ভেবেছিলাম কিছুদিন ডুব দেই, দূরে থাকি ভার্চুয়াল জগৎটা থেকে। কিন্তু এমন একটা বাজে অভ্যাস হয়ে গেছে, অল্প কয়েকদিন পর থেকেই হাতের আঙ্গুল গুলো সব সুরসুর করতে লাগলো কিছু একটা লেখার জন্য
যার ফলাফল এই পোস্ট
যাক বকরবকর বাদ দিয়ে আসল প্রসঙ্গে চলে আসি।
সমুদ্রের টানে কক্সবাজারতো আমরা কতবারই যাই, কিন্তু এই বিশাল সমুদ্রের পাশাপাশি আরও কিছু ঐতিহ্য আমাদের রয়ে গেছে সেখানে যা অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়!
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে আরকান থেকে পালিয়ে এসে পটুয়াখালি, বরগুনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামে প্রায় ২০০ বছর আগে উপনিবেশ স্হাপনকারী রাখাইন ও মগেরা যে বর্মী আরকানী ধরণের বৌদ্ধ বিহার গুলো নির্মাণ করেছিল তার অনেক গুলো এখনও টিকে আছে।
এই সুপ্রাচীন বর্মী আরকানী ঐতিহ্যের অনেক গুলো বিহার আছে কক্সবাজারের খুবই কাছের এলাকা রামুতে। আমরা অনেকেই কক্সবাজার গিয়ে সমুদ্র সৈকতেই কাটিয়ে ফিরে আসি ছুটির দিন গুলো, সেই সময়টাতে ইচ্ছা করলে এক পা দু পা বাড়ালেই কিন্তু দেখে আসতে পারি প্রাচীন এই স্থাপনা গুলো।
রামুর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিহার দেখে নিন আমার চোখে
রামু সীমা বিহার রামুর ফতেখাঁর কুল ইউনিয়নে অবস্থিত। মূল বিহারটা নির্মান করা হয়েছিল প্রায় চারশো বছর আগে, পরে বিভিন্ন প্রতিকুলতার কারণে পরপর তিনবার এই বিহারটার স্থান পরিবর্তন করা হয়, বর্তমান যে বিহারটি দেখতে পাবো আমারা সেটা প্রায় দুশো বছর আগে নির্মিত হয়েছিল।
কাঠ দিয়ে তৈরি এই বিহারটি আরকানী বর্মী রিতীতে বানানো। এখানে পাশাপাশি দুটো বিহার আছে, এটা আপেক্ষাকৃত বড়।
এর পাশের তুলনা মূলক ভাবে ছোট আকারের আরেকটা মন্দির।
আমার কাছে এই বিহারে বৌদ্ধ মুর্তি গুলো সবচেয়ে বেশি আকর্ষনীয় মনে হয়েছে।
শায়ন মুদ্রায় শ্বেতপাথরের বুদ্ধ, বেদীর অলংকরন চোখ কেড়ে নেয়।
ভুমি স্পর্শ মুদ্রায় শ্বেতপাথের বুদ্ধ, চেহারায় চৈনিক ছাপ!
ভুমি স্পর্শ মুদ্রায় দারুন অলংকৃত বুদ্ধ।
এই বুদ্ধ মূর্তি গুলো থাইল্যান্ড থেকে উপহার দেয়া!
পিতলের এই মূর্তিটি প্রায় ৭ ফু: উচু।
এই সব মূর্তিগুলোই বড় বিহারটার ভেতরে এবং যথারিতী বিহারের মধ্যে ছবি তোলা নিষিদ্ধ। এখানেও তাই চুরি বিদ্যা কাজে লাগাতে হলো, নিরুপায় হয়ে
এছাড়াও এখানে বেশ সমৃদ্ধ একটা লাইব্রেরী আছে যেখানে বর্মী হরফে লেখা ত্রিপিঠক ছাড়াও ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনের অনেক বই দেখলাম।
রামু সীমা বিহার থেকে কিছু দুরেই রয়েছে লামা পাড়া বিহার। ইতিহাস বলে চট্টগ্রাম যখন আরকান রাজা আলী খাঁ (১৫৮০-১৬৬৫) শাসনাধীন ছিল তখন আলী খাঁ নিজেই এই বিহারটি নির্মানের আদেশ দিয়েছিলেন। প্রথমে এখানে বর্মী রিতীতে বানানো একটি বিহার ছিলে।
পরে আষ্টদশ শতকের শুরুতে রাখাইন জমিদার দুয়াং বিহারটি সংস্কার করেন আর মূল বিহারের দুই পাশে একইরকম আকৃতিতে আরও দুটি বিহার নির্মাণ করেছিলেন। বিহার গুলো সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি, ছাদের চুড়ো গুলোত অসাধারণ কাঠের কারুকাজ।
মন্দরিরের লম্বা লম্বা পিলার গুলোও কাঠের, কি যে গাছ এগুলো এক একটা পিলার প্রায় ৪০ ফু; লম্বা।
এই বিহারে পাঁচটা খুবই চমৎকার ব্রোঞ্জের মূর্তি আছে, এর মধ্যে একটা ৭ ফুট, অন্য গুলো উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট। এছাড়াও এখানে শ্বেতপাথরের বেশ কয়েকটি ছোট ছোট মূর্তি আছে।
এখানকার অন্যতম একটা আকষর্নীয় দিক হলো বিহারের উঠোনে রাখা একটা বড় পিতলে ঘন্টা! এটাতে প্রাচীন বর্মী লিপিতে কিছু লেখা আছে, যা এখনও পর্যন্ত কেউ পাঠোদ্ধার করতে পারেনি।
লামা পাড়া বিহারের বর্তমান অধ্যক্ষ খুবই চমৎকার মানুষ, উনি নিজেই ঘুরে ঘুরে সব দেখালেন আমাদের, তার মুখে প্রাচীন সেই সব ইতিহাস শুনতে শুনতে, শান্ত নির্জন প্রাচীন বিহারেরই একটা অংশ হয়ে যাচ্ছিলাম।
আসার সময় তিনি আমাদের চকলেট দিলেন, এটাই নাকি রীতি।
এরপরে যাওয়া যেতে পারে রামকোট বা রংকুট বনাশ্রম বিহারে।
রামকোট বা রাংকুট বনাশ্রম বিহারটা এই দুটো বিহার থেকে বেশ খানিকটা দূরে রাজারকুল গ্রামে অবস্থিত। ১৯৩০ সালে জগৎচন্দ্র মহারেঠ নামক একজন তিব্বতী ভিক্ষু শ্রীলংকায় পাওয়া একটা শিলালিপিতে পাওয়া তথ্য ধরে খুজে খুজে এই বিশাল বিহাররের ধ্বংসাবশেষ আর বিশাল একটি পাথরের বুদ্ধ মূর্তি আবিস্কার করেছিলেন। অভয়মুদ্রার এই প্রাচীন মূর্তিটি এখনও বনাশ্রম বিহারে রয়েছে।
এই বিহারটি মোট সতেরটি পাহাড়ের উপরে ছাড়া ছাড়া ভাবে ছড়িয়ে আছে, মুল বিহারটা যে পাহাড়ের উপরে, সেটা অবশ্য ভারতের। ইতিহাস বলে অনেক অনেক কাল আগে সাগর এই পাহাড় শ্রেণীর কাছেই ছিল, হয়তো একারণেই বিহারটা এখানে বানানো হয়েছিল। প্রাপ্ত শিলালিপি অনুসারে এই বিহারের নির্মান কাল দ্বাদশ শতকেরও আগে।
রামকোট বনাশ্রম বিহারের সবচেয়ে বড় মন্দিরটির গঠনশৈলীর সাথে ময়নামতি ও পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারের মিল খুজে পাওয়া যায়।
পুরো বিহার এলাকায় ছড়িয়ে বিভিন্ন সময়ে পুরানো ইটের টুকরো, প্রচুর পরিমানে বেলেপাথেরর
মূর্তির ভাগ্নাংশ আর পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে, ধারণা করা হয় হয়তো বা প্রাচীন বিহারটা পাহাড়পুড়ের মতোই পোড়ামাটির ফলকে অলংকৃত ছিল।
সুতরং প্রাচীন রম্যবতী নগরীর প্রাচীন ঐতিহ্যময় কিছু নিদর্শন দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন কক্সবাজারের রামু থেকে!
যেভাবে যেতে পারেন: কক্সবাজার মূল শহর থেকে রামু যেতে পারেন ওখানকার স্থানীয় বাসেই, যেতে আধা ঘন্টার মতো সময় লাগবে। রামু বাসস্ট্যান্ডে নেমে আমাদের মতোন এমন রিক্সা সহযোগে ঘুরে দেখেতে পারেন পুরো গ্রামটা।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ১২:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


