হাত ছাড় ব্যাটা । পাঞ্জাবির পকেট টা খামছি দিয়ে ছিড়ে ফেলল নাহার , তবুও এই কুকুর টার হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারছেনা। কাদের মোল্লার নখের আচড়ে রক্ত পরছে হাত থেকে।শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটাচ্ছে। দুই হাত দুই পা দিয়েও জানোয়ার টাকে বুকের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে পারছেনা নাহার। বদ্ধ ঘরে কাঠের দরজা ভিতর থেকে কাঠের খিলান দিয়ে আটকানো। আগামোসিলেনের চিপা রাস্তার উপর দুই তলা দালান, ছাদের উপর একটা ঘর। পুশু হাশপাতালের সামনের গলি দিয়ে কিছুটা ভিতরে এগোলেই আগামোসিলেন , আজিমপুর থেকে মাঝে মাঝে রিক্সা করে নাহার আসে তার মায়ের বাসায়, ছোট ছেলেমেয়ে দুটির জামা singer machine এ সেলাই করে নিতে, সৎ মায়ের সাথে বসে একটু আডডা দেয়, সৎ ভাই খোকা আর বাকি তিন বোনের সাথে গল্প গুজবে মেতে উঠে।
হক সাহেবের বড় মেয়ে নাহার, বেড়ে উঠেছে পুরোনো ঢাকার অলি গলিতে খেলা করে , আগে তারা ভাড়া থাকতেন জিন্দাবাহার লেনে পরে নাহারের বাবা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হক সাহেবে নিজের বাড়ী করলেন আগামোসিলেনে , নাহার স্কুলে গেছে কামরুননেসায়, ইডেন কলেজের প্রথম বর্ষে থাকাকালীন সময় বাবা, মা মরা মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দিলেন সরকারি চাকুরে গ্রামের শিক্ষিত ছেলের সাথে । স্বামী আর ছোট ছোট ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে আজিমপুর কলোনীর বাসায় নাহার ভালোই ছিল।
এই যুদ্ধের মধ্যে আর সবার মত সেও ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলো। কিন্ত্ত পাক আর্মির বন্দুকের নলের সামনে নাহারের স্বামীর প্রতিদিন secetariate office এ যেতে হয়, কত বার নাহার কান্নাকাটি করেছে এই ছাপোষা কেরানির চাকরি ছেড়ে তার মা বাবা ভাই বোনের মত আগোরতলা হয়ে কলকাতা যাবার জন্য , পরিস্হিতি বিপরীত, এখন পালিয়ে যাবার আর কোন উপায় নাই। এদিকে প্রতিদিন ভয়ে তিলে তিলে মরতে হচ্ছে, নাহারের ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র--- মানেই পাকিস্তানী সেনাদের কাছে মুক্তিযোদ্ধা। আজকে এসে ছিল রিক্শা করে বাবার বাসায় , বাচ্চা দটোকে আজিমপুর কলোনির বাসায় কাজের বুয়ার কাছে রেখে। তালা খুলে চিকন অন্ধকার সিড়ি বেয়ে সোজা তিনতলার চিলে কোঠায়।নিচের তলার দোকান গুলো বন্ধ সেই ২৬শে মার্চ থেকেই। ওটা নরেন কাকার বাখোরখানির দোকান ছিল , উনি তালা লাগিয়ে চলে গেছেন ভারতে। নাহারের বাবা- মা, বাকি তিন বোন সব ঢাকা ছেড়ে গেছেন জুন মাসে, আর নাহারের একমাত্র ছোট ভাই খোকা ২৫ মার্চ থেকেই নিখোঁজ,
ফযলুল হক হলে থাকত ভাইটি বেচে আছে না নেই, কেউ জানত না।
১১ জুলাই ১৯৭১, দুপুর ১২ টার দিকে আজিমপুর বাসায় নাহার রান্না করছিল কেরসিনের টিনের শেষ তেলটুকু দিয়ে ডাল,ভাত ,আলু ভর্তা এমন সময় কে যেন কড়া নাড়ল, দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে কাগজওয়ালা দাঁড়িয়ে ,পুরানো কাগজ কিনবে বলে বার বার অনুরোধ করছে ।নাহার দরজা কিছুতেই খুলবে না , লোকটা মহা বিরক্তিকর আর নাছোরবান্দা, নাহার রেগে মেগে দরজা খুলেই দিল ধমক, যেই দরজা লাগাতে যাবে,অমনি কাগজওয়ালা দরজার দুটি পাল্লায় হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বললো বুবুরে , আমি খোকা।নাহার বোকার মত তাকিয়ে ছিল কাগজওয়ালার ভাইয়ের দিকে ?ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরা ফিটবাবু এই খোকা ? যাকে কেউ দেখেনি লুঙ্গি পড়তে , যেই ছেলের বেলবটম প্যান্ট, বিশাল কলারের শার্ট আর দিলিপ কুমার style এর চুলের জন্যে পাড়ার মেয়েরা ছাদে বসে থাকতো! বুবুর চোখে তখন লোনা পানির বন্যা তার ভাই বেচে আছে, খোকার বুকে মাথা রেখে বুবুর কান্না শেষই হয়না যার সাথে সারাটা জীবন মারামারি করেছে সেই নিখোঁজ ভাই ওর সামনে ।কত রাত নামায পরে দোয়া করেছে পরিবারের সবাই যেন বেচে থাকে।
খোকা বলে বুবু ঢাকায় ঢুকেছি কাল রাতে শুনেছি আব্বা আম্মা নাকি কলকাতায় ! তুই কেবল ঢাকায় তাই তোকে দেখতে এলাম, আজকাল আমরা ঢাকায় হুট করে আসি আবার চলেও যাই। নাহার ভাইকে ভাত খাইয়ে দিল, খোকার সাথে শলা-পরামর্শ করলো যাতে ভাইকে যতটা পারে support দিতে ।নাহার লুকিয়ে মাসের খাবার দাবার আগামোসিলেনের খালি বাসার চিলে কোঠায় রেখে আসবে ভাই মাঝে মাঝে এসে তার দলবল নিয়ে খেয়ে ফিরে যাবে।
নাহার সেই থেকে এই বাড়িটিতে মাসে ১/২ বার আসা যাওয়া করছে আশে পাশের রাজাকার গুলো ভাবছে বাড়ীঘর যাতে বেদখল না হয়ে যায় হাজিরা দিয়ে যাচ্ছে।
আজকেও এসেছিল, কিন্ত্ত আজকে পিছন থেকে কাদের মোল্লা জাপটে ধরে দরজা আটকে দিয়েছে। এই শান্তিবাহিনীর কর্মী কাদের মোল্লা
হোল মোড়ের দোকানের কশাই, যে হক সাহেবের বাড়ীর দরজায় দাঁড়াবার সাহস ছিলনা কাদের কশাই এর সেই আজ নাহারের শালীনতা হরন করলো, নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারলো না নাহার এই হায়নার কাছ থেকে। বাড়ীর কাজের লোকদের সাথে উঠা বসা ছিলো কাদের কশাইয়ের সেই কাদেরের হাতেই লাঞ্চিত হতে হল তাকে। ক্লান্ত বিধস্ত ধস্তাধস্তি তে প্রায় অজ্ঞান নাহার মাটিতে লুটি্য়ে পরা শাড়ী,ছেড়া পেটিকোট, ব্লাউজ কোনোমোতে গায়ে জড়িয়ে নিল । রাগে ,ক্ষোভে, ঘৃনায় একদলা থুথু ছুড়ে দিল মাটিতে, যেন সব রাজাকার গুলোকে তার শত সহস্রবারের ঘৃনা।
সেই দুপুরে ফিরে যাবার কথা সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল এখনো আগামসিলেনে পড়ে আছে, মায়ের মন আকূল হয়ে উঠল বাচ্চা দুইটার জন্য । বাইরে কারফিউ চলছে এরই মাঝে হেটে মৃত্যুপূরী ভুতূরে ঢাকার
চানখারপুল, বিশ্ববিদ্যালয়, পলাশী, ইডেন কলেজ পেরিয়ে আজিমপুর কলোনী । সদ্য সম্ভ্রম হারানো উদিঘ্ন মেয়েটি পথের নানা বাধা পেরিয়ে ছুটে চলেছে তার সন্তানদের কাছে পেতে । অবশেষে গভীর রাতে বাড়ী ফিরে এল নাহার,দেশ স্বাধীন হল ।পরের বছর জন্ম নিল তাদের সন্তান মুক্তি, নাহারের স্বামী যতদিন বেচে ছিলেন কোনোদিন একটি বারের জন্য নাহার কে মুক্তির জন্ম রহস্য নিয়ে জিজ্ঞেস করে তাকে বিব্রত করেননি। আজ ৪০ বছর পেরিয়ে গেল , ছেলে-ছেলের বউ, মেয়ে- মেয়ের জামাই সবাইকে নিয়ে নাহারের ভরা সংসার , কিন্ত্ত বুকের ভিতর আজো মোচর দিয়ে উঠে সেদিনের সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা ভেবে । নাহার পারেনি
ফেরদৌসি প্রিয়ভাসিনী হতে, নিজের অপমান, বঞ্চনা আর যুদ্ধশিশু মুক্তির পরিচয় সমাজকে জানাতে, নিজে পারেনি তবে যিনী পেরেছেন তাকে হাজার সালাম।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


