১.
ইভটিজিংয়ের কারণ হিসেবে অনেকেই নারীদের/মেয়েদের/মহিলাদের 'পোশাক' পরিধানকে শান দেয়া ধারালো যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন প্রত্যাশিতভাবেই। কিন্তু তাদের এই অকাট্য যুক্তি অনেকটাই খোঁড়ালো ঠেকে এ কারণেই যে, পোশাকের মতো একটা অবজেকটিভ ম্যাটেরিয়াল ক্যামনে ইভটিজিংয়ের একমাত্র প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়? ইভটিজিং বাংলাদেশের মারাত্মক একটা সমস্যা যেটা এখন মিডিয়াতে প্রচার হতে হতে অনেকটা জনপ্রিয়তার শীর্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। এই বিষয় নিয়ে তৈরী কম্পিউটার গ্রাফিক্যাল পোস্টার (যেটা ধূমপান করুন পুরষ্কার জিতুন এর কার্বন কপি) মানুষকে নিরুৎসাহিত তো করতে পারেই নাই বরং উল্টা মজার বিষয়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে গিয়েছে। এসব ফাজলামি বাদ দিয়ে সিরিয়াস হবার অভ্যাসটা হয়তো বাংলাদেশিদের নেই কিন্তু খুব লক্ষ করলে দেখতে পাবো, যারা পোশাক- পোশাক, উগ্র পোশাক, অর্ধনগ্ন পোশাক পরিধানকে কারণ হিসেবে দেখান তাদের মন-মানসিকতা কতটা সংকীর্ণ?
২.
ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া-ব্যাংকক এসব দেশের মেয়েদের পোশাক পরিচ্ছদের চাইতে বাংলাদেশি একজন গ্রাম্য বা শহুরে মেয়ে যথেষ্ট শালীন (শালীনতার সংজ্ঞা আমার ঠিক জানা নেই) পোশাক পরে। এসব পোশাক পরিহিত নারী দেখলে লিঙ্গ উত্থিত হয় এবং তারপর পুরুষ তার পুরুষত্ব জাহিরের জন্য 'ইভটিজিং' বা অশ্লীল কটূক্তি করে, যদি তাই হয়, তাহলে বলতে হয়, আমাদের পোশাক নিয়ে ফেটিশিজম আছে! এটা আমাদের সংকীর্ণতার পরিচায়ক এবং শুধুমাত্র আমাদের বিকৃত যৌনচিন্তা বা যৌনাভ্যাসকেই প্রকাশ করে। যদি একজন পুরুষ তার ইচ্ছেমতো হাফ লেডিস পোশাক পরতে পারে তাহলে একজন নারীও কেন জিনস-টিশার্ট পরতে পারবে না?আজকাল তো গে-টাইপের ছেলেরাই ঢাকা শহরে কানে দুল পরে, গুলশান-বনানীর জিগোলো গ্রুপ এর জিনিসগুলা ডান হাতে রুমাল বাঁধে, অর্ধনগ্ন কিংবা খালি গা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। ছেলেমানুষ বলে কথা! আরে ওটা তো হয় মেয়েদেরকে বা ছেলেদেরকে আকৃষ্ট করার জন্যই। এখন কেউ যদি যুক্তি দেখায় মেয়েরা নিজেদের রূপ সৌন্দর্য বিলিয়ে দেবার জন্যই শর্ট স্কার্ট পরে, স্লিভলেস ড্রেস পরে ইত্যাদি ইত্যাদি তাহলে এটাই বলতে হয়, 'বিলিয়ে দেয়া'র অর্থটা কি এখানে? এমনও তো হতে পারে এবং এটাই সত্য কমফোর্ট ফিল করার জন্যই এসব পোশাকের প্রচলন আর খোলা রাস্তায় কিভাবে কেউ সব বিলিয়ে দেয়, আমার জানা নাই! বাংলাদেশের মেয়েদের প্রধান পোশাক শাড়ি। সব মেয়ে কিন্তু পহেলা বৈশাখে, বসন্ত বরণে, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির অনুষ্ঠানে এই পোশাকই পরে এবং সেখানে অশালীন কিছুই নেই। কাজেই আগে নিজেদের পয়েন্ট অব ভিউটা সহীহ্ করা দরকার। শুধুমাত্র পোশাক-পরিচ্ছদ একটা 'সুইসাইড কেস' এর মধ্যে আনার দরকার নেই। আর আমার মনে হয় এটাকে 'ইভটিজিং' না বলাই ভালো।
৩.
'ইভটিজিং' শব্দটাই নারীকে ডোমিনেন্ট করে এবং শেষে 'টিজিং' অংশটুকু বেশ মজার এবং উপভোগ্য। টিজিং হলো কাউকে উত্যক্ত করা। অনেকেই অনেকভাবে অনেককে উত্যক্ত করে তাই বলে সেটাকে কি 'ইভটিজিং' বলা যায়? ইভটিজিং জিনিসটায় 'টিজিং' এর চেয়ে পরের 'এফেক্ট'টা তাৎপর্যপূর্ণ আর সেটা হলো, 'সুইসাইড'। মেয়ে স্কুলে পড়তে গেছে রাস্তায় বখাটেরা তাকে 'ইভটিজিং' করলো আর সেই মেয়ে বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার না খেয়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে নিজেকে নিজে হত্যা (সুইসাইড) করলো... সবার ক্ষেত্রেই ঘটনা একই। একজন নারী/মেয়েরও উচিত না নিজের সুন্দর জীবনকে এভাবে একটা বাজে ঘটনায় শেষ করে দেয়া। অবশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছোট থেকেই আমরা ছেলেদের একটু গুণ্ডা বানাতে পছন্দ করি। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা না চাইলেও বন্ধু-বান্ধব-বড়ভাই-সোনাভাইরা চায় ছেলে একটু 'সেয়ানা' হোক, মেয়েদের উত্যক্ত করে নিজের 'পুরুষত্ব' জাহির করে আসুক! এটাই আমাদের যৌনবিকৃতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আর মেয়েরা তৈরী হয় ছেলেদের নানা উত্যক্তের মধ্য দিয়েই স্কুল-কলেজে ছেলে-মেয়ে আলাদা করে তাদের মধ্যে একটা জেন্ডার বৈষম্য তো আমাদের মহান শিক্ষকেরাই করে থাকেন। একসাথে মিশতে দিলে সমস্যা কি? ছেলে-মেয়ে ভালো বন্ধু হতে শিখলে উভয়েই সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বড় হবে। কিন্তু আমাদের পারভার্ট স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা হয়তো নিজেদের সাথে নতুন জেনারেশনকে মিলিয়ে এই ভুলটা করেন! প্রশ্ন হলো স্কুল-কলেজ ড্রেস পরা মেয়েরাই তো বেশিরভাগ উত্যক্তের শিকার হয়, তাহলে যারা যুক্তি দেখান পোশাক আর পোশাকের তাদের মনে কি এটা আসে না, স্কুল-কলেজ ড্রেস কি অর্ধনগ্ন?
৪.
সব দেশেই দু-একটা মিলা-তিশমার মতো কিছু বিখ্যাত (!) সঙ্গীতজ্ঞ থাকবেই যারা নিজেদের কর্কশ কণ্ঠের চাইতে শাকিরা-ব্রিটনির হাঁটা-চলা নকলেই বেশি পারদর্শী হবে! এই দু-একজনের জন্য তো পুরো নারীজাতিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কট্টর বদমাশ হুজুরদের মতো আমাদের এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনাটা জরুরি। ছাগলের মতো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে পোশাককে ইভটিজিং বা ফিমেল সুইসাইডিং এর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো যুক্তিসম্মত নয়। বরং এটা পুরুষদের ফেটিশিজম : সারাক্ষণ বাজে চিন্তায় বিভোর থাকা। এজন্য ছোট থেকে একটা ছেলেকে যেমন মেয়ে সম্পর্কে সুন্দর ধারণা দিতে হবে একটা মেয়েকেও সাহসি করে তুলতে হবে যে মোটেও এই সমাজ ব্যবস্থায় ভেঙে পড়লে চলবে না। তোমাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ইভটিজিংয়ের জন্য নতুন আইন করা হয়েছে। চাইলে অনেক নির্দোষ কিশোরকেও ফাঁসিয়ে দেয়া হতে পারে 'ইভটিজিং' কে কারণ হিসেবে দেখিয়ে। এ বিষয়টাতেও সতর্ক থাকাটা জরুরি। পুলিশ এর অর্থ উপার্জনেরও নতুন একটা রাস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই 'ইভটিজিং'। ছেলে ধরে নিয়ে আসছে, মোটা অংকের টাকা নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে... এটা আশঙ্কার বিষয়। তবে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে অবশ্যই বিচার করতে হবে। রুমি, সিমি, মাহির মতো নিরীহ কিশোরীদের যেন আর মরতে না হয় এর জন্য গোটা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। এদের কেউই কিন্তু উগ্র পোশাকের জন্য মরে নাই। ভুল চিন্তাকারীদের ভুল ধরিয়ে দেয়া হলো।
নির্ঘন্ট :
ফেটিশিজম : মানুষের শরীর, বস্তুবাচক কোন কিছুর প্রতি যৌন আকর্ষণ। ক্লদিং ফেটিশিজম বলে একটা ব্যাপার আছে যেটা মেয়েদের কাপড়ের প্রতি যৌন আকর্ষণ।
জিগোলো : অর্থের বিনিময়ে যে সমস্ত পুরুষ যৌনকর্ম সম্পাদন করিয়া থাকেন!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

