somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্ল্যাক বক্স-অন্ধকার থেকে আলোর সন্ধানে। (সচিত্র পোস্ট)

১৩ ই অক্টোবর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৩ ই জানুয়ারী, ১৯৮২ ওয়াশিংটন জাতীয় বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করল এয়ার ফ্লোরিডা ফ্লাইট নং ৯০ বিমানটি। উড্ডয়নের কিছুক্ষনর মধ্যেই বিমানটি আছড়ে পড়ল বরফ ঢাকা পটোম্যাক নদীর একটি ব্রিজের উপর। তদন্ত কারী দল হিসাবে মাঠে নামল এনটিএসবি (ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড)। শুরু হল দুর্ঘটনার একমাত্র জীবন্ত স্বাক্ষী ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারের কাজ। অবশেষে মিলল সেই কাঙ্খিত ব্ল্যাক বক্স এবং এর সূত্র ধরেই উদঘাটিত হল দূর্ঘটনার কারণ। কি ছিল সেই দূর্ঘটনার কারণ? তা জানার আগে ব্ল্যাক বক্স সম্পর্কে কিছু সাধারন কথা জেনে নিই।

ব্লাক বক্স: কালো বাক্স। সবার মনেই একটি প্রশ্ন জাগে ব্ল্যাক বক্স দেখতে কেমন? আসলে ব্ল্যাক বক্স দেখতে গাঢ় কমলা রঙের। কিন্তু এর এমন বিদঘুটে নামের কারন মনোযোগী পাঠক মাত্রই ধরতে পেরেছেন লেখার শিরোনাম থেকে। হ্যা, অজানা তথ্য (এক অর্থে ব্ল্যাক) সংরক্ষিত হয় যে বাক্সে এবং অজানা তথ্য জানা যায় যার মাধমে। তাই নামকরনের সার্থকতা আছে বৈকি।


দূর্ঘটনার সময় কি ভুল হয়েছিল এবং এই ভুলের পিছনের কারন কি ছিল তা অনুসন্ধান করতেই ব্ল্যাক বক্স এর আবির্ভাব। ব্ল্যাক বক্স বানিজ্যিক বিমানের একটি অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্র। এর যান্ত্রিক নাম ফ্লাইট রেকর্ডার। ফ্লাইট রেকর্ডার বলতে দুইটি আলাদা যন্ত্রেকে বুঝানো হয়। একটি হল ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর) অন্যটি ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার (এফডিআর)। দুইটির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সিভিআর।

প্রথমে আমরা ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর) সম্পর্কে জানব।

ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর)ঃ নাম থেকেই বুঝা যায় যে, এতে ভয়েস রেকর্ড করা হয়। চারটি চ্যানেলে রেকর্ড সম্পন্ন হয়। প্রথম চ্যানেলে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারের/প্যাসেঞ্জার এড্রেস, দ্বিতীয় চ্যানেলে ফার্স্ট অফিসার, তৃতীয় চ্যানেলে ক্যাপ্টেন-এর কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। চতুর্থ চ্যানেলে ইঞ্জিনের শব্দ, বায়ু প্রবাহের শব্দসহ সমস্ত ককপিটের মধ্যকার শব্দ রেকর্ড করা হয়। এই রেকর্ডিংয়ের সময়কাল মডেল ভেদে শেষ ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘন্টা। । বিশেষ পদ্ধতির এই রেকডিংকে বলা হয় প্রান্তহীন চক্র নীতি (এ্যান্ডলেস লুপ প্রিন্সিপাল)। রেকর্ডকৃত তথ্যগুলো জমা হয় একটি ম্যাগনেটিক টেপ অথবা মাইক্রোচিপে।সিভিআরের মধ্যে দুর্ঘটনাকবলিত বিমানের মধ্যকার সমস্ত তথ্য (ধারনকৃত শব্দ) কিন্তু রয়ে যায় অক্ষত। কারণ সিভিআর-এর মধ্যে রয়েছে দুর্ঘটনা কালীন অগ্নিকান্ডের কারনে সৃষ্ট উচ্চ তাপমাত্রা, বিস্ফোরণ জনিত আঘাত এবং পানি রোধক বিশেষ ব্যবস্থা। এটি ১১০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৬০ মিনিট, ২৬০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্র্রা ১০ ঘন্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম। এটি ছয়দিক থেকে ৫০০০ পাউন্ড চাপ সহ্য করতেও সক্ষম। এটি ৩৪০০ জি (মাধ্যাকর্ষন শক্তির ৩৪০০ গুন) ধাক্কা সহ্য করতে সক্ষম। কমলা রঙটি ব্যবহার করা হয়েছে যাতে দূর থেকে সহজেই বাক্সটিকে সনাক্ত করা যায়।
দূর্ঘটনার পর যদি সিভিআর পানিতে অর্থাৎ নদী বা সমুদ্রের তলদেশে চলে যায় তখন তাকে সনাক্ত করার জন্য রয়েছে একটি আন্ডার ওয়াটর লোকেটর বিকন(ইউএলবি)। এই বিকনটি পানির সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে নির্দিষ্ট সিগনাল (এ্যাকুয়েস্টিক সিগনাল) প্রেরণ করতে থাকে । এটি একটানা ত্রিশ দিন পর্যন্ত সিগনাল প্রেরণ করতে সক্ষম। এই বিকন ২০,০০০ফুট গভীরতায় এবং দুই থেকে তিন কিঃমিঃ দূরত্বে সিগনাল প্রেরণ করতে সক্ষম। উদ্ধারকারী দল একটি রিসিভারের সাহায্যে এই সিগনাল অনুসন্ধান করে সিভিআর-এর অবস্থান নির্ণয় করে। সিভিআর/এফডিআর থাকে বিমানে লেজের কাছে যেখানে দূর্ঘটনার সময় তুলনামূলক কম আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে, বিমান তার নিজস্ব শক্তিতে চলাকালীন সময়ে এর তথ্য পাইলট যাতে কোন ভাবে মুছে ফেলতে না পারেন সে সুরক্ষা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।


চিত্রঃ ইউএলবি।


চিত্রঃসিভিআর ও এফডিআরের অবস্থান।


চিত্রঃউদ্ধারকৃত সিভিআর।

ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডারঃ এই যন্ত্রটি দেখতে প্রায় সিভিআরের মতোই। শুধু পার্থক্য হল যে, এতে বিমানের আকার ও বয়স অনুযায়ী ভয়েস ডাটার পরিবর্তে টেকনিক্যাল ডাটা অর্থাৎ বিমান চলাকালীন যান্ত্রিক অবস্থার বিভিন্ন প্যারামিটার গুলো সংরক্ষিত থাকে। এর সাথেও একটি ইউএলবি সংযুক্ত থাকে এবং দূর্ঘটনার কারনে যাতে এর সংরক্ষিত তথ্য অক্ষত থাকে তার ব্যবস্থাও সিভিআরের মত। প্রথম প্রজন্মের এফডিআরে প্রয়োজনীয় কিছু প্যারামিটার সংক্ষেন ব্যবস্থা ছিল। যেমন উচ্চতা অনুসারে বায়ুর চাপ (প্রেসার অল্টিচিউড), বায়ুর চাপ (ইন্ডকেটেড এয়ার স্পীড), চৌম্বকীয় দিক (ম্যাগনেটিক হেডিং), নরমাল এক্সিলারেশন, মাইক্রোফোন কিয়িং, ইঞ্জিন প্যারামিটার, ফ্লাইট কন্ট্রোল প্যারামিটার সমূহ, ফ্ল্যাপের অবস্থান ইত্যাদি। পরবর্তিতে কিছু দূর্ঘটনার পর্যালোচনা থেকে আরও কিছু তথ্য সংরক্ষনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন বিমানের আকারের উপর নির্ভর করে তাতে ১১টি থেকে ৮৮টি প্যারামিটার সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়।
তৃতীয় প্রজন্মের ডিজিটাল এফডিআর-এর মধ্যে সাত শতাধিক প্যারামিটার সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মাইক্রোফোন অন হলেই (রেডিও ট্রান্সমিশনের সময়) সিভিআর ও এফডিআর এর মধ্যে তথ্য সংরক্ষিত হতে থাকে। এর মধ্যে শেষ ২৫ঘন্টা বিমান চলাকালীন ডাটা রেকর্ড থাকে এবং সিভিআর এরম ত প্রান্তহীন চক্র (এন্ডলেস লুপ প্রিন্সিপাল) পদ্ধতিতে রেকর্ডিং করা হয়। এফডিআর এর ডাটা বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী বুঝতে পারে যে, একটি বিমান কিভাবে ধাপে ধাপে দূর্ঘটনার দিকে অগ্রসর হয়েছিল।


চিত্রঃ এফডিআর।

এবার আমরা আবার দূর্ঘটনা পরবর্তী তদন্তে ফিরে আসি।


চিত্রঃ পরীক্ষাগারে সিভিআর।

উদ্ধারকৃত সিভিআর পাঠানো হল এনটিএসবি-এর পরীক্ষাগারে। সেখানে শব্দ বিশ্লেষণ করে দেখা গেল যে, উড্ডয়নের জন্য ইঞ্জিন যে পরিমান ধাক্কা (থ্রাস্ট) দেয়ার কথা ছিল সে পরিমান ধাক্কা (থ্রাস্ট) তৈরীতে ব্যর্থ হয়েছে।এর কারণ উদ্ধারে আরও পরীক্ষা চালায় উক্ত বিমান প্রস্তুতকারী সংস্থা বোয়িং নিজেই। পরীক্ষার ফল হিসাবে বেরিয়ে আসে যে, ইঞ্জিনের সেন্সরটি (ইঞ্জিন ইনলেট প্রোব) থ্রাস্টের মাত্রা নিরুপন করতে ব্যর্থ হয়েছিল আর এর পিছনের কারণ ছিল যে, সেন্সরটির উপর বরফ জমে গিয়েছিল। পরবর্তীতে বোয়িং এই সেন্সর বরফ থেতে রক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করে।

এই ভাবে একটি যন্ত্র আমাদের বিমান যাত্রাকে নিরাপদ করার স্বার্থে অবদান রেখে চলেছে সুদীর্ঘ ৪০ বছর ধরে।

ধন্যবাদ হে কালো বাক্স।

আমার আরেকটি পোস্টঃ আকাশের বিপত্তি
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০১৬ দুপুর ১২:৪২
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ঢাকার শিশুদের ইদ বিনোদন

লিখেছেন তারেক_মাহমুদ, ১৯ শে জুন, ২০১৮ দুপুর ১:০৫



ইদের পর অফিস খুলেছে দুইদিন, তবে রাজধানীতে এখনো ঈদের আমেজ কাটেনি। ঢাকার রাস্তাঘাট একদম ফাকা, অন্য সময় যেখানে দুই আড়াই ঘন্টা লাগতো, আজ ত্রিশ মিনিটেই অফিসে চলে আসলাম। গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বকাপ ফুটবল- দলগুলোকে সাপোর্টের নামে কী করছি!!

লিখেছেন কাওসার চৌধুরী, ১৯ শে জুন, ২০১৮ বিকাল ৫:৫২


:: বাঙালিরা নিজের সফলতার চেয়ে অন্যের ব্যর্থতায় বেশি খুশি হয়। অন্যভাবে বললে, ব্যর্থ মানুষরা সফল মানুষদের ব্যর্থ হতে দেখতে চায়, বড়ই পুলকিত হয়। আর খেলাধুলা ক্ষেত্রে তো আমরা আরো... ...বাকিটুকু পড়ুন

সত্যের পথে চলতে হবে এটাই শেষ কথা

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৯ শে জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:২৪


ভোটাধিকার নেই বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে
আছে মেতে সবেই-
নিজোদেশে বাস করে প্রবাসীদের মতো
তবু মনে নেই তাদের গভীর কোন ক্ষত।
যুদ্ধার্জিত স্বাধীনতারে কত দামে বিক্রি করে
আমরা সবে আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের চোখে দেখা কয়েকটি মৃত্যু

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে জুন, ২০১৮ রাত ৮:১৭



১। ভদ্রমহিলা আমাদের বাসায় ভাড়া থাকতেন। তার দুইটা মেয়ে দশ-বারো বছর। স্বামী রেড ক্রিসেন্টে চাকরি করেন। কথা নেই, বার্তা নেই মহিলা হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রচুর বমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

"স্বপ্ন বয়ন"

লিখেছেন বৃষ্টি বিন্দু, ১৯ শে জুন, ২০১৮ রাত ৮:২০



কবিতা তুমি কোথায়?
কোথায় তোমার গন্তব্য?
এত পথ চলো,
এতো কবির নিউরনে ঝড় তুলো!
অথচ তুমি ক্লান্ত নও।
নাকি প্রচণ্ড ক্লান্ত,
তাও শুধু আমার জন্য?
মাঝে মাঝে পথ ভুলে চৌরাস্তায় দাঁড়িও।
সেখান থেকে তোমাকে নাহয় পিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×