"বাইজী" শব্দটিতে একটা অন্যরকম আকর্ষণ আছে তাই না??
এদের নিয়ে কত প্রেম কাহিনী, গল্পকথা, সিনেমা নাটক তৈরি হয়েছে!! সেই আনারকলি থেকে শুরু করে হাল আমলের ভুলভুলাইয়া পর্যন্ত।
আর শরৎ বাবুর কল্যাণে রাজলক্ষ্মী , চন্দ্রমূখিদের নাম আর পেশার সাথে কম বেশি সবাই পরিচিত।
বাইজী শব্দটির বাই' অংশের অর্থ হলো বিশেষ পেশার মেয়ে, আর জী' অংশটি সন্মান সূচক। আবার অনেকের মতো এটা এসেছে বাজী থেকে, বাজীর অর্থ হলো বিনোদনমূলক শাররীক কসরত দেখানো, আর যারাই এই শিল্পের প্রদর্শনকারীরাই হলো বাইজী।
মুঘল চিত্রকলায় বাইজী
মুঘল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় খ্রী: ষোড়শ শতকে লক্ষনৌ এর শৈল্পিক পরিবেশে এক পেশাদার গায়ক-বাদক শ্রেণীর উদ্ভব হয়, এরাই বাইজী নামে পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
এই পেশাদার শিল্পীদের ছোট বেলা থেকেই কথ্ক নাচ আর শাস্ত্রীয় সংগীত বিশেষ করে গজল আর ঠুমরীতে প্রশিক্ষন দেয়া হতো। যখন এরা গান ও নাচে যখন অতন্ত্য দক্ষ হয়ে ওঠে, তখন তাদের বলা হতো তাওয়াফ। কথিত আছে আগে নবাব পুত্রদের তাওয়াফ শিক্ষা দেয়া হতো।
এরা মুলত: নবাব, রাজাদের দরবারে পরবর্তীতে ধনী, অভিজাতদের মেহফিলে নাচ গান পরিবেশনা করতো। ছাড়া এই শ্রেণীর সাথে প্রমোদ বিহারেও সঙ্গী হতো এরা। অনেক নবাব তনয়, জমিদারদের এই রূপজীবিনিদের বিয়ে করার ইতিহাসও রয়েছে। সম্রাট শাজাহানের এমন দু'জন স্ত্রী ছিলেন। এরা হলেন শ্রী মানভবতী বাইজী লাল সাহেবা (বি ১৬২৬) এবং লীলাবতী বাইজী লাল সাহেবা (বি ১৬২৭ এর আগে)। এছাড়া
আনারকলি আর সেলিমের প্রেম কাহিনী নিশ্চয়ই সাবারই জানা!!
আনারকলি-সেলিম
বাইজীরা তাদের নিজের ঘরে অথবা রাজা কিংবা জমিদারদের আমন্ত্রণে দরাবার আর মেহফিলে নাচ গান পরিবেশনা করতেন। সেই সময়ে বাইজীদের পরিবেশনা উপভোগ করা আভিজাত্যের একটা অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
জাপানী গেইসাদে মতো আমাদের এই উপমহাদেশীয় পেশাজীবী এই শিল্প সাধিকাদের মুল উদ্দেশ্য ছিল শিল্পের পরিবেশনা, যৌনতা ছিল গৌন বিষয়।
বাংলায় বাইজীদের আগমন শুরু হয় বিশেষ করে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের হাত ধরে। শিল্প সংস্কতির পৃষ্ঠোপোষক হিসেবে মুঘল শাসক নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ সুবিখ্যাত। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিশেষ করে ঠুমরী, ঠাপ্পা, আর কথ্থক নৃত্যে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করছিলনে।
খ্রী: অস্টাদশ শতকে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ বিতারিত হয়ে কোলকাতার মেটে বুরুজে অভিবাসনে জন্য আসলে তার সাথে সাথে গায়ক বাদকদের বিশাল একটি দলও ধীরে ধীরে বংলায় চলে আসতে থাকে।
নাম না জানা দু'জন
ঢাকাতেও মুঘল আমল থেকেই উপস্থিতির কথা জানা যায়। সপ্তদশ শতকে সুবাদার ইসলাম খাঁ এর দরবারে কাঞ্চনী নামক বাইজীদের নৃত্য গীত পরিবেশনার কথা জানা যায়। নবাব নুসরাত জং, নবাব শামসুদৌলা, নবাব কামরুদৌলা, নবাব আব্দুল গণি এবং নবাব আহসানুল্লাহ এর সময়ে বাইজীদের পারফরমেন্স উৎকর্ষতার শীর্ষে উঠেছিল।
আহসান মঞ্জিলের রং মহলে, শাহাবগের ইশরাত মঞ্জিল, দিলকুশার বাগান বাড়িতে নিয়মিত বাইজী নাচের আসর বসতো। মাঝে মাঝে বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে কোলকাতা থেকেও বাইজীরা আমন্ত্রীত হতেন। আমিরজান, পান্না বাই, গওহরজান, হীরামতি, রাজলক্ষী প্রমূখ ছিলেন ঢাকার প্রখ্যাত বাইজী।
এই বাইজীরা কিন্তু আমাদের শিল্পের উন্নয়ন আর বিকাশে অনেক গরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলন, যে কথাটা আমার কখনোই সেভাবে মনে করি না। গওহরজান উপমহাদেশের প্রথম গায়িকা যার রেকর্ড বের করা হয়েছিল হিজ মাস্টার্স ভয়েস থেকে। জাদ্দান বাই সিনেমার অভিনয় করতেন (এর কন্যাই হলেন নার্গিস)। বাংলাদেশের প্রথম নির্বাক চলচিত্র
The Last Kiss (১৯৩১) এ অভিনয় করেছিলানে বাইজী দেবী বাই।
ইনিই দেবী বাই!!
এখানে নওয়াব স্যার সলিমুল্লার পুত্র নওয়াবজাদা খাজা নাসিরুল্লাহ পুলিশ কমিশনারে ভুমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
এছাড়া ঢাকার মঞ্চ নাটকের প্রথম নারী অভিনয় শিল্পী নওবিন বাই, নান্নু বাই এবং আন্নু বাই ও পেশাগত জীবনে বাইজী ছিলেন।
এরা বিভিন্ন সময়ে নানা রকম সমাজ সেবা মূলক কাজেও অংশ নিতেন।
কিন্তু শিল্পের সবটুকু নির্যাস নিয়েও এই বাইজীরা ছিলেন সমাজের দৃষ্টিতে পতিত। তারপরও শতাধিক বছর আগের সমাজ কতৃক পতিতা এই সব নারীদের শিল্পী হয়ে ওঠা, তাদের শিল্পসাধনা, শিল্পসৃষ্টি সত্যিই অভিভূত হবার মতো..............
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ১:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


