শেষ হয়েছে। হাসান আলী এসে খুব সাবধানে ছবিটাকে নিয়েও গেছে। ভালো হয়েছে কাজটা, আশা করা যায় আগামীকাল নাগাদ পেমেন্ট পৌছে যাবে হাতে।
কিন্তু স্রেফ ভালোই হয়েছে। স্রেফ ভালো!
কাজ শেষ হবার পর যে তৃপ্তি আর প্রশান্তি টুকু পাবার কথা ছিল,অনুভব গুলো তার ধারের কাছেও পৌছাতে পারছে না। স্পর্শ করতে পারছে না অনুভুতির সেই শিখর গুলোকে,যাকে স্পর্শ করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে শিল্পী সৃস্টি করে। কিছুণের জন্যে স্রষ্টা হয়ে ওঠে আপন পৃথিবীর।
স্রষ্টা। অথবা ইশ্বর।
শিল্পী অর্থই বোধ হয় নিজ ভুবনের ইশ্বর।
চরম হতাশায় নিজেকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলতে ইচ্ছা হয়; যেন কাঁচের কোনো পুতুল। অথবা জ্বালিয়ে দিতে ইচ্ছা করে নিজেকে, আগুনের ভয়ংকর- সুন্দর ভালোবাসায়। নিজের মাঝেই পথ হারানো শিল্পী কংক্রিটের দেয়ালটাকে আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকে অনেকক্ষণ। যেন সাদা এই দেয়ালটিই তার পরিবার,আপনজন- কাছের মানুষ। যেন এই দেয়ালটিই দূর করে দেবে অস্তিত্বেতের মাঝে ভয়াবহ অনুপূর্নতাকে।
মোৎসার্টের বাজনা বেজে উঠতেই আজ ফোন ধরে নীল। এবং অনুভব করে.. ..অনুভব করে যে কন্ঠস্বরটা শোনামাত্র তার মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কি যেন ছড়িয়ে পড়ে এক টুকরো নরম আলোর মত। এক টুকরো কষ্ট কষ্ট সুখ । কিংবা প্রশান্তি। দীর্ঘদিন পর ঘরে ফেরা মানুষের যে অনুভব হয়,অনেকটা সে রকম।
"আজও হয়নি রে, আফি!!"
" কি গো ? তোর মাস্টারপিস?"
" হুঁ............"
"কত বছর হলো ছবি আকঁছিস? পনেরো, তাইনা?"
'আর পনোরো বছরে একটা মাস্টারপিসের স্রস্টা হতে পারিনি! অথচ এক সময় মনে হতো দারুন আঁকি। নিজেকে অতিক্রম করার মতা আমার আছে।"
"তা তো আছেই। অবশ্যই আছে। তুই আগাগোড়া একজন শিল্পী।"
" কিসের শিল্পী? দীর্ঘ আট-টা বছর যে সৃষ্টির আনন্দ পায়নি, তাকে তুই শিল্পী বলবি? তাকে কি শিল্পী বলা যায়?"
" অবশ্যই যায়।"
" না, আফি। যায় না। এতগুলো বছর পার হয়ে গেলো জীবনে, অথচ একটা মাস্টারপিসের স্রষ্টা হতে পারিনি আমি। কখনও ধারের কাছে পর্যন্ত যেতে পারিনি।"
" শিল্পীর জন্যে সময় স্থির। আর তোর সামনে পুরো জীবনটা পড়ে আছে। একদিন মনের মতো একটা মাস্টারপিস ঠিকই আঁকা হবে। যেদিন মৌ- কে বিয়ে করে আনবি, হয়তো সেই দিনই!"
"হ্যাঁ, হয়তো।"
" নতুন তারিখটা কবে ?"
" কিসের ?"
" কিসের আবার? বিয়ের!"
হেসে ফেলে নীল। "কি করে জানতে পারিস এসব তুই?"
" কমনসেন্স, সাহেব। কমন সেন্স। আপনার মতো পুরুষের আকর্ষণ ছেড়ে পালাতে পারবে, এমন নারী বাংলাদেশ আছে নাকি?"
" নেই?"
" একদম না।...... আচ্ছা বিয়েতে সাক্ষী কারা থাকবে?"
"কেন ? তোর বুঝি সাক্ষী হতে ইচ্ছা করছে?'
" খু-উ-ব । সিল্কের পাঞ্জাবিতে কি করে ঘামিস- দেখতে হবে না!"
"ঠিক আছে, আসিস না হয়।" উদার কণ্ঠে অনুমতি দেয় নীল।
" ঠিক আগের দিন তারিখ জানতে পারবি। আমি নিজে জানাবো।"
"আট বছর পর তাহলে সত্যি দেখা হবে?"
" কিন্তু এটাই শেষবার!"
" হ্যা.................... সত্যি এবং শেষ।"
বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সংযোগ। আফসানাই করে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন হবার পরেও "আট বছর" কথাটি অনেকক্ষণ আটকে থাকে নীলের বুকের মাঝে। অ-নে-ক অনেকক্ষণ ।ঘোরাফেরা করে খাচায়বন্ধ পাখির মতো।
আট বছর! আটটি বর্ষা.......... আর দীর্ঘ আট বসন্ত।
এতগুলো বছরে সে কেবল আর্টিস্ট হয়েছে। শুধুই একজন আর্টিস্ট । মানুষ হয়ে ওঠাকে বিসর্জন দিয়ে প্রাণপন চেষ্টা করেছে শিল্পী হবার। বিশুদ্ধতম এক শিল্পী- রঙ, তুলি, ক্যানভাস ছাড়া যার অস্তিত্বে অন্য কোনো কিছুর ছায়া পর্যন্ত নেই । কখনও ছিল না।
কিন্তু পেরেছে কী সে ?
নিশ্চয়ই পেরেছে।
জীবনের স-ম-স্ত কিছু উৎসর্গ করে নীল শিল্পী হয়েছে। কেবল একটি মাস্টার পিসের স্রষ্টা হতে পারেনি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



