত্র তাদেরই পদধ্বণি শুনি
অবশ হাত দু'টোর মুঠো শক্ত হয়ে আসে;
যদি আর একবার যুদ্ধে যেতে পারি...
মুহূর্তেই চোখে পরে ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটা এক বৃদ্ধের ছবি
যে বৃদ্ধটি নিজেই আমি! সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনীতির ব্যবসা...
আধপোড়া ত্রাণ, মুক্তিযোদ্ধা-ভাতা, মাঝে মাঝে রাজাকারদের
আয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ, মিটিং, মিছিল...
এমন বাংলাদেশ কী কারো স্বপ্নে ছিলো?
ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ উন্মাদ আমি, যদি আবারো কোনোদিন...
যুদ্ধে যেতে পারি... চিন্তার সুতো কেটে গেলে দেখি-
জানালার পাশে এক হিংস্র উন্মাদ, পাড়ার সবাই যাকে ডাকে
পাগল নামে, একটা সবুজ রঙের পতাকা খাচ্ছে ছিঁড়ে...
সর্বনাশ! বাঁকা এক সাদা চাঁদা আঁকা সেখানে!
এইতো আমরা বীর (!) মুক্তিযোদ্ধা... ব্যবসায়ীদের দাপটে
আজ বেশ আছি... বড় সুখে আছি!
যতদূর জানি, এই যুদ্ধ শেষ না করে
বিদায় নিচ্ছি না আর!


(অসম্পূর্ণ!)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৪:৫০
৬টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×