দুপাশের জানালা গুলোতো পাল্লা দিয়ে ঢুকছে আর্দ্র বাতাস। ভেজা, মাটির গন্ধ মাখা সুবাস।
এ হাওয়ার পথ রোধ করে দেয়া উচিত, জানে নীল। কারণ এটা তার বাড়ি নয়, স্টুডিও যেখানে সামান্য একটু পরিসরে সে নিজের ঠাঁই করে নিয়েছে। আর্দ্র বাতাস ছবিগুলোর সর্বনাশ করে দেবে চিরতরের জন্য।
মৌ দাঁড়িয়ে ছিল জানালার ধারে। বৃষ্টি শুরু না হলে নাকি এখান থেকে এক পাও নড়বে না সে। অবশ্য সত্যিকারের কারণটা হচ্ছে লোডশেডিং। অন্ধকার সিড়ি বেয়ে নামতে বেচারীর ভয় করবে। নীলের ঘরে সামান্য একটা মোমবাতি পর্যন্ত নেই।
প্রেমিকার পাশে এসে দাঁড়ায় নীল।
বাতাসের বেগটা বাড়ছে ক্রমশ , বুঝি ঝড় আসবে। সমস্ত রাস্তা এপাশ ওপাশ অন্ধকার, শুধু সারবাঁধা দোকানগুলোতে জ্বালানো মোমবাতির আলোটুকই ভরসা। রাস্তায় লোক চলাচল কমছে। ক্রমশ।
বাতাসের বেগ প্রবল হলো আরেকটু। আর সমস্ত মোমবাতি গুলো নিভে গেল একসাথে। তবুও দেখতে পেল নীল.. .. .. দেখতে পেলো তাকে।গাঢ় অন্ধকারের মাঝেও চোখ যেন খুঁজে নিল তাকেই। কেবলমাত্র তাকে!
মার্সিডিজটা থেকে একটু ব্যবধানে দাড়িয়ে সে।আপাদমস্তক কালো পোশাকে ঢাকা নারী মুর্তি- যেন ছায়া মানবী কোনো। মাথায় জড়ানো ওড়নাটার এক প্রান্ত দিয়ে মুখটা ঢেকে দাড়িয়ে আছে সে। বাতাসে উড়ছে তার পরনের পোশাক, ওড়না, মাথার দীর্ঘ কালো চুল। আর স্থির চোখ জোড়া চেয়ে আছে এদিকেই।
স্থির অপলক!
এত উঁচু থেকেও সেই চোখ জোড়াকে কি করে স্পর্ষ্ট দেখতে পেলো জানে না নীল। দেখতে পেলো তার পায়ের হালকা চটিজোড়া আর সোনার নুপুর; আকাশের কালচে নীল রঙটার ছড়িয়ে পরা তার সমস্ত শরীরে; বাতাসে তার পরনের পোশাকের তীব্র নাচন।
স্পষ্ট দেখতে পেলো তাকে। শান্ত, অবিচল।
এবং সেই ছায়ামানবী তাকিয়ে ছিল সরাসরি ওপর দিকেই। নীলের দিকে তাকিয়ে ছিল!
সহ্য করতে পারে না নীল। একটুও সহ্য করতে পারে না। নিজের ওপর রাগ হয়, নিজেকেই ঘৃনা হয়। কেননা তারও ভীষন ইচ্ছা করে.............
ইচ্ছা করে সেই অপলক চোখ জোড়ায় দৃষ্টি রেখে দাঁড়াতে। এক্ষুনি, এই মুর্হুতে ক্যানভাসে বন্দী করে নিতে এই ভয়ংকর সুন্দর দৃশ্য।এবং নিজেকে ফেরাতে পারে না নীল কিছুতেই, বোঝাতে পারে না।
ক্রমশ অবুঝ হয় মন। অস্থির হয় এক ছুটে ক্যানভাসের সামনে গিয়ে দাঁড়াবার জন্য। আঙ্গুলেরা অস্থির হয়ে ওঠে রঙের উচ্ছাসে নিজেকে ভেজাতে, স্পর্শ পেতে ব্রাশের শরীরী ভালোবাসার।
এবং একটা দুটো জলকনা নামতে শুরু করে মেঘের অবয়ব ভেঙ্গে!
বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে আর বাড়তেই থাকে। জল কণারা বেড়ে যায় সংখ্যায়,কিন্তু সে দাঁড়িয়ে থাকে স্থির।তাকিয়ে থাকে........ ঠিক তেমনি করেই।
উফ! অসহ্য!
............. অসহ্য!!
কারণ নিজেকে অতিক্রম করে ত পারে না নীল। আর অতিক্রম করতে পারে না বলেই মৌ-কে টেনে নেয় কাছে। আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিবিড় করে ভালোবাসে । আর অনেক দুরের ব্রজ্রপাতের ঝাপসা আওয়াজটা মিশে মিশে যায় তার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনের সাথে.....
তবুও আফসানাকে দেখতেই পায় সে। মৌয়ের অধরে ঠোট ছোঁয়াবার পরেও নীল স্পষ্ট দেখতে পায় তাকে। অবিচল দাঁড়িয়ে আছে সেই কৃষ্ণবরণ প্রস্তর মুর্তি আগের মতোই।
নীলের দিকে তাকিয়ে আছে!
বৃষ্টি ভেজা রাস্তা, সম্পূর্ণ মনযোগ থাকা উচিত সেদিকেই। তবুও সামনের ছোট আয়না টুকুয় বড় আপার প্রতিবিম্ব থেকে চোখ ফেরাতে পারে না শফিক। ড্রাইভিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রায়ই আড় চোখে তাকায়।
বৃষ্টিতে একদম ভিজে গেছে সে। বসে আছে স্থির। শুধু চোখজোড়া বেয়ে নামছে বিন্দু বিন্দু জলকণা; ঠিক বৃষ্টি বিন্দুর মতো। একটুও আওয়াজ হচ্ছে না। সামান্যতমও না। যেন কোনো প্রতিমার পাথুরে চোখ বেয়ে গড়াচ্ছে সত্যিকারের অশ্রু।
ভীষন মন খারাপ হয় শফিকের। কেন কে জানে!
‘বাসায় যাবো, আপা?’
‘চলো!’
‘অফিসে আর ফিরবেন না?’
‘যেতে হলে রমিজ মিয়াকে নিয়ে যাবো। তুমি আজকে বাসায় চলে যাও।’
‘অসুবিধা নেই, আপা। আমি আছি।’
‘আমি একবেলা অফিস না গেলে কিছু হবে না। তুমি বাসায় না ফিরলে হবে। তোমার মেয়েটা বাবার জন্য অপেক্ষা করছে।]
মনটা আরও খারাপ হয় শফিকের। এত ভালো কেন এই মানুষটা? কেন এত ভালো? সকলে তাকে খারাপ বলে- বড় সাহেব, ম্যাডাম, দুলাভাই, ছোটআপা। কিন্তু মানুষটা তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি। সে শুধু সবার মধ্যখানে নিজের মত বেঁচে থাকে,নিজেকে গুটিয়ে বেঁচে থাকে।
নিজের মত বাঁচতে চাওয়াটাই তবে অপরাধ?????
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



