ঠক্ ঠক্,............ ঠক ঠক ঠক............ ঠক , ঠক, ঠক, ঠক।
শব্দটা হচ্ছে অ-নে-কক্ষন। সম্ভবত দরজায়। এবং সম্ভবত হাসান আলী। কারণ নীলের চেনা জানা মানুষদের মাঝে এই একটি মাত্র মানুষের ধৈর্য্যই অসীম পর্যায়ের।
পাত্তা না দিয়ে আবার ঘুমাতে চেষ্টা করে নীল। সূর্য মাথার উপরে উঠে গেছে অনেক আগেই। ঘর ভরা কটকটে রোদ্দুর। এর মাঝেও ঘুমাতে পারছে কারণ বিছানায় এসেছে ভোর হবার পর।
ঠক্ ঠক্,............ ঠক ঠক ঠক............ ঠক , ঠক, ঠক, ঠক।
আরও অনেকটা সময় ঘাপটি মেরে থাকার পর দরজা অবশেষে খুলতেই হয় নীলকে। হাতে টাকা- পয়সা একদম নেই। পাঁচটা টাকা পকেটে থাকলেও হাসান আলীর ধড়িবাজ চেহারাটা দেখে দিন শুরু করতে হতো না আজ।
কত হবে হাসান আলীর বয়স?
৩৫ থেকে ৪৫ মাঝে যে কোনোটি হতে পারে। কিংবা বেশি। শুকনো, কালো দড়ির মত পাকানো একটা মানুষ। থুতনীতে অল্প কিছু ছাগুলে দাড়ি, জাবর কাটার মতন করে সর্বক্ষন পান চিবুচ্ছে। লোকটার আগাগোড়া থেকে কেমন একটা লোভাতুর গন্ধ আসে সবসময়েই। মাথায় আবার টুপিও আছে, চোখে সুরমা। এতে চেহারায় একটু ধার্মিক, পবিত্র ভাব আসার বদলে চামার ভাবটা আরও বেশি প্রকট হয়। কে জানে, পেশায় দালাল বলেই হয়তো!
"অসুবিধা হয় নাই, নীল বাই! আফনে ঘুমাইতেছিলেন, আমি জানি। অর্টিস মানুষের কামে মনে দুঃখু পাইতে নাই।"
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীল, "তত্ত্ব কথা শোনার মতো মেজাজ নাই, হাসান আলী। কাজের কথা থাকলে বলেন।"
একটা চেয়ার টেনে বসে হাসান আলী। জানালা দিয়ে পানের পিক ফেলতে গিয়ে পরনের কাপড়ে মাখামাখি করে ফেলে।
"কাজেই তো আসছি। কাজ ছাড়া আসবো ক্যান? তার আগে নিচে চলেন, নাশতা খাইয়া আসি। রমজান আলী গরম গরম পরোটা ভাজতেছে..."
"নাশতা খাবো না। কাজের কথা বলেন।"
"একটু চা তো খাইবেন... .. .." হাসান আলী বলতে বলতেই চা চলে আসে। রমজান আলীর হোটেলে মাস কাবারি ব্যবস্থা করা। নীলের তিন বেলা খাওয়া, চা-পানি সব পৌছে যায় সময় মতো।
সুড়ুৎ শব্দ তুলে চায়ে চুমুক দিতে শুরু করে হাসান আলী। "৪ তারিখের ডেলিভারীটা হয় নাই ক্যান, নীল বাই? আপনে বলছিলেন গতকাল সকালে দিবেন। আমি সারাদিন রমজান মিয়ার হোটেলে অপেক্ষা করছি।"
এবার একটু চিন্তিতই হয় নীল। মেজাজও নরম হয়ে আসে।কেননা হাসান আলী তার রোজগারের উৎস। নীলের ছবি বিক্রি করে সে।
কোথায় কার কাছে বিক্রি করে সে ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই নীলের। দাম কেমন পায়, তাও না। অবশ্য নীলকে টাকা পয়সা ভালোই দেয়। কিন্তু দাম জানতে চাইলে বলে- "বিশ্বাস করেন, নীল বাই! এই মরা কাঠ ছুঁইয়া বলতাছি, আমার লাভ হইছে মাত্র ৫০০ ট্যাকা। কেমনে যে পুলাপান গুলারে খাওয়াবো এতগুলা দিন... ..।"
বিখ্যাত হবার স্বপ্ন নীলের বুকেও ছিল একটা সময়। এখনও আছে । কিন্তু একটা সুযোগ, একটা এক্সিবিশনের সুযোগের জন্য যখন দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে একটা বছর; খেয়ে না খেয়ে যখন ঘুরেছে রাস্তায় রাস্তায় কিংবা বন্ধুদের হলে - সব স্বপ্ন তখন এক পাশ সরিয়ে হাসান আলীকেই ভরসা করতে হয়েছে। বাড়ি ফিরতে পারেনি, কারণ বের হয়ে এসেছিল মাথাটা অনেক উঁচু করে। সে সময়টাতে নিজের অহংকারকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল একমাত্র তাগিদ।
নীল পায়নি হাসান আলীকে,হাসান আলীই কীভাবে কীভাবে খুজে নিয়েছে তাকে। এবং কথাও রেখেছে নিজের। কী করে যেন নীলের একটা এক্সিবিশনের ব্যবস্থা করে ফেলে সে প্রতিবছরই। নীলকে পরিচিতি পাইয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়না। মাঝে মধ্যে আবার পরামর্শ দেবারও চেষ্টা করে -"আপনে আর্টিস মানুষ, এইডা বুঝলাম। কিন্তু অন্য কিছূ কাজ কাম করেন না ক্যান, নীল বাই। সংসার তো পাতবেন, নাকি ? ছেলে পেলের বাপ তো হওয়া লাগবো। এমনে কি দিন চলে?..."
নীল অবশ্য কোনো মুহুর্তেই এসব পরামর্শকে পাত্তা দেয়নি এতটুকু। সে প্রশ্নই ওঠে না।
" ডেলিভারির কথা মনে ছিল না।" হাসান আলীকে সত্যটাই বলে নীল। "আরও ২/১ দিন সময় লাগবে।"
'এইটা কেমন কথা হইলো? আমার মাথার উপরে বুইড়া ভামটা লাফাইতেছে। জীবনটা তামা তামা কইরা ফালাইলো....."
"বুড়ো ভাম" মানে হচ্ছে মাকসুদ কামাল। কোটিপতি ব্যবসায়ী। নীলের অনেকগুলো ভালো কাজ আছে তার সংগ্রহে। মানুষটা সত্যিই বিশ্বাস করে যে নীল একদিন অনেক বিখ্যাত হবে। নীল আহসানের "ফ্যান" সে রীতিমতো!
হাসান আলী নিজের মত বকবক করেই যাচ্ছে। সবসময়ই যেমনটা করে।
" ......... শখ কইরে নিজের বউয়ের একটা ছবি আঁকতে দিলো আপনেরে, আর আপনে............ এইডা একটা কাজ করলেন, নীল বাই ? আইজ স্যারের বউয়ের হ্যাপি বাথ ডে, ছবিডা হইলো গিপ্ট। এখন গিয়া কি জবাব দিবো আমি? আপনেই বলেন............"
"আচ্ছা ঠিক আছে, বুঝলাম তো। আপনি কাল সকালে আসেন।"
"বুঝেন নাই .... কিছুই বুঝেন নাই আপনে। ম্যাডামের হ্যাপি বাথ ডে- তো আইজকে...... নীল বাই।"
"লাভ নেই এসব বলে। কালকের আগে হবেনা।"
" তাইলে অন্য কিছু দ্যান। আপাতত নিয়া যাই। কিছু বুঝাইতে চেষ্টা করি।"
"অন্য কিছু ও নেই। কাল আসেন। পোট্রেটটা করে রাখবো। ভদ্র মহিলার ফটোগ্রাফটা আছে আমার কাছে। হারিয়ে ফেলিনি।"
"অসম্ভব । আইজকেই লাগবে। আমি না হয় ওই গুলান থেইকে একটা নিয়া যাই?"ঘরের কোণায় ফেলে রাখা মোড়কবন্ধ কিছু ছবির দিকে ইঙ্গিত করে হাসান আলী। আগেও বেশ কয়েকবার এমন চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু লাভ হয়নি কোনো। ছবিগুলোর মোড়ক খুলতেই কেন যেন রাজি নয় নীল। এ প্রসঙ্গ ওঠা মাত্র ক্ষেপে ওঠে সে। এবং এবারো ব্যতিক্রম হয় না।
"আপনার অতো মাতব্বরি করার দরকার নেই। বসেন, আমি কাজ শুরু করি।"
নীলের মেজাজ দেখে অবশ্য কথা বাড়াতে হাসান আলীর আর সাহেস কুলায় না। মন মানে না তবুও।
কি আছে ওই মোড়ক গুলোর আড়ালে? কেউ ছুতে গেলেই নীল ভাই অমন তেড়ে আসে কেন? এমন করে,যেন কেউ তার আত্মায় হাত দিচ্ছে.... ....
অনেক চেষ্টা করেও ব্যাপারটা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি হাসান আলী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


