কলব বা অন্তকরণ সৎ-অসৎ সমস্ত প্রকার কার্যকলাপের পরিকল্পনাস্থল। শয়তান এই স্থানেই বাসা বাঁধে। মানুষের শত্রু এই শয়তানই মানুষকে অসৎ কর্মের প্রতি প্ররোচিত করে। শয়তান যতন কলবকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, ততণ পর্যন্ত কলব থেকে বিশুদ্ধ নিয়ত হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, কলবে তার অবস্থানের কারণে কলবও অশুদ্ধ হয়ে যায়। তাই অশুদ্ধ কলবের নিয়ত অশুদ্ধ হতে বাধ্য।
অতএব, কলব বিশুদ্ধ করতে হলে অবশ্যই শয়তানকে সেখান থেকে বিতাড়িত করতে হবে ।তবেই সম্ভব হবে এখলাছ বা বিশুদ্ধ নিয়ত করা । হাদিস শরীফে উল্ল্রেখ করা হয়েছে, শয়তান মানুষের কলবের মধ্যে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকে । যদি কলব জিকির করে তবে শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে যায়, আর যদি কলব জিকির থেকে গাফেল থাকে তবে শয়তান আবার সেখানে বসে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে (বোখারী)।
শয়তান তার মূল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আমাদের নামাজের সময় । কারন সে জানে, যদি নামাজ আমাদের বিশুদ্ধ হয়,তবে নামাজের মাধ্যমে যে আল্লাহ্প্রদত্ত শক্তি আমরা লাভ করব সেই শক্তির মোকাবেলা করার মতা তার নেই । সমস্ত এবাদতের সারাংশ ‘নামাজ’ বিশুদ্ধ হলেই কেবল আমরা আল্লাহ্পাকের যাবতীয় অপছন্দনীয় কার্যকালাপ থেকে মুক্ত হতে পারব ।
আল্লাহ্পাকের এরশাদ আছে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে যাবতীয় অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে’ (সুরা আনকাবুত)। নামাজ তখনই বিশুদ্ধ হয় যখন নামাজী তার শরীর, পোশাক, মন পবিত্র করে একমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টির নিয়তে নামাজের রোকনসমূহ যথাযথভাবে আদায় করতে পারে। আল্লাহ্পাক পবিত্র। পবিত্র ব্যক্তিগণ ব্যতীত অন্য কেউই তাঁর এবাদতে সফল হতে পারে না। শুধু বাহির নয় অন্তরও পবিত্র করতে হবে। অজু বা গোসল দ্বারা বাহ্যিক পবিত্রতা হাসেল হয়। আর অন্তরের পবিত্রতা হাসেল হয় আল্লাহ্পাকের জিকির দ্বারা।
কলবে আল্লাহ্পাকের জিকির জারী থাকা প্রয়োজন। এবং এইরুপ জিকির সকল সময়ই জারী থাকা প্রয়োজন। যখনই কলব জিকির থেকে গাফেল থাকবে তখনই কলবের সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণ ভার চলে যাবে শয়তানের হাতে। সে তখন সর্বপ্রকার নেক আমলের উৎস নিয়তকে করবে কলুষিত এবং সমস্ত অসৎ কার্যাবলী থেকে মুক্তির চাবিকাঠি নামাজের একাগ্রতা নষ্ট করে দিয়ে নামাজকে করবে বরবাদ। হাদিস শরীফে আল্লাহ্পাক এরশাদ করেছেন, ‘সালাত কায়েম কর আমার স্মরণের জন্য’ (সুরা ত্বা হা)।
এই বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার পেতেই হবে। তাই কলবে বিরতিহীনভাবে জিকির জারী করবার জন্য আমাদেরকে কলবী এলেমের ওস্তাদ বা পীরের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রকৃত পীর এই এলেমেরই বিশেষজ্ঞ।
এবার বুঝা গেল সুফীগণের মধ্যে প্রচলিত যে কোন তরিকায় দাখেল হওয়ার উদ্দেশ্যই হচ্ছে এখলাছ অর্জন করা। অন্য কোন উদ্দেশ্য নয়। যেমন অনেকেই নানান রকম বিকৃত ইচ্ছা নিয়ে বিভিন্ন পীরের দরবারে ভিড় জমান এবং কোন কোন পীর নামধারী ব্যক্তিও মানুষের মূল উদ্দেশ্য বিবর্জিত এই সব কলুষ ধারণাকে লালন করে থাকেন।
আমরা সংপ্তি আলোচনায় জানলাম যে, এলেম, আমল, এখলাছ-তিনটিই জরুরী। এদের যে কোন একটি বর্জন করলে অপর দুটিও মূল্যহীন হয়ে যায়। যেমন কোন ব্যক্তির যদি এলেম না থাকে, শুধু আমল, এখলাছ থাকে তবে তার কোনই মূল্য হতে পারে না। আবার যদি এলেম ও এখলাছ থাকে- আমল না থাকে- তখনও এই অবস্থা। আবার এলেম, আমল থাকলেও তা এখলাছের অভাবে হবে নিরর্থক।
গুতরাং বুঝা গেল, শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দ হতে গেলে সূফী স¤প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত যে কোন তরিকায় দাখেল হওয়া উচিত। কারণ, তরিকায় দাখেল না হলে প্রকৃত এখলাছ হওয়া সম্ভব নয়। এই বিবেচনায় তরিকত জাহেরী শরীয়তের খাদেম বা সহায়ক।
এখন প্রশ্নঃ কোন তরিকা গ্রহণ করতে হবে? প্রকৃত পে সব তরিকার উদ্দেশ্য একই। তবে জামানার জন্য সবচেয়ে উপযোগী তরিকা হচ্ছে ‘খাস্ মোজাদ্দেদিয়া তরিকা।’ কারণ অন্যান্য তরিকার মত কঠোর মোজাহেদা এই তরিকায় উন্নতির শর্ত নয়। আল্লাহ্পাক যেমন আজিমত (কষ্টসাধ্য) আমল পছন্দ করেন, তেমনি রুখসত (সহজসাধ্য) আমলও পছন্দ করেন। জীবন এখন জটিল। সময় সংকীর্ণ। তাই সহজ তরিকাই সকলের গ্রহন করা দরকার। এই তরিকায় মুরিদ অতি সহজেই তার পীরের রুহানী তাওয়াজ্জোহ্ এর বদৌলতে নিজের কলব জিন্দা করে নিতে পারেন। এর নিম্ন সময়সীমা মুরিদ হবার সঙ্গে সঙ্গে। উর্ধ্ব সময়সীমা চল্লিশ দিন। এর পরের স্তরসমূহও অতিক্রম করা যায় অতি দ্রুত এবং অত্যন্ত সহজে।
একটা কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, তরিকা পৌছায় না। পৌছায় পীর। অর্থ্যাৎ যত শানদার তরিকাই হোক, সেই তরিকার পূর্ণ কামালিয়াতসম্পন্ন পীরই কেবল মুরিদগণকে মকছুদ মঞ্জিলে পৌছানোর ব্যাপারে রুহানী সহযোগীতা প্রদান করতে সম। পীরের কামালিয়াত না থাকলে শুধুমাত্র তরিকার নামে বায়াত হলে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না।
আমরা মুসলমান। আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে রসুল স. এর পবিত্র বাণী, কুল্লু মুসলিমুন ইখওয়াতুন। সমস্ত মুসলমান ভাই ভাই। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আল্লাহর কালাম, উম্মাতুন ওয়াহিদাতুন- তোমরা তো একই জাতি। আজ মুসলমানদের দুর্দিন। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে আমরাই আজ সবার চাইতে বেশী অবহেলিত, লাঞ্ছিত। আমাদের নবী মোহাম্মদুর রসুলুল্লাহ (সঃ) যেমন নবীগণের ইমাম তেমনি আমাদের হবার কথা পৃথিবীর সমস্ত সম্প্রদায়ের ইমাম বা নেতা। কিন্তু বাস্তব আজ আমাদেরকে কি দৃশ্য দেখাচ্ছে? কী মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, কী মুসলমান সংখ্যালঘু দেশ সবস্থানেই আমরা লাঞ্ছিত, অপদস্থ। কোথাও সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে আমরা প্রবৃত্তির পীড়নের শিকার। আবার কোথাও দারিদ্র, অশিা ও সংখ্যালঘুতার কারণে ইসলামের দুশমনদের দ্বারা নিগৃহীত।
এ অবস্থা থেকে আমাদের আশু উত্তরণ প্রয়োজন। হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রয়োজন। আর প্রয়োজন আতœসমালোচনায় নিমগ্ন হয়ে নিজেদের দোষত্র“টি থেকে মুক্তির সাধনা। আমরা যারা যে স্তরেরই লোক হইনা কেন- কৃষক শ্রমিক থেকে রাষ্ট্রের কর্ণধার, সবারই মূল পরিচয়, আমরা আল্লাহ্পাকের বান্দা- রসুল পাক (সঃ) এর উম্মত। আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানের উপরে দায়িত্ব দেশে ইসলামী আইন কানুন প্রবর্তন করা। যাতে করে মানুষের সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আল্লাহ্পাকের আইনই আইন। হে রাষ্ট্রপ্রধানগণ! কোন সাহসে আপনারা আল্লাহ্র জমিনে আল্লাহ্র দ্বীন-বিরোধী আইন জিইয়ে রেখেছেন? মনে রাখবেন, আখেরাতে আল্লাহ্র সম্মুখে আপনাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
আলেমগণের উপরে দায়িত্ব- দ্বীনের শিায় সকল শ্রেণীর মুসলমানকে উজ্জীবিত করা। কোরআন হাদিস এর ভিত্তিতে সমকালীন যুগজিজ্ঞাসার ফায়সালা করা, শরীয়তের শান শওকত বুলন্দ করা। আপনারা নিজেদের নায়েবে রসুল বলে মনে করেন। কিন্তু কোথায় সেই কোরবানী, ত্যাগ? হে আলেম স¤প্রদায়! ভেবে দেখুন, আপনারা কি নায়েবে রসুলের দায়িত্ব পালনে তৎপর রয়েছেন? সম্মান, কর্তৃত্ব, অর্থ, খ্যাতি লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থেকে আপনারা কি বিস্মৃত হননি মহানবী (সঃ) এর বাণী, ‘আখেরাতে ঐ আলেমের সবচেয়ে বেশী শাস্তি হবে যে তার এলেম দ্বারা উপকৃত হননি’।
সূফী স¤প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব- মানুষের অন্তর্জগতে আল্লাহ্প্রেমের নূরপ্রবাহ জারী করবার মহান কাজে আঞ্জাম দেয়া। কিন্তু কি হচ্ছে বাস্তবে? হে সূফী স¤প্রদায়! অর্থ উপার্জন, নজরানা, তাবিজ, ঝাড়, ফুঁক, গান-বাজনা, প্রতিপত্তিশালী মানুষের মোসাহেবী- এসবই হয়ে উঠেছে আপনাদের মূল উদ্দেশ্যে। দ্বীনের খাদেম বলে নিজেদের পরিচয় দিয়ে দ্বীনের দুশমনির কাজে আপনারা লিপ্ত হয়েছেন কেন?
দ্বীনের দুশমন তিনটি দল। দুনিয়াদার রাষ্ট্রনায়ক, দুনিয়াদার আলেম (ওলামায়ে ছু) এবং ভন্ড সুফী। এই তিন দলের এছলাহ্ (সংশোধন) না হলে দ্বীনের শান বিকশিত হতে পারে না। দ্বীনদার রাষ্ট্রনায়ক, দ্বীনদার আলেম এবং কামেল সুফীই দ্বীনকে সমুন্নত করবার মহান কাজের সহযোগী হতে পারেন।
সাধারন মুসলমানগণ দ্বীনকে বিকৃত করবার দায়ে প্রত্যভাবে দায়ী নন। তবুও তাঁরা সম্পুর্ণভাবে দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। দ্বীনের জ্ঞানার্জন করবার জন্য দ্বীনদার আলেম এবং কামেল পীরের শরণাপন্ন হওয়া তাঁদের জন্যও জরুরী। কিন্তু তারা আলেম ও পীরের শরণাপন্ন হন দুনিয়ার স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। আর তাদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবসা বিস্তার করে বসেছে আলেম ও পীর স¤প্রদায়ের এক বিরাট অংশ।
আর এক দিকে বয়ে যাচেছ ইসলামবিরোধী মতবাদের সয়লাব। শিতি ও বুদ্ধিজীবী স¤প্রদায়ের এক বিরাট অংশ অনৈসলামিক মতবাদের অন্ধকারে ক্রমশঃ নিমজ্জমান। তাঁরাও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তাঁরা ইসলামবিরোধী মতবাদের বিরাটকায় গ্রন্থ অধ্যয়নে, অনুশীলনে ও গবেষণায় সারাণ নিমগ্ন থাকেন, কিন্তু কোরআন হাদিসের শিার প্রতি এতটুকু দৃষ্টিপাত করবার সময় তাঁদের নেই। তাঁরা কি জানেন না দ্বীনের জ্ঞানার্জন, শরীয়তের হুকুম শিতি-অশিতি, শ্রমিক, কৃষক, শিল্পপতি, অধ্যাপক, সাংবাদিক, বৈজ্ঞানিক,বুদ্ধিজীবি সকলের উপর ফরজ? আমাদের রাষ্ট্রনায়কগণ, আমাদের আলেম সমাজ, আমাদের মাশায়েখবৃন্দ, আমাদের সমাজ সচেতন শিতি স¤প্রদায়- আমরা সবাই মুসলমান জামাতের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের কারো পদস্খলনে আমরা কেউই উদাসীন থাকতে পারি না। আমরা সবাইতো একক জাতি। উম্মাতুন ওয়াহিদাতুন। আমরা জানি আমাদের কোন অঙ্গ দুর্বলতার শিকার হলে তাতে আমাদেরই তি, তাতে আমাদেরই শক্তি খর্ব হয়। তাই আমরা আমাদের সম্মিলিত আতœসমালোচনার অংশ হিসাবে প্রত্যেকেই নিজেদের দিকে দৃষ্টিপাত করে ভাল করে বিবেচনা করে দেখি ঃ
১. আমাদের আকিদা ঠিক কিনা?
২. আমরা দ্বীনের এলেমের দুইটি ধারাকেই (জবানী এলেম ও কলবী এলেম) সমান গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছি কিনা?
৩. এলেম অনুযায়ী আমল করছি কিনা?
৪. এখলাছ অর্জনের জন্য যুগোপযোগী তরিকায় দাখেল হয়েছি কিনা?
উপরোক্ত প্রশ্নগুলির বাস্তব জবাব দ্বারা আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবন সজ্জিত করতে হবে প্রথমে। তারপর এর প্রভাব ছড়িয়ে দিতে হবে পারিবারিক জীবনে, সমাজ জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে এবং আর্ন্তজাতিক জীবনে। তবেই আমাদের সমষ্টিগত জীবনে কায়েম হবে পূর্ণ দ্বীন। তবেই তবলীগ, একামতে দ্বীন, জেহাদের হক আদায় করা আমাদের পে সম্ভব হবে।
যে ব্যক্তি তার নিজের অস্তিত্বের রাজত্বে পূর্ণ দ্বীন কায়েম করতে সম নয়, সেকি কখনো রাষ্ট্রীয় জীবনে, সামাজিক জীবনে দ্বীন কায়েম করতে সম হতে পারে? কখনই নয়।
অতএব, হে মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দ! আসুন হুঁশিয়ার হই। সমাজে, দেশে ও বিশ্বে পূর্ণ দ্বীন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা সামনে রেখে প্রথমেই নিজেদেরকে পূর্ণ দ্বীনের সাজে সজ্জিত করার সাধনায় নিয়োজিত হই আমরা।
ওয়াস্সালামো আউয়ালাঁও ওয়া আখেরান।
(কৃতজ্ঞতা ঃ আমার মুর্শিদ অলিয়ে মুকাম্মলি হযরত মামুনুর রশিদ (মাঃ))

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


