somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পদ্মপুকুর আর পদ্ম কথা...........

২২ শে জুন, ২০১১ বিকাল ৩:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে !


সুনীলের এই লাইন গুলো এক সময়ে; এমনকি এখনও মাঝে মাঝে আমাকে খুব আলোড়িত করে। তার মতো আমারও দেখতে ইচ্ছে করে কেমন সেই তিন প্রহরের বিল! সত্যি কি সেখানে পদ্ম বন আছে?
পদ্মের বন........কি অদ্ভু্ত সুন্দর। পড়ন্ত নিস্তব্দ দুপুর, নীল আকাশে সাদা সাদা তুলোর মতো মেঘের সামিয়ানার নিচে কাকচক্ষু জলের সেই পদ্ম পুকুর...........পারে ঝিরঝিরে পাতার শিরিষ আর হিজলের বন...........মৃদু বাতাসে দু একটা শিরীষের পাতা বা হিজলের লালচে ফুলের পানিতে ঢলে পড়া.........গাঙ ফড়িং এর চঞ্চল উড়াউড়ি, তার ভেতরে পদ্মপাতায় সাপ আর ভ্রমরের খেলা............কি অপার্থিব সুন্দর।

সত্যি কি এমন আছে?

নিচের ছবিটা দেখুন তো, কি মনে হয়?


একদম পদ্মবন, শ্বেত পদ্ম!


সাদা বা লাল রং শাপলা ভরা দীঘি আর বিল চোখে পড়লেও আমাদের দেশে কিন্তু এমন পদ্ম দিঘী মোটমুটি বিরলই বলা যায়।


দারুন এই দিঘীটা বরিশাল শহরের বেলস পার্ক ও প্লানেট ওয়ার্ল্ড সংলগ্ন, হিমনীড়ে যা বর্তমানে বিআইডাব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী, বরিশাল ডিভিশনের কার্যালয় হিসেবে চালু আছে।


এতো দেখলেন শ্বেতপদ্মের বন, এখন দেখুন গোলাপী পদ্মবন......


এই পদ্মবনের দেখা পাবেন শ্রীমঙ্গলের বাইক্কার বিলে।


বাইক্কার বিল মূলত: অতিথী পাখির অভয়ারন্য হিসাবে বেশি পরিচিত। শীতের দিনে পাখিদের কলকাকলীতে মুখর হয়ে ওঠে বিলটা!
এই বিলটার পদ্ম ফুলের পাশাপাশি লাল শাপলাও ফোটে, যেমনটা দেখা যায় না বরিশালের শ্বেতপদ্মের বনে।


পদ্ম ফুল শুধু সৈন্দর্য্যের দিক থেকেই নয়, প্রাচীন সভ্যতার ধর্ম আর মিথেও এর গুরুত্ব পূর্ণ অবস্থান ছিল। বৌদ্ধ আর হিন্দু ধর্ম অনুযায়ি পদ্ম হলো সৌন্দর্য্য আর বিশুদ্ধতার প্রতীক।


পদ্মকে মাটি, পানি, আগুন আর বাতাসের চতুর্মুখি সন্মেলনের প্রাকৃতিক প্রতীক বলা হয়। কারণ পদ্মের শিকর থাকে পানির নীচে মটিতে, পানির উপরে সে লালিত আর বর্ধিত হয় বাতাসের আর সূর্যের আলোতে সে ফুল ফোটায়। প্রাচীন মিশরীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পদ্ম হলো সূর্য আর পূনর্জন্মের প্রতিক। কারণ হিসাবে বলা হয়, রাতের বেলায় পদ্ম ফুলের পাপড়ি গুলো সব বন্ধ হয়ে যায়, পানির নিচে লুকিয়ে যায় কুড়ি। সূর্যের আলোতে সে আবার প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। সৃষ্টির শুরুতে অসিম শূন্যতায় বিশ্বব্রক্ষান্ড পানিতে পূর্ণ ছিল। একদিন এই পানিতে জন্ম নেয় এক খন্ড মাটির বুকে বিশাল এক পদ্ম ফুল, সেই পদ্মের মাঝ থেকে জেগে উঠে সূর্য। এরপর আস্তে আস্তে পুরো সৃষ্টি জগত তৈরি করে। প্রায় একই ধরনের একই ধরনের মিথ কিন্তু হিন্দু ধর্মেও রয়েছে, সৃষ্টির দেবতা ব্রক্ষ্মা নিজেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বিশাল এক পদ্ম ফুল থেকে।

একটা বিষয় লক্ষনীয় যে হিন্দু আর বৈদ্ধ ধর্মের বেশির ভাগ দেবদেবীর মূর্তিতে কোন না কোন ভাবে পদ্মকে উপস্থান করা হবেই।স্বরস্বতী দেবীর প্রতীক শ্বেত পদ্ম, আপর দিকে লক্ষী, ব্রক্ষ্মা, গনেশ, গৌতম বুদ্ধ এদের প্রতীক গোলাপী পদ্ম!


এছাড়া প্রাচীন মিশরে অনেক চিত্রে নানা ভাবে পদ্ম ফুলকে উপস্থাপন করা হয়েছে।


মজার বিষয় হলো, ১৯২২ সালে টুটেনখামেনর মমি আবিস্কৃত হবার পরে দেখা যায়, তার সারা দেহের উপর নীল শাপলার পাপড়ি ছড়ানো। অনেক পদ্ম ফুলের নির্যাস আর পাপড়ি হ্যালুশিনেসন, স্টিমুলেশন ইত্যাদি চিকিৎসার কাজেও ব্যাবহার করা হতো!

লালা শাপলা আর পদ্ম নিয়ে অনেকেরই মধ্য কিছু কনফিউশন দেখা যায়। দুটোকে মাঝে মাঝেই গুলিয়ে ফেলা হয়। এই ফুল গুলো আলাদা ভাবে চেনার খুব সহজ একটা পদ্ধতি আছে........পদ্মের বীজ পত্রটা ফুলের ভেতরেই বাইরে থেকে দেখা যাবে, আর শাপলা ফুলের বীজপত্র বোঝা যায় না বাইরে থেকে, গর্ভকেশরে ঢাকা থাকে।

এই যে বীজপত্র ওয়ালা পদ্ম


আর এটা হলো শাপলা যার বীজপত্র লুকানো থাকে :)


পদ্ম ফুল হয় সাধারণত সাদা, গোলাপি অথবা হালকা গোলাপি রং এর। হুমায়ুন আহমেদ যতই লিখুন না কেন, "হিমুর হাত সাতটি নীল পদ্ম" আসলে নীল রং এর পদ্ম ফুল নেই। বরং বলা যায় হিমুর হাতে সাতটি নীল শাপলা :P
পদ্ম ফুল ফোটে মার্চ মাস থেকেই আর মার্চের শেষ থেকে মে মাস পর্যন্ত এ দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু বরিশালের পদ্মপুকুরের পদ্ম এখনো দেখতে পাওয়া যায়। বুঝাই যায় যে, আমার নানা বাড়ীর কারনে , বই এর লেখা এখানে অকার্যকর :P

পদ্ম পুকুরের কথা বলতে এসে ধান ভাংতে শিবের গীত গেয়ে ফেললমা। যাই হোক,
এই সুন্দর পদ্মপুকুরটা দেখতে চাইলে আপনাকে দৌড়াতে হবে কীর্তনখোলা নদীর পাশের সুন্দর শহর বরিশাল পর্যন্ত।
আর পাখিদের অভয়ারন্য বাইক্কার বিল দেখতে হলে যেতে হবে শ্রীমঙ্গল।


ছবি সৌজন্য: জিশান শা ইকরাম
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ১২:৩৮
১২৫টি মন্তব্য ১২৬টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×