somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শবে বরাত প্রসঙ্গে শায়েখ আবদুল হক মোহাদ্দেছে দেহলভী (রহঃ)

০৩ রা আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৫:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাদারেজুন নবুওয়াত-শায়েখ আবদুল হক মোহাদ্দেছে দেহলভী (রহঃ), তৃতীয় খন্ড
শবে বরাতের নামাজঃ
শাবান চান্দ্রমাসের মধ্যবর্তী রাতে রসুল আকদাস স. রাত জেগে নামাজ আদায় করতেন। আমাদের দেশে এই রাত্রিকে বলা হয় শবে বরাত। এই রাত্রির ইবাদত সম্পর্কে মা আয়েশা সিদ্দিকা রা. এর বর্ণনা রয়েছে, তিনি বলেছেন, রসুল পাক স. এ রাত্রিটি ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করতেন। দীর্ঘণ ধরে সেজদাবনত থাকতেন। মনে হতো তাঁর পবিত্র আত্মা বুঝি তার পবিত্র শরীরের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছিন্ন করেছে। একবার আমি একথা মনে করে কাছে গিয়ে তাঁর আঙ্গুল নাড়াচাড়া করলাম। তখন তিনি স. কিঞ্চিত আন্দোলিত হলেন এবং সেজদা থেকে মাথা উঠিয়ে বসলেন। নামাজ শেষে বললেন, হে হোমায়রা, তুমি কি মনে করেছো আল্লাহর রসুল তোমার অধিকার খর্ব করেছেন কিংবা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন? আমি বললাম, হে আল্লাহ রসুল (সঃ), এরকম ভাবনা আমার নেই।আপনার সুদীর্ঘ সেজদা দেখে আমি মনে করেছিলাম, আপনার প্রাণপাখী দেহ পিঞ্জর ত্যাগ করেছে। তিনি বললেন, তুমি কি জানো না, এটা কোন রজনী? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রসুলই উত্তমরূপে অবগত। তিনি স. বললেন, এই যামিনী হচ্ছে শাবানের মধ্যবর্তী যামিনী। এই নিশীথে আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন। এক বর্ণনায় রয়েছে, মনোনিবেশ করেন সূর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত । একথার অর্থ- অন্যান্য রাত্রির তুলনায় আল্লাহ পাক এই রাত্রিতে অধিক অনুগ্রহপূর্ণ মনোযোগ প্রদান করেন। অন্যান্য রাতের শেষভাগে আল্লাহপাকের বিশেষ মনোনিবেশ ঘটে। আর এই রাতে ঘটে সমস্ত রাত্রি জুড়ে। এই রজনীতে তিনি ক্ষমা প্রার্থীকে মা করেন এবং রহমত যাঞ্চাকারীকে দান করেন বিশেষ রহমত। তবে এই মহিমময় রাত্রিতে তিনি হিংসুকদেরকে ক্ষমা করেন না।

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, একরাতে তিনি স. আমার নিকটে এলেন, কিন্তু একটু পরেই দ্রুত উঠে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। রাতটি ছিলো আমার অধিকারের রাত। অথচ তিনি আমাকে এভাবে রেখে চলে গেলেন বলে আমিও তাঁর পিছু পিছু চললাম। এভাবে চলতে চলতে একসময়ে দেখলাম তিনি জান্নাতুল বাকী কবরস্তানে আকাশের দিকে মস্তক উত্তোলন করে প্রার্থনা করছেন। এক সময় আমাকে দেখতে পেয়ে তিনি স. বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি মনে করেছো যে, আল্লাহ এবং তার রসুল তোমার প্রতি জুলুম করেছেন? আমি বললাম, ইয়া রসুলাল্লাহ, আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো আপনার অন্য স্ত্রীর নিকট গমন করছেন। তিনি স. বললেন, আজ মধ্যবর্তী শাবানের রজনী। এই রজনীতে আল্লাহতায়ালা প্রথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বনু কিলাব গোত্রের বকরীগুলোর পশমের সমপরিমাণ মানুষকে মা করে দেন। কেবল মা করেন না অংশীবাদীকে, চোগলখোরকে, রক্তের বন্ধন ছিন্নকারীকে, মানুষকে কষ্টদানকারীকে, পিতা-মাতার অবাধ্যকে, মদ্যপানকারীকে এবং হিংসুককে। এ রজনীতে আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদের রিজিক ও আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করেন। কে কে এ বৎসর হজে গমন করতে পারবে সে কথাও এই রজনীতে লিপিবদ্ধ করা হয়।

শাবানের মধ্যবর্তী রাত্রির ফযীলত সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে মর্যাদার দিক দিয়ে ‘শবে কদর’ রাত্রির পরই এই রাত্রির মর্যাদা। হাদিস শরীফে চারটি রাত্রিতে আল্লাহ পাক তাঁর বিশেষ রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন- ঈদুল আযহার রাত্রি, ঈদুল ফিতরের রাত্রি, শাবানের রাত্রি এবং আরাফার রাত্রি।শাবানের রাতে ইবাদত করা এবং দিনে রোজা রাখার বিষয়টি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। শাম দেশের তাবেয়ীগণের মদ্যে খালেদ ইবনে মা’দান, নোমন ইবনে আমের এবং মাকনুল এই রাত্রে অধিকর ইবাদত করতে সচেষ্ট থাকতেন। তখন তারা উত্তম পোশাক পরিধান করতেন, আগর বাতি জ্বালাতেন, সুরমা ব্যবহার করতেন এবং মসজিদে গিয়ে ইবাদত করতেন। তবে হেজাজ ও মদীনার আলেমগণ তাঁদরে অনুসরণ করতেন না। তাঁরা মনে করতেন, এই রাতে মসজিদে সমবেত হয়ে ইবাদত করা বেদাত। শাম দেশের ইমাম আওজায়ী এই রাতে একা একা নামাজ পড়াকে মকরূহ মনে করেন নি। রসুল পাক স. থেকে আমল কিয়ামে লাইল, দীর্ঘ সেজদা এবং জান্নাতুল বাকীর কবর বাসীদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থণা-এগুলো ছাড়া অন্য কোন প্রকার ইবাদতের কথা বিশুদ্ধতার স্তর পর্যন্ত পৌছেনি। জননী আয়েশা সিদ্দিকা রা. বলেছেন, সেদিন ছিলো মধ্য শাবানের রজনী। বসুল আকদার স. আমার কাছে ছিলেন। গভীর নিশিথে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমি দেখলাম তিনি আমার শয্যায় নেই। আমি তখন ঈর্ষান্বিত হলাম এই ভেবে যে, তিনি হয়তো তাঁর অন্য স্ত্রীর নিকট গমন করেছেন। আমি চাদর মুড়ি দিয়ে তাঁর সন্ধানে বের হলাম। কিন্তু তাঁকে কোথাও পেলাম না। যখন আপন প্রকোষ্ঠে ফিরে আসছিলাম তখন হঠাৎ দেখলাম তিনি স. মসজিদে শুভ্র বস্ত্রে ন্যায় সেজদাবনত হয়ে প্রার্থনা করছেন- হে আমার আল্লাহ। আমার চিন্তা চেতনা এবং কৃষ্ঞ কেশপাশ তোমাকে সেজদা করেছে। আমার অন্তর এখন বিশ্বাসে পূর্ণ নিমগ্ন। আমার অঙ্গপ্রতঙ্গ এবং সত্তা সবকিছূই এখন তোমাতে নিমজ্জিত। হে মহান আমি সকল মহান কর্মের অভিলাষী, তুমি সকল বৃহৎ পাপ ক্ষমা করে দাও। আমার অবয়ব এখন ওই সত্তায় সমর্পিত যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, অস্তিত্ব দান করেছেন, এবং দান করেছেন শ্রুতি এবং দৃষ্টি। এভাবে প্রার্থনার পর তিনি সেজদা থেকে মস্তক উত্তোলন করলেন। তারপর পুনরায় সেজদাবনত হয়ে বললেন, হে আমার প্রভুপ্রতিপালক, তোমার প্রসন্নতার সঙ্গী হয়ে আমি তোমার অপ্রসন্নতা থেকে পরিত্রাণ চাই, তোমার ক্ষমার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তোমার রোষ থেকে নিরাপত্তা চাই, তুমি যেরূপ প্রশংসার উপযোগী সে রকম প্রশংসা করার সাধ্য আমার নেই, আমি আমার ভ্রাতা দাউদের মতো তাই বলি, আমার এই সেজদাবনত অবস্থায় তুমি মা করে দাও। হে আমার পরমতম প্রভু , দাসতো কেবল সেজদা করার অধিকারই পেয়েছে। এরপর মস্তক উত্তোলন করলেন রসুল আকদাস স.। তারপর বললেন, হে আমার আল্লাহ , তুমি আমাকে এমন পবিত্র হৃদয় দান করো যা অংশীবাদীতা থেকে মুক্ত। এই অন্তর যেনো কখনো অনাচারী ও হতভাগ্য না হয়। এভাবে ইবাদত শেষ করে তিনি স. আমর নিকট এলেন। আমি তখন হাঁপাচ্ছিলাম। তিনি স. আমার উরুদেশে আলতোভাবে হাত রেখে বললেন আক্ষেপ এই উরুদ্বয়ের জন্য, এরা কতই না কষ্ট করেছে। হে হোমায়রা, আজকের রজনী হচ্ছে শাবানের মহিমময রজনী। এ রাতে আল্লাহতায়ালা নিম্নতম আকাশে অবতরণ করেন এবং বান্দাদেরকে মা করে দেন, কিন্তু এই ক্ষমা প্রাপ্তির বাইরে থাকে মুশরিক ও হিংসুক।

মাশায়েখগণের অজিফার গ্রন্থসমূহে এই রাতে একশ’ রাকাত নফল রামাজ পড়ার কথা রয়েছে। প্রতি রাকাতে দশবার করে সুরা এখলাস পড়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে মোহাদ্দেছগণের নিকট এরকম আমল বিশূদ্ধ সূত্রে সমর্থিত নয়। শায়েখ আবুল হাসানের বর্ণনায় রয়েছে আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী রা. বলেছেন, আমি রসুল আকরাম স.কে শাবানের রাতে চৌদ্দ রাকাত নামাজ পড়তে দেখেচি। সালাম ফিরানোর পর তিনি স. চৌদ্দবার সুরা নাস এবং একবার আয়াতুল কুরসী পাঠ করেছেন। তারপর পাঠ করেছেন ‘লাক্বদ জায়াকুম রসুলু ম্মিন আন্ ফুসিকুম ’ এই আয়াতটি।এই আমল সম্পর্কে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি স. আমাকে বলেছিলেন, যে এরকম আমল করবে সে বিশটি মকবুল হজ এবং বিশ বৎসরের মকবুল রোজার সওয়াব লাভ করবে। আর পরদিন রোজা রাখলে পাবে দুই বৎসরের রোজা রাখার সওয়াব। মোহাদ্দেছগণ এই হাদিসের সূত্র সম্পর্কে নানা কথা বলেছেন। ইমাম বায়হাকী বলেছেন, প্রকাশ থাকে যে হাদিসটি মারফু। ওয়াল্লাহু আলাম।

আমাদের দেশে শবে-বরাতের রাতে আলোক সজ্জা ইত্যাদি করার যে রীতি রয়েছে তা শরিয়তসিদ্ধ নয়। এ সকল রীতি হিন্দুদের দেওয়ালী পূজার অনুকরণ অথবা অগ্নি পূজকদের অসৎ রীতির অনুরূপ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৫
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×