somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডিজিটাল বই - আগামী দিনের জ্ঞানভান্ডার.....

০১ লা ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এত দিন ধরে আপনি মলাট বাধা যে কাগজের স্তুপকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে পরম আদরে আপনার প্রিয়বন্ধু বানিয়ে রেখেছেন তা আর কত দিন আপনার কাছে থাকবে তা কি একবারও ভেবে দেখেছেন। আর এই ধরনের বইকে যারা শয্যাসঙ্গী বানিয়েছেন তাদেরও বোধহয় সঙ্গী পাল্টানোর সময় এসে গেছে। কেননা আপনি এখন একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছেন। আপনার অতিপ্রিয় কাগজের বই আর মনেহয় বেশিদিন আপনার কাছে থাকতে পারছে না। জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছে নতুন অতিথির কাছে। কারণ বইয়ের জগতে আবির্ভাব ঘটেছে আধুনিক সময় উপযোগী "ডিজিটাল বই" নামের এক নতুন অতিথির। এসেই হইচই ফেলে দিয়েছে গোটাবিশ্বে। অনেকেই এর আগমনকে সাদরে বরণ করে নিলেও সমালোচনাকারীরাও কিন্তু বসে নেই। তারা রীতিমত উঠেপড়ে লেগেছেন ডিজিটাল বইয়ের আগমন ঠেকাতে। কিন্তু বন্ধু হয়ে পাশে এসে দাড়িয়েছে পরিবাশবাদীরা। সবমিলিয়ে ডিজিটাল বইয়ের আগমনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন এক বিতর্করূপী স্নায়ুযুদ্ধের।

"বই"- কি
বাংলা "বই" শব্দটা আরবি শব্দ "ওহি" থেকে এসেছে। আরবীতে ওহি শব্দের অনেকগুলি মানের একটি হলো প্রত্যাদেশ বা স্রষ্ট্রার পাঠানো বাণী। সে হিসেবে পবিত্র কোরান শরীফ হলো প্রত্যাদেশের সংকলন। বাংলাদেশে ওহি শব্দটা প্রথমে মানুষের মুখে মুখে "বহি" আর সেখান থেকে আস্তে আস্তে বাংলায় "বই" হিসেবে রূপ নেয়।

আর ইংরেজি Book শব্দটা এসেছে প্রাচীন ইংরেজি শব্দ boc থেকে। এ প্রাচীন শব্দটা এসেছে জার্মানী শব্দ bok থেকে। বক বলতে আসলে তারা বিচ গাছকে বোঝাত। তাই অনেকে বলেন, "বিচ" (beech) শব্দ থেকে ইংরেজি বুক (Book)শব্দের উৎপত্তি। আসলে ইউরোপের একটি গাছ আছে, যার নাম বিচ। প্রাচীনকালে মানুষ এই বিচ গাছের কাঠের উপর লেখালেখির কাজ করা হত। তাই অনেক পন্ডিত বলেন, বিচের উপর লিখতে লিখতেই "বক", তারপর এই বক থেকেই "বুক" শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

বিবর্তনের ধারায় যখন বই
সম্রাট অশোকের জন্মেরও চার হাজার বছর আগে আসিরিয়া ও ব্যাবিলন নামে দুটি দেশ ছিল। সেসময় এই দেশ দুটি খুব সভ্য ছিল। যতদুর জানা যায়, এই দুটি দেশেই প্রথমে পাথরের উপর লেখার প্রচলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের দেশে পাথর সহজলভ্য ছিল না। তাই তারা একসময় কাদা মাটির উপর লিখে তা পুড়িয়ে ইটের মত শক্ত করত। পরে মাটি খুঁড়ে এ ধরণের অনেক পোড়া মাটির ফলক পাওয়া গেছে। মাটি খুঁড়ে ব্যবিলনের একটি লাইব্রেরিতে এ রকম ২২ হাজারেরও বেশি পাথুরে বই পাওয়া গেছে।

বইয়ের উপাদান হিসেবে পাথর, মাটির ফলক অনেকদিন ব্যবহারের পর মানুষ নতুন কিছু খুঁজছিল। কিন্তু যুৎসই কিছু তারা পাচ্ছিল না। অবশেষে মিশরের লোকেরা খুঁজে পেল নতুন কিছু, যা বইয়ের ইতিহাসে দিল নতুন এক মাত্রা। আর নতুন এই জিনিসটাই হচ্ছে কাগজ। শুরু হল লেখা সংরক্ষণের নতুন যুগের। বই ধরা দিল কাগজের বুকে।

আদি বই আর কতদিন
কাগজ মানুষের জীবনে এতটাই প্রয়োজনীয় আর উপকারী হয়ে দেখা দিল যে, কাগজ ছাড়া আর একটি দিনও চলা সম্ভব হল না। জীবনের প্রতিটি মূহুর্তে কাগজ হয়ে উঠল অপিরিহার্য। মাত্র কিছুদিন আগেও মানুষের কল্পনাতেও ছিল না যে এই কাগজকে ছেড়ে একদিন থাকতে হবে। এমনকি ১৯৯০ এর দশকেও অনেকেই তা বিশ্বাস করেন নি। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে এসে এটাই বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তির এই আধুনিক ব্যাস্ত জীবনে শুধু অফিস-আদালতেই নয়, ব্যাক্তি পর্যায়েও অনেকেই কাগজের ঝামেলা থেকে মুক্তি চান। তবে এই উদ্দেশ্যের পেছনে যে শুধু কাগজ সংরক্ষণের ঝামেলাই কাজ করছে তা নয়। বরং কর্পোরেট পর্যায়ে খরচ কমানো, কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি, একই সময়ে স্বল্প শ্রমে ও স্বল্প পরিসরে অধিক তথ্য সহজে সংরক্ষণ ইত্যাদি নানামুখি সুবিধার জন্য মানুষ এখন প্রযুক্তির দ্বারস্থ হয়েছে। আর আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে এ কাজে সাহায্য করেছে কাগজের বিকল্প হিসেবে যন্ত্রকে দায়িত্ব দিয়ে।

যন্ত্রের ছোয়ায় জাদুর মত পাল্টে গেল সবকিছু। অফিস-আদালত এবং ব্যাক্তি পর্যায়ে কাগজের জায়গা দখল করল কম্পিউটার। লেখালেখি আর তথ্য সংরক্ষণে আর কাগজের দরকার থাকল না। শুরু হল কাগজ বিহীন যুগের। কিন্তু সমস্যা থেকে গেল মানুষের পড়ার অভ্যাসে। হাজার বছর ধরে কাগজের বুকে ছাপানো লেখা পড়ার অভ্যাস থেকে সহজে মুক্তি মিলল না। কাগজের বই পড়ুয়া মানুষ সেই আদিম অভ্যাস ছাড়তে একদমই রাজি নয়। কিন্তু বিজ্ঞান হার মানতে জানেনা। বইয়ের জগতেও হাত বাড়িয়ে দিল বিজ্ঞান। এল নতুন এক ধরনের বই। যা দেখতে মোটেই প্রচলিত কাগজের বইয়ের মত নয়। নতুন এই বইয়ের নাম ডিজিটাল বই। শুরু হল ডিজিটাল বইয়ের যুগ।

এবার ডিজিটাল বই
আইজ্যাক আসিমভ নামের এক কল্পবিজ্ঞান কাহিনী লেখক , তার এক গল্পে আগামী দিনের দুনিয়াটা কেমন হবে তার একটা ধারণা দিয়েছেন। এ সম্পর্কিত এক গল্পে তিনি প্রথম দেখিয়েছেন যে আগামীতে "বই" বলে কিছু থাকবে না। মানে এখন বই বলতে আমরা যেরকম বুঝি দুই মলাটের ভিতরে কাগজের বই, সেরকম কিছু থাকবে না। প্রযুক্তি যত এগোবে কাগজের বইয়ের জায়গা ততই দখল করে নেবে ডিজিটাল বই বা ডিজিটাল বুক। অনেকে অবশ্য এই ডিজিটাল বুককে "ই- বুক" বলেও সম্বোধন করে থাকেন। তবে যে যাই বলে ডাকুন না কেন, মূল জিনিসটা কিন্তু একই।

আধুনিক কালে এখন অনেকেই ডিজিটাল বইয়ের নামের সঙ্গে পরিচিত। এই ধরণের বইগুলো পড়তে কম্পিউটার বা এ ধরণের কোন বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়। কাগজের বই ছাপার ঝামেলা, খরচ ইত্যাদি নানা কারণে বর্তমান যুগে কাগজের বইয়ের বদলে এসব বইয়েরও চাহিদা তৈরি হচ্ছে এবং সে চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে।

বিবর্তনের ফলে বই আদ্দিকালের সেই পাথুরে অবস্থা থেকে আজ ডিজিটাল অবস্থায় রূপ নিয়েছে। ভবিষ্যতে হয়ত এর চেয়েও সহজ কোন প্রযুক্তি চলে আসবে। অতএব সে পর্যন্ত জ্ঞানপিপাসুদের আশ্রয় হচ্ছে একমাত্র ডিজিটাল বুকই।

ডিজিটাল বইয়ের রকমফের
পৃথিবীতে প্রথম যখন ডিজিটাল বইয়ের ধারণাকে বাস্তব রূপ দেয়ার কাজ শুরু করা হয় তখন মানুষের মধ্যে যে ধারণা কাজ করত এখন তা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। শুরুতে ডিজিটাল বইকে যেভাবে কল্পনা করা হয়েছিল তা এখন আর নেই। প্রথম দিকে ডিজিটাল বুক বা ই-বুক গুলো কম্পিউটারে পিডিএফ (Portable Document Format) হিসেবে সংরক্ষিত থাকত। তাই অনেকে একে পিডিএফ বুক বা পিডিএফ বইও বলত। এখনও এই পদ্ধতিটি সারা বিশ্বে চালু রয়েছে। ইন্টারনেটে অনেক ওয়েবসাইটে এখনও এই পদ্ধতিতে বই সংরক্ষিত আছে। যা সারা বিশ্বের কোটিকোটি পাঠক নিয়মিত পড়ছে এবং সংগ্রহ করছে। বিশ্বের অনেক ওয়েবসাইট এখন বিভিন্ন জনপ্রিয় পিডিএফ বইগুলো বিনামুল্যে ডাউনলোড করার সুযোগ দিচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। কারণ বাংলাদেশের বেশ কিছু ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখকদের বই বিনা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এ পদ্ধতিরও কিছুটা উন্নটি ঘটে। পিডিএফ প্রযুক্তির পরবর্তী প্রযুক্তি হিসেবে আসে "ডিজেভিউ"(DJVU)। এ পদ্ধতিটির সুবিধা হচ্ছে , এতে বই পড়ার ক্ষেত্রে চোখের শ্রান্তি অনুভব করা যায়। পিডিএফে বই পড়ার প্রধান অসুবিধা হল, এতে একসঙ্গে একটির বেশি পৃষ্ঠা পড়া যায় না এবং ছবি প্রকাশের সুবিধাও তেমন নেই। যা অনেকটা দৃষ্টিকটূ। অন্যদিকে ডিজেভিউতে একইসঙ্গে দুই বা ততোধিক পৃষ্ঠা পড়া যায় এবং এ সকল পৃষ্ঠা এমনভাবে দেয়া হয় যাতে ব্যাবহারকারীর মনে হয় যে তিনি কোন কাগজের বাধাই করা বই পড়ছেন। এ পদ্ধতিটি নতুন হওয়ায় এটি এখনও খুব একটা পরিচিত হয়ে উঠেনি। ডিজেভিউ পদ্ধতির ডিজিটাল বই পাওয়া যায় এমনই একটি ওয়েবসাইট হচ্ছে আর্কাইভ ডট ওর্গ।

কিন্তু ডিজিটাল বইয়ের যে রূপটি নিয়ে সারাবিশ্বে আজ তোলপাড় হচ্ছে সেটি কিন্তু এ দুটির একটিও নয়। আগের পদ্ধতি দুটির জন্য ব্যাবহারকারীর কম্পিউটার থাকা বাঞ্ছণীয়। কিন্তু বর্তমান যুগের ডিজিটাল বই পড়ার জন্য আপনার কম্পিউটার থকতেই হবে এমন কোন কথা নেই। তবে যে জিনিষটি আপনার থাকতে হবে তা হচ্ছে ডিজিটাল বুক রিডার। কারণ এ ইলেকট্রনিক বইগুলো আবার সাধারণ বইয়ের মতো পাতা উল্টে পড়া যায় না। এর জন্য দরকার পড়ে বিশেষ প্রযুক্তি সম্বলিত যন্ত্রের বা ই-রিডারের। ডিজিটাল বই পড়ার বিশেষ এই যন্ত্রটি সারাবিশ্বে ই-বুক রিডার নামেই পরিচিত।

ই-বুক রিডার
ই-বুক রিডার হচ্ছে এমন এক বিশেষ ধরণের যন্ত্র যা দিয়ে ডিজিটাল আকারে তৈরী বই পড়া যায়। এই ডিভাইসটি আকারে ছোট, হালকা এবং সহজে বহণযোগ্য। শুধু তাই নয় এগুলো দেখতেও যথেষ্ট স্মার্ট। বর্তমান সময়ে ই-রিডারগুলোর কাটতি ব্যাপক। আমাজনের কিন্ডল এবং বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান সনির ই-রিডারের চাহিদা যেমন বেড়ে চলেছে, তেমনি এর পাশাপাশি তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজেদের উদ্ভাবিত প্রোটোটাইপ নিয়ে এ ব্যবসায় চলে আসছে। এরই সঙ্গে বইয়ের প্রকাশকেরা তাঁদের বইগুলোর ডিজিটাল আকার দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন।
ই-রিডারগুলোর জনপ্রিয়তার মূল কারণ হচ্ছে এগুলো যেমন ছোট এবং হাতব্যাগে বহন করার মতো হালকা, তেমনি ব্যাগে পড়ার জন্য একগাদা বই কিংবা সংবাদপত্রের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। আর কিছু ই-রিডারে ইন্টারনেটে শব্দসন্ধানের পাশাপাশি তারবিহীন সর্বাধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ওয়াইফাই সংযোগ বিদ্যমান। কারও কারও মতে, এ্যাপলের আইপড যেমন ডিজিটাল সংগীতের জগৎ করায়ত্ত করেছে, তেমনি এ ধরনের ই-রিডার গুলো অচিরেই ডিজিটাল অক্ষরকে মুঠোয় পুরবে। বিখ্যাত পেঙ্গুইন প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী জন ম্যাকিনসন বলেন, বর্তমানে এ ধরনের ই-রিডারগুলো বিশেষ কোনো শ্রেণীর প্রযুক্তিপ্রেমীর ব্যবহার্য বস্তুর তালিকা থেকে মূলধারার পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছে। ম্যাকিনসন আরও জানান, পেঙ্গুইন এখন থেকে তার সব বইয়ের কাগুজে সংস্করণের পাশাপাশি এ ধরনের ই-রিডারে পড়ার উপযোগী সংস্করণ বের করছে।
আগে অনেকেরই ধারণা ছিল, এ ধরনের ই-রিডার মূলত বিজ্ঞানীদের উপযোগী এক ধরনের বই পড়ার যন্ত্র। কিন্তু ক্রমেই সে ধারণা পাল্টে যেতে শুরু করেছে। কারণ, এরই মধ্যে পর্যটক, শিক্ষার্থীদের কাছে পড়ার এই যন্ত্র যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। অতি সম্প্রতি সাধারণ ই-রিডারের পাশাপাশি বেশ কিছু অভিনব মডেলের ই-রিডার বাজারে এসেছে। এর মধ্যে ডাচ্ নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান পলিমার ভিশন রেডিয়াস নামের একটি প্রোটোটাইপ ই-রিডার সংস্করণ বের করেছে, যা ভাঁজ করা যায়। এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বই প্রকাশকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা মুঠোফোনে পড়ার উপযোগী করে বই প্রকাশের পরিকল্পনা করছেন। কারণ, সেখানকার সবার কাছেই প্রায় মুঠোফোন আছে। আর ই-বুক রিডারের প্রতিটির দাম পড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ ডলার, যেখানে এই পণ্যের কোনো বাজার নেই বললেই চলে।

এদিকে জাপানে কিছু ছোটগল্প চালু হয়ে গেছে, যেগুলো পাঠক তার মুঠোফোনের পর্দায় পড়তে পারবে ইনস্টল করার পর। অন্যদিকে এ্যাপলের আইফোন তার ব্যবহারকারীদের মুঠোফোনে উপন্যাস পড়ার সুবিধা দিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই। তবে এ ধরনের যন্ত্রোপযোগী বই পড়ার পাঠক যে দিন দিন বাড়ছে, তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন মার্কিন প্রকাশকদের সংগঠনের কপিরাইট কমিটির প্রধান এ্যালান এডলার। তিনি বলেন, আপনি ইচ্ছা করলেই এখন ইন্টারনেট থেকে সহজে আপনার কাছে থাকা ডিজিটাল যন্ত্রের উপযোগী পাঠ্য কোনো লেখা নামাতে পারেন। আর এই নামানোর হার দিন দিন বাড়ছে। কিন্ডল নামে যে ই-বুক রিডারটি আমাজন নিয়ে এসেছে এখনও পর্যন্ত জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে এটিই শীর্ষে রয়েছে। কিন্ডল নামের এই ডিভাইসটি এর মেমরীতে একইসঙ্গে ২০০টি পর্যন্ত বই ধারণ করতে পারে। এর জনপ্রিয়তার মূল কারণ শুধু এর অত্যাধিক ধারণ ক্ষমতাই নয় বরং এতে এমন কিছু বিশেষ সুবিধা সংযোজিত হয়েছে যা সত্যি অভাবনীয়। এতে বই লোড করতে কোন কম্পিউটারের সাহায্যের প্রয়োজন হয় না। এটি সম্পূর্ণ তারহীন প্রযুক্তিতে কাজ করে। আর এ কাজে তারা ব্যাবহার করে ইভিডিও(EVDO) নেটওয়ার্ক। যদিও এ প্রযুক্তিটি এখন শুধু উত্তর আমেরিকাতেই রয়েছে। তবে তা অচিরেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। আমাজন বলেছে কিন্ডল বাজারে ছাড়ার সময়ই তারা ৯০ হাজার বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ তৈরী করেছে। আর ইভিডিও নেটওয়ার্ক ব্যাবহারের জন্য তাদের ব্যাবহারকারীদের কোন খরচা করতে হবে না। তারাই যাবতীয় খরচ বহণ করবে। তবে ব্যাবহারকারী যদি কোন ডাটা ডাউনলোড করতে চান তাহলেই শুধু তাকে অর্থ ব্যয় করতে হবে। একজন কিন্ডল ব্যাবহারকারীকে একমাস নিউইয়র্ক টাইমস্ পড়ার জন্য গুণতে হবে ১৩ দশমিক ৯৯ ডলার। আর কিন্ডলে পড়ার উপযোগী যে বই গুলো তারা সরবরাহ করবে সেগুলোর জন্যও পয়সা দিতে হবে। তবে ব্যাবহারকারীরা তা যে কোন সময় যে কোন স্থান থেকে ইভিডিও (EVDO) নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। এ জন্য তাদের কম্পিউটারে ইন্টারনেট ব্যাবহার করতে হবে না। আর এ প্রযুক্তিতে অক্সফোর্ড ডিকশনারী ডাউনলোড করতে সময় লাগবে মাত্র ৩০ মিনিট।

ই-রিডারকে কেন্দ্র করে ব্যাবসা
প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসাপ্লাইয়ের মতে, ই-বই বাণিজ্য ২০০৭ সালে ছিল মাত্র ৩৫ লাখ ডলারের। সেখানে ধারণা করা হচ্ছে, ২০১২ সাল নাগাদ এই ব্যবসা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলারে! যদিও ই-রিডার পুরোপুরি চালু না হতেই এর ভালোমন্দ, সাফল্য, সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্ক জমে উঠেছে। তবে অর্থনৈতিক সংকট এ ধরনের প্রযুক্তিপণ্য বিক্রি কমিয়ে দেবে বলে ধারণা করছেন ইউরোপিয়ান বুকসেলার ফেডারেশনের পরিচালক ফ্যাঙ্কুয়েস ডুবরুলি। তারপরও চলতি ২০০৮ সালে এ খাতে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বাজার সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামী ২০০৯ সাল নাগাদ ১৫ কোটি ডলারে পৌছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই বাজারের বেশিরভাগই ই-বুক রিডারের দখলে থাকবে। কেননা সহজে বহণযোগ্য এই ডিভাইসটির প্রতি ব্যাবসায়ীদের বিশেষ দৃষ্টি পড়েছে। কপিরাইট আইনের বেড়াজাল টপকে বইকে ডিজিটালে রুপ দেয়ার চাইতে বরং তারা ঝামেলাহীন ভাবে এই যন্ত্রটিই তৈরীতে বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে বইয়ের প্রকাশকরাও বসে নেই। তারাও বুঝতে পেরেছেন যে, আগামীতে ব্যাবসা ধরে রাখতে হলে তাদের বইকে ডিজিটালে রুপ দেয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। আর তাই তারাও এখন উঠেপড়ে লেগেছেন বইকে ডিজিটাল করার কাজে। ইতিমধ্যেই সারাবিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বইকে ডিজিটালে রূপ দেয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিদিনই এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তবে এই কাজে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে কপিরাইট আইন। পুরোনো যে বইগুলোর কপিরাইট নেই এখন শুধু সেগুলোকেই বেশ গুরুত্ব দিয়ে জোরেসেরেই ডিজিটাল করার কাজ চলছে। অবশ্য আজকাল অনেক প্রকাশনা সংস্থাই এখন তাদের নতুন প্রকাশিত বইগুলোর ক্ষেত্রে মূদ্রণ এবং ডিজিটাল উভয় সংস্করণেরই কপিরাইট করিয়ে নিচ্ছেন। এরফলে এসব বইয়ের ক্ষেত্রে আর ঝামেলা পোহাতে হবে না। ডিজিটালে রপায়িত এই বইগুলো বিক্রি করা হবে ই-বুক রিডার ব্যাবহারকারীদের কাছে। তবে প্রকাশকরা মূদ্রিত বইয়ের মত ডিজিটাল বইগুলো সরাসরি পাঠকের কাছে বিক্রি করতে পারবেন না। এগুলো পাঠকের হাতে পৌছাবে তৃতীয় পক্ষ হয়ে। আর এই তৃতীয় পক্ষটিই হচ্ছে নেটওয়ার্ক প্রোভাইডার। তারাই গ্রাহকদের কাছে পৌছে দিবেন ডিজিটাল বই। অর্থাৎ প্রতিটি ই-বুক রিডারের মালিক কোন না কোন নেটওয়ার্কের গ্রাহক হবেন, যারা ডিজিটাল বুক সরবরাহ করে। আর এই নেটওয়ার্ক প্রোভাইডারকে ডিজিটাল বইয়ের যোগান দেবে সেইসব প্রকাশনা সংস্থাগুলো যারা ডিজিটাল বই তৈরী করে। বই লেখার জন্য লেখক পারিশ্রমিক নিবেন প্রকাশকের কাছ থেকে, তারা আবার এই বই বিক্রি করবেন নেটওয়ার্ক প্রোভাইডারের কাছে। নেটওয়ার্ক প্রোভাইডাররা আবার এগুলো বিক্র করবেন ই-বুক রিডারদের মালিকের কাছে। আর ব্যাবহারকারীদের এজন্য প্রথমে একটি ই-বুক রিডার কিনতে হবে কোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে, তারপর তাকে আবার বই পড়ার জন্য গ্রহক হতে হবে কোন নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের। মোটকথা, পুরো ব্যাপারটি হচ্ছে একদম মোবাইল ফোন সিস্টেমের মত। এখানে মোবাইল অপারেটরদের মতই কাজ করবে নেটওয়ার্ক প্রোভাইডাররা, আর মোবাইল সেট নির্মাতাদের মত কাজ করবে ই-বুক রিডার প্রস্তুতকারকরা। তারমানে হচ্ছে আগের মূদ্রিত বই থেকে যেখানে আয় করত শুধু লেখক আর প্রকাশকরা, এখন সেখানে আরও যোগ হচ্ছে ই-বুক রিডার নির্মাতা এবং নেটওয়ার্ক প্রোভাইডাররা।

এবারের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বিপ্লব
ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে গত ১৫ থেকে ১৯ অক্টবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জার্মানির আন্তর্জাতিক ভাবে বিখ্যাত ৬০তম ফ্রাংফুর্ট বইমেলা ৷ বিশ্বের বৃহত্তম বইমেলা এটি ৷ সারা বিশ্বের বইপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে থাকে এই বইমেলা ৷ বইপ্রেমীদের কাছে এই মেলার আবেদন অনেকখানি। আর এখানেই এবার ফেটেছে ডিজিটাল বিপ্লবের বোমা।
এবারের মেলায় শুধু কাগজের বই নয়, বরং কাগুজে বইয়ের পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক বইয়েরও দেখা মিলেছে। পড়ার ইলেকট্রনিক এই যন্ত্রগুলো এবার ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় সাধারণ বইয়ের পাশাপাশি প্রচুর চোখে পড়েছে। মেলার দর্শনার্থীরা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে সাধারণ বইয়ের পাশাপাশি অচিরেই একটি জোরদার যুদ্ধ বেধে যাবে ই-রিডার বা ইলেকট্রনিক বইয়ের জগতেও। এ বছর মেলায় ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে ৭০০০-এর ওপরে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান উপস্থাপন করেছে প্রায় ৪ লাখ গ্রন্থ ৷ দর্শকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বই মেলার সবচেয়ে নতুন আকর্ষণ ছিল ইলেকট্রনিক বই৷ ৩৬১ জন প্রদর্শক উপস্থাপন করেছিলেন এই ধরনের ডিজিটাল সামগ্রী ৷যা মেলায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ ব্যাপারে প্রচার মাধ্যমগুলির দিক থেকে বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে ৷ ইলেকট্রনিকযুক্ত একটি ধাতুর পাতে কয়েক হাজার পর্যন্ত পৃষ্ঠা ধারণ করতে সক্ষম এই ইলেকট্রোনিক বই ৷তবে এই ই-রিডার গুলোর জন্য কোন নেটওয়ার্কের দরকার পড়ে না। এগুলোতে আগে থেকেই কিছু সংখ্যক ডিজিটাল বই লোড করা রয়েছে।

১৯৪৯ সালে ২০০টি জার্মান প্রকাশনা সংস্থার ১০ হাজার গ্রন্থ নিয়ে শুরু হওয়া এই বই মেলা আজও তার যাত্রা অব্যাহত রয়েছে । প্রতি বছরের মত এবছরও সাহিত্য, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং রাজনীতি ও অর্থনীতি জগতের অনেক বরেণ্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলায় ৷১০ হাজার সাংবাদিক এবং দেশ বিদেশের ১০০০ লেখক অংশ গ্রহণ করেছেন মেলায়৷ লেখক, প্রকাশক, পুস্তক ব্যবসায়ী, শিল্পী, সাংবাদিক সকলের দেখা সাক্ষাৎ-এর কেন্দ্রবিন্দু ফ্রাঙ্কফুর্ট বই মেলা৷ প্রতিবছরের মত এবারও চিত্রপরিচালক, অভিনেতা, রাজনীতিকদের আকৃষ্ট করেছে ‌এই বইমেলা৷ ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পরিচালক ইউর্গেন বস বলেন, ১৯৪৯ সালে শুরু থেকেই এই বই মেলা আন্তর্জাতিক মেলায় পরিণত হয়েছে ৷ এই মেলা ফ্রাঙ্কফুর্টে শুরু হয়েছিল হঠাৎ করে এবং সেই ঐতিহ্য নিয়ে আজও এগিয়ে চলেছে এটি ৷ এই মেলায় বিভিন্ন বিষয়, যেমন সারা বিশ্বে ডিজিটালের অগ্রযাত্রা, ছোট ও বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিবাদ, পুস্তক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ এসব বিষয় নিয়ে এবার খোলামেলা আলোচনা করা হয়েছে ৷

৭০ এর দশক থেকে প্রতি বছর সম্মানিত অতিথি হিসাবে একটি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়৷ এবছরের অতিথি দেশ ছিল তুরস্ক ৷ এ দেশটি তার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্য তুলে ধরেছে মেলায়৷ মেলার উদ্বোধন করেছেন তুরস্কের নোবেলবিজয়ী লেখক ওরহান পামুক, প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ গুল এবং জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাংক ভালটার স্টাইনমায়ার ৷ তুরস্ক থেকে এসেছিলেন ১৫০ জন প্রকাশক ও ২৫০ জন লেখক । এতসব স্বনামধন্য লোকের মধ্য এবারে নিজেকে উজ্ঝল করে তুলে ধরেছে ডিজিটাল বুক। এবারের ফ্রাঙ্কফুর্ট বই মেলায় দুটি জিনিস নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। যার একনম্বরে ছিল ডিজিটাল বই আর তারপরেই ছিল চীন বিতর্ক। কেননা ২০০৯ সালে এই মেলার বিশেষ অতিথি হবে চীন৷ এ নিয়ে কিছু সমালোচনার সুর ধ্বনিত হচ্ছে ৷বলা হচ্ছে কঠোর সেন্সরের কারণে চীনে সাহিত্য সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ সম্ভব হচ্ছেনা, যেখানে মানবাধিকার অহরহ লংঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ, সেই রকম একটি দেশকে ফ্রাঙ্কফুর্ট বই মেলায় আমন্ত্রণ জানানো ঠিক হবে কিনা এই নিয়েই চলছে বিতর্ক।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পরিচালক ইউর্গেন বস অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন৷ তিনি বলেন, চীনে তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর সাহিত্য জগতে যেন এক ধস নেমেছিল ৷ কেউ আর লেখালেখির ব্যাপারে তেমন উৎসাহ পাচ্ছিলেন না ৷ তবে ইদানীং রাষ্ট্রীয় প্রকাশনার বাইরে কিছু কিছু ব্যক্তিগত প্রকাশনা সংস্থাও সেখানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের উচিৎ এদেরকে সাহায্য করা, যাতে চীনের সাহিত্য জগত এক সুরে কথা না বলে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ৷এছাড়া ভারতের ক্রমবর্ধমান বিশাল বইয়ের বাজারের দিকেও লক্ষ্য রেখেছে ফ্রাঙ্কফুর্টের বই মেলা ৷ এ প্রসঙ্গে ইউর্গেন বস বলেন, ভারতের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম ৷ এই দেশটির ২০টি সরকারী ভাষা সম্পর্কে আমাদের তেমন কিছুই জানা নেই৷ আমরা কেবল সেই সব ভারতীয় লেখককেই চিনি, যাদের লেখা ইংরেজি থেকে জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে ৷ কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাষা উর্দু, হিন্দি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানিনা৷ ভারতের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক দিকটি বিবেচনা করে হলেও এই বিষয়টিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে৷
বইমেলা উপলক্ষে প্রতিবছরের মত এবারও জার্মান পুস্তক বাণিজ্য সমিতির পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে নবাগত একজন কৃতী লেখককে ৷ জার্মানির পূর্বাঞ্চলের ৩৯ বছর বয়সী উভে টেলকাম্প তাঁর ডেয়ার টুর্ম (দি টাওয়ার) বইটির জন্য পেলেন এবারের পুরস্কার৷ যার অর্থমূল্য ২৫০০০ ইউরো৷ বইমেলার শেষ দিন চিরাচরিত প্রথা মেনে ফ্রাংকফুর্টের ঐতিহাসিক পাউলসকির্শে গির্জায় এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রদান করা হল জার্মান পুস্তক ব্যবসায় সমিতির বার্ষিক শান্তি পুরস্কার৷ প্রথমবারের মত এই সম্মানিত পুরস্কার তুলে দেয়া হল একজন শিল্পীর হাতে ৷ অচিরেই হয়ত এই পুরস্কারটি পাবেন কোন ডিজিটাল বইয়ের লেখক।

প্রশ্ন যখন আবেগের
ডিজিটাল বইয়ের ক্ষেত্রে আবেগ একটি বড় বিতর্ক হয়ে দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলেন বই যতভাবেই পরিবর্তিত বা বিবর্তিত হোক না কেন, কাগুজে বইয়ের আবেদন কোনদিন ফুরাবে না । জীবনের সকল ক্ষেত্রেই বইয়ের মত এমন ভালো বন্ধু পাওয়া খুঁজে পাবে না কখনো। কারণ কাগুজে বই পড়া ভারি মজার একটা কাজ, যে বই পড়েছে সেই এ কথাটা জানে।

তাদের মতে, ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার প্রবল প্রতিপত্তির যুগেও ছাপানো বই তার গুরুত্ব হারায়নি৷ ৯০-এর দশক থেকে ইলেকট্রোনিকের দৌরাত্ম্য যেমন, সিডি রম, ডিভিডি, ইন্টারনেটে বইয়ের ইলেকট্রনিক সংস্করণ ইত্যাদির প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমন কি বিভিন্ন বইমেলাতেও তা দেখা যাচ্ছে ৷ এবছরের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি৷ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার পরিচালক ইউর্গেন বস মনে করেন, এই ধরনের নতুন নতুন সামগ্রী বইকে পেছনে হটিয়ে দিতে পারবেনা । ভিডিও, হিয়ার বুক, বুক অন ডিমান্ড এসবও তা পারেনি৷এতে শুধু নতুন বাজার খুলে যাবে মাত্র৷

এদিকে জার্মানির বই প্রকাশনা শিল্পের একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এমভিবির প্রধান রোনাল্ড শেইল্ডের মতে, ই-বই কখনোই ছাপানো বইয়ের জায়গা দখল করতে পারবে না। তবে এর কিছু সুবিধা জনপ্রিয়তা পাবে। তিনি আরও বলেন, আমার সন্তানেরা এখনো ছবি দেখে ছাপানো বইয়ের পাতায়। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই তারা পাঁচ কেজি (১১ পাউন্ড) বইয়ের ঝোলা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাবে কি না। আবার কারও কারও ধারণা, এ ধরনের বই পড়ার যন্ত্রের চেয়ে মুঠোফোনের পর্দা ডিজিটাল লেখা পড়ার একটি ভালো মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। আর মুঠোফোন এরই মধ্যে বেশির ভাগ মানুষের কাছে আছে এবং এটি সহজে ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পারে।

কিন্তু অনেক পাঠক ও লেখক আবার একবাক্যে জানিয়ে দিয়েছেন, এ ধরনের ডিজিটাল লেখায় সাধারণ কাগজে লেখা বইয়ের অনুভুতি প্রকাশ পায় না। নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক অরহান পামুক তাঁর নিজের ইস্তাম্বুল পাঠাগারে ৭০ হাজারের মতো বৃহৎ গ্রন্থখন্ড সংগ্রহ করেছেন। তিনি এ কথায় সায় দিয়ে বলেন, আমি যখন এই বর্তমান প্রযুক্তির মানের দিকে তাকাই, তখন একবাক্যে ই-রিডার ব্যবহারকে বলি, না। কিন্তু যেদিন এই প্রযুক্তির বই বিশেষত পুরোনো বইয়ের সেই সৌরভ সৃষ্টি করতে পারবে, তখন হয়তোবা বলব, হ্যাঁ। এখন দেখার বিষয় হলো ই-রিডারের ই-বই আসলেই কি হটিয়ে দিতে পারবে এত দিন ধরে কালজয়ী আবেগ সৃষ্টিকারী কাগজে লেখা বইকে নাকি হারিয়ে যাবে কালের অতল স্রোতে? ভবিষ্যতই বলে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর।

বন্ধু হলেন পরিবেশবাদীরা
পরিবেশবাদীরা অবশ্য ই-বইকে স্বাগত জানিয়েছেন দুটি কারণে, প্রথমত, এতে শক্তির ব্যবহার অনেক কম এবং দ্বিতীয়ত, এ ধরনের বইয়ের ব্যবহারে কাগজের ওপর থেকে চাপ কমবে। তাদের মতে শুধুমাত্র মূদ্রণের জন্যই প্রতিদিন বিশ্বে মোট ৫০ মিলিয়ন টন মন্ডের দরকার হয়। আর এ কারণে প্রতিদিন বিশ্বে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর বনভূমি উজার করা হয়। অথচ এ পরিমাণ বনভূমি তৈরীতে সময় লাগে প্রায় ২৫ বছর। এক হিসেবে দেখা গেছে প্রতিদিন ছাপার কাজে যে পরিমান কাগজ লাগছে তার ৬২ শতাংশ ব্যাবহৃত হচ্ছে সংবাদ পত্র শিল্পে আর বাকি ৩৮ শতাংশ ব্যাবহৃত হচ্ছে বইসহ অন্যান্য মূদ্রণের কাজে। তাই বৃক্ষনিধন রোধে এই ডিজিটাল প্রযুক্তির বই অভাবণীয় সাফল্য এনে দেবে বলেই ধারণা করছেন পরিবেশবাদীরা। তদেরমতে, সবুজ পৃথিবী গড়ার পথে প্রধান যে বাধাটি ছিল ই-বুক আসায় তা অপসারন করা এখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দড়িয়েছে। তবে ডিজিটাল বইয়ের বিরোধী কিছু প্রকাশনা সংস্থা বলেছে, তারা এখন বই ছাপার কাজে এমন উপাদান ব্যাবহার করছেন যা পরিবেশবান্ধব। তারা বলছেন, অন্যান্য দ্রব্য উৎপাদনের পর উচ্ছিষ্ট উপজাত উপাদান দিয়েই এখন তারা ছাপার কাজে ব্যাবহৃত কাগজের মন্ড তৈরী করছেন। এর জবাবে আবার পরিবেশবাদীদের বক্তব্য হচ্ছে, যে উপাদানই ব্যাবহৃত হোক না কেন তা বৃক্ষনিধন করেই সৃষ্টি করা হচ্ছে। সুতরাং বৃক্ষনিধন রোধে ডিজিটাল প্রযুক্তির বইকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হবে।

সংবাদপত্রের ডিজিটাল রূপ
প্রকাশনা জগতে বইয়ের প্রায় কয়েক শতাব্দী পর আবির্ভাব ঘটে সংবাদপত্রের। কিন্তু সংবাদপত্র বইয়ের চেয়ে দ্রুত গতিতে মানুষের কাছে পৌছে যেতে সক্ষম। মূদ্রণের ক্ষেত্রেও বইয়ের চেয়ে তাই অনেক দ্রুতই উন্নতি করে সংবাদপত্র। ডিজিটাল রূপে বই আবির্ভাবের অনেক পূর্বেই সংবাদপত্র ডিজিটাল রুপে আত্মপ্রকাশ করে। তবে সংবাদপত্রের ডিজিটাল রূপ কিন্তু ডিজিটাল বইয়ের মত নয়। ডিজিটাল বই পড়ার জন্য যেমন ই-বুক রিডারের প্রচলন হয়েছে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে কিন্তু তেমনটি হয় নি। এখন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাই তাদের অনলাইন সংস্করণ বের করছে। যা মূদ্রিত পত্রিকারই এক প্রকার ডিজিটাল রূপ। আবার অনেক পত্রিকা কেবল অনলাইন সংস্করণই বের করছে যার কোন মূদ্রিতসংস্করণ নাই। আমাদের দেশেও এমন বেশ কয়েকটি পত্রিকা রয়েছে।

তবে বাস্তব অবস্থা হচ্ছে ,বস্তুত সংবাদপত্রের মালিকেরা অনলাইন পত্রিকা প্রকাশে রাজি থাকলেও সম্পূর্ণ ডিজিটাল পত্রিকা বের করতে তারা এখনও রাজি নয়। কিন্তু অবস্থা পাল্টাতে শুরু করেছে। বিশ্বখ্যাত পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস্ ইতিমধ্যেই আমাজনের কিন্ডল ই-রিডার ব্যাবহারকারীদের মাসিক চার্জের ভিত্তিতে তদের পত্রিকা পড়ার সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অচিরেই হয়ত এমন ঘোষণা আরও অনেক পত্রিকাই দেবে। প্রতিযোগিতা যে সৃষ্টি হবে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কেননা ইতিমধ্যেই ডিজিটাল সংবাদপত্রের বাজার ধরতে উঠেপড়ে লেগেছে বেশকিছু জায়ান্ট কোম্পানী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনলাইন সার্চ ইঞ্জিন গুগল ইতিমধ্যেই বিগত ২০০ বছরের সংবাদপত্র ডিজিটাল আকারে তাদের আর্কাইভে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। যা তাদের ব্যাবহারকারীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই পড়তে পারবেন। সুতরাং সংবাদপত্রের ডিজিটাল রূপটিও মানুষের হাতে ধরা দিতে আর যে খুব বেশিদিন বাকি নেই তার আভাস বোধহয় পাওয়া যাচ্ছে।

ডিজিটাল বইয়ের আইএসবিএন-এর কি হবে
এ পর্যন্ত কত বই পৃথিবীতে তৈরি করা হয়েছে তার সংখ্যা কারোরই জানা নেই। দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের লেখা বইয়ের সংখ্যা কত তার হিসাব রাখা গোল্লাছুট খেলার মত সহজ কোন কাজ নয়। তবু তাবৎ দুনিয়ার যত বই তৈরি হবে তার একটা হিসেব রাখার জন্যে একটা পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। এ পদ্ধতিকে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বুক নাম্বার বা সংক্ষেপে আই এস বি এন (ISBN) বলা হয়। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে এই পদ্ধতিতে বইয়ের সংখ্যার হিসেব রাখতে প্রত্যকটি বইয়ে একটি নাম্বার দেওয়া হয়েছিল। তারপর ১৯৭০ সালে আন্তর্জাতিকভাবে এই পদ্ধতি গ্রহন করা হয়। এখন আন্তর্জাতিক আইএসবিএন সোসাইটি এটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ পদ্ধতিতে একটি বইয়ের নাম্বারে চারটি অংশ থাকে, যা ১০ বা ১৩ ডিজিটের হতে পারে। প্রথম অংশটি যে দেশ থেকে প্রকাশিত তার বা ভাষার কোড, দ্বিতীয়টি প্রকাশকের কোড, তৃতীয়টি আইটেম নাম্বার কোড আর একেবারে শেষেরটি হয় চেক ডিজিট। যেমন, একটি বইয়ের উপর লেখা আছে ISBN 984-07-4545-10। এর অর্থ হচ্ছে, প্রথম অংশটি (৯৮৪) বাংলাদেশের কোড, দ্বিতীয়টি (০৭) বাংলা একাডেমীর কোড, তৃতীয়টি (৪৫৪৫) হচ্ছে ওই প্রকাশনীর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা এবং সর্বশেষে (১০) হচ্ছে চেক ডিজিট।

কিন্তু এতো হচ্ছে বর্তমানের সাধারণ মূদ্রিত বইয়ের ক্ষেত্রে। ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বুক নাম্বার বা সংক্ষেপে আই এস বি এন (ISBN) যখন চালু করা হয় ডিজিটাল বইয়ের ধারণা ছিল না। তাই আন্তর্জাতিক আইএসবিএন সোসাইটি এটি কেবল মূদ্রিত বইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাবহার করে আসছে। কিন্তু এখন ডিজিটাল বই আসায় এই আই এস বি এন (ISBN) নিয়ে একটা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আর তা হল, বইয়ের স্বতন্ত্রতা প্রকাশকারী এই বিশেষ নাম্বারটি এখনও কি আগের মতই থাকবে নাকি পরিবর্তিত হবে। এ নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক জমে উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইএসবিএন সোসাইটি অবশ্য এখনও এ ব্যাপারটি নিয়ে মুখ খুলেনি। তবে অনেকেই মনে করছেন, বইয়ের রূপ যেহেতু পরিবর্তন হয়েছে তাই এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রকাশকারী বিশেষ নাম্বারটিরও পরিবর্তিত হওয়া উচিত। কিন্তু কিভাবে এটির পরিবর্তন করা হবে, সে ব্যাপারে আজও কেউ কোন দিকনির্দেশনা দিতে পারেন নি। অবশ্য ইদানিং কেউকেউ দাবী তুলতে শুরু করেছেন যে, ডিজিটাল বইয়ের আই এস বি এন (ISBN) টিও ডিজিটালে করতে হবে। যা বর্তমানের আই এস বি এন (ISBN) এর থেকে পুরোপুরি পৃথক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:২৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×