অনেক অনেক দিন আগে কুসুমপুর নগরে এক অন্ধ লোক আর তার মেয়ে চন্দ্রাবতী বাস করতেন, তিনি কুলে তাদের কেউ ছিল না। গরীব হলেও বাবা আর মেয়েতে বেশ সুখেই দিনাতিপাত করতো। একদিন হলো কি, এক পুকুরের পাশ দিয়ে হাটার সময় অন্ধ লোকটা পুকুরের মধ্যে পরে গভীর পানিতে তলিয়ে গেলো। যেতে যেতে একদম গভীরে, তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, চোখের সামনে হলুদ হলুদ আলোর ফুটকি....বুড়ো ভাবলো আমি বোধ হয় মরেই গেলাম। আহারে আমার মেয়েটার কি হবে! এমন সময়ে হঠাৎ তার কানের কাছে একটা দৈববানী শুনতে পেলো ''শোন বুড়ো তুমি যদি গায়ের শেষ মাথার বিষ্ণু মন্দিরে ৩০০ বস্তা ধান উৎসর্গ করার প্রতিঞ করো তাহলে এখন আমি তোমাকে প্রাণে বাচাঁবো, আর তোমার দৃষ্টি শক্তিও ফেরত পাবে"।
এক কথা শুনে আর যায় কোথায়, বুড়ো সাথে সাথে রাজি। সেই দেবপুরুষ তখন তাকে পানির উপরে উঠিয়ে আনলো, আর বুড়ো তার সদ্য জীবন প্রাপ্তি আর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবার সম্ভাবনায় খুশি হয়ে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরলো।
বাবার ভিজে চুপচুপে অবস্থা দেখে মেয়ে শুধায় কি হয়েছে বাবা তোমার? তখন বুড়ো খুশিতে আটখানা হয়ে সব খুলে বললো তাকে। সব শুনে মেয়ে একটু হতাশ হয়ে বললো, বাবা আমাদের তো টাকা নেই, জমিও নেই, ৩০০ বস্তা চাল কোথায় পাবো। তাইতো'...... বুড়োও মুশরে পরলো এই ভেবে।
বাবার মন খারাপ দেখে চন্দ্রাবতীরও খুব খারাপ লাগলো। সে বললো বাবা তুমি ভেবো না, দেখি আমি কোন ব্যবস্থা করতে পারি কিনা।
এই ভেবে সে বেড়িয়ে পড়লো, হাটতে হাটতে চলে গেলো গ্রামের মহাজনের কাছে। গিয়ে বললো, মহাজন মশায় আমি নিজেকে সাগরের নাগরাজের কাছে উৎসর্গ করতে চাই, বিনিময়ে আপনি আমার বাবার নামে বিষ্ণু মন্দিরে ৩০০ বস্তা চাল ভেট দিবেন।
এদিকে হয়েছে কি সেই নগরের পাশে সাগরে মধ্যে বাস করতো সাপেদের রাজা, সে অনেকদিন থেকেই মহাজনের কাছে দাবি করছিল তার মেয়েদের মধ্যে থেকে একজনকে তার সাথে বিয়ে দিতে হবে! মহাজন রাজি হচ্ছিল না সেই প্রস্তাবে, তাই সেই নাগরাজ সব সময়েই সাগরে ঝড়ো হাওয়া আর প্রবল স্রোত তৈরি করে রাখত, আর দূর দূরান্ত নগরের সব বানিজ্য তরী ডুবে যেত তাতে, বাইরে থেকেও কোন জাহাজ আসতে পারতো না এখানে।
তাই চন্দ্রাবতীর কাছ থেকে এমন অভাবিত প্রস্তাব পেয়ে তো মহাজনের তো পোয়াবারো! চন্দ্রাবতী ছিল খুব সুন্দরী, তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠালে নাগরাজ কোন সন্দেহই করবে না, আর তার মেয়েরাও বেঁচে যাবে, ব্যাবসা বানিজ্যেও সুবিধা হবে। সুতরং রাজি হয়ে গেলো মহাজন চন্দ্রাবতীর প্রস্তাবে। সেই দিনই বিষ্ণু মন্দিরে চন্দ্রাবতীর বাবার নামে ৩০০ বস্তা ধান পাঠানো হলো, আর চন্দ্রাবতী অপরূপা সাজে সেজে ঝাপ দিল সাগরে!
চন্দ্রাবতী ঢুবে যেতে............... যেতে................. যেতে.............. যেতে........... যেতে..........সাগরের তলদেশে যেয়ে অবাক হয়ে দেখে সেখানে নাগরাজার সুরম্য অট্টালিকা ! নাগরাজাও তাকে দেখে মহা খুশি, ধুমধামের সাথে তাদের বিয়ে হয়ে গেলো। নাগরাজার প্রাসাদে চন্দ্রাবতী আদরে দিন কাটাতে লাগলো।
ওদিকে হয়েছে কি, বিষ্ণু দেবতার মন্দিরে ভেট দিয়েও কিন্তু চন্দ্রাবতীর বুড়ো অন্ধ বাবার চোখ ভাল হলো না। সে চোখের দু:খের আর মেয়ের দূর্ভাগ্যের জন্য নিজেকেই দোষী ভাবতে লাগলো, খুব কষ্ট তার দিন কাটছিল।
এই খবর চন্দ্রাবতীও একদিন নাগরাজের অনুচর ঢোরা সাপের মাধ্যমে জানতে পেলো। সে প্রায়ই মন খারপ করে তাই বসে বসে কাঁদে। এটা দেখে একদিন নাগরাজা বললো, কিসের এত দু:খ তোমার রানী?
চন্দ্রাবতী বলে, যদি আমি আমার বাবাকে একবার দেখতে পেতাম! নাগরাজা তার স্ত্রীকে খুব ভালবাসতো, তার দু:খে সেও কষ্ট পেলো, বল্ললো " চন্দ্রাবতী আমি তোমাকে তোমার বাবার কাছে যেতে দেবো, কিন্তু এতদিনে তো সবাই ধরে নিয়েছে তুমি মারা গেছো। তুমি যদি মানুষ বেশেই যাও তাহলে তোমাকে দেখে সবাই ভয় পেতে পারে, তাই আমি তোমাকে এমন একটা রূপ দেবো যাতে কেউ তোমাকে চিনতে না পারে।" এই বলে তাকে লাল শাপলা ফুল বানিয়ে দিল। ভোরের প্রথম আলোয় অপরূপ শাপলা হয়ে চন্দ্রাবতী সাগরের পানিতে ভাসতে লাগলো।
এদিকে হয়েছি কি, সেই দেশের রাজা আবার ফুল খুব ভালবাসতেন। রাজার লোকেরা পানিতে নতুন ধরনের একটা ফুল দেখে সেটা রাজার জন্য তুলে নিয়ে রাজার বাড়ির পুকুরে লাগিয়ে দিল। রাজা মশাই তো সেই শাপলার রূপে মুগ্ধ! একদিন রাতে রাজার ঘুম আসছিল না, সে জানালার কাছে দাড়িয়ে আছে, এমন সময় দেখে পুকুরের পারে অপরূপা এক মেয়ে দাড়িয়ে।
রাজা বলেন, কে তুমি মেয়ে, এখানে কি করছো?
চন্দ্রবতী ঘুরে দেখে রাজা দাড়িয়ে আছেন, সে বলল্লো, আমি আপনার পুকুরের শাপলা ফুল, যাকে আপনি অনেক ভালবাসেন। আমার আসল নাম চন্দ্রাবতী।
রাজা বলেন, চন্দ্রাবতী তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
রাজি আছি, তবে একটা শর্ত আছে'......বললো চন্দ্রাবতী। আপনার নগরের সকল অন্ধ লোককে দাওয়াত করে খাওয়াতে হবে একদিন।
রাজা ভাবলনে এত খুবই সহজ কাজ, সে সানন্দে রাজি হয়ে গেলো চন্দ্রবতীর কথায়, এরপর মহাধুম ধামে বিয়ে হয়ে গেলো।
তারপরে রাজ্যের সকল অন্ধ লোকেদের দাওয়াত দেয়া হলো, রানী নিজে তাদের খাওয়াবেন।
এরপর সেই খাবার মজলিস থেকে চন্দ্রাবতী তার অসুস্থ, জীর্ন বাবাকে খুজে বারকরে তাকে জড়িয়ে ধরে বাবা' বলে কেঁদে ফেললো। আর কি আশ্চর্য চন্দ্রবতীর অশ্রু বাবার গায়ে গড়িয়ে পরা মাত্রই বৃদ্ধের দৃষ্টি শক্তি ফিরে আসলো, অশ্রুসজল চোখে সে দেখলো তার মেয়ে শাপলাকে..........
এরপর থেকে সমুদ্রও শান্ত হয়ে গেলো, মৃদু স্রোত বইতে লাগলো আর কুসুমপুর নগরের সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো
এই হলো শাপলা কুমারীর গল্প। ফুল হিসাবে শাপলা আমারও খুব পছন্দের। আমাদের ভার্সিটিতে দুটো লেক ভর্তি ছিল লাল শাপলায়। সকাল বেলা পুরো লেকটা ঝলমল করতো যেন......নৈসর্গিক লাগতো দেখতে। এই লেকটা আমি যে হলে থাকতাম সেই জাহানারা ইমাম হলের পিছন দিকের লেকের ছবি!
আগে ভাবতাম শাপলা শুধু মনে হয় লাল আর সাদাই হয়, কিন্তু সেদিন নেটে ঘুরে ঘুরে অবাক, এত ভ্যারাইটি জানা ছিল না আমার।
এর নাম ব্ল্যাক প্রিন্স। ফুলের ভেতরটা একদম কালচে লাল।
এই সেই বিখ্যাত নীল পদ্ম, আসেল কিন্তু এটা শাপলা প্রজাতির (বিস্তারিত আগের পোস্টে লিখেছিলাম )
পিচ গ্লো শাপলা।
এর নাম পিগমী ওয়াটার লিলি, বাংলায় বামন শাপলা
স্টার ওয়াটার লিলি, আমাদের জাতীয় ফুল শাপলাটা এই প্রজাতির।
শাপলার ডাটা সব্জি হিসাবেও চমৎকার। এখনই পাওয়া যাবে বাজারে শাপলা ডাটা। একটা রেসিপি দিলাম ফাও হিসাবে....
শাপলা চিংড়ি: এটা করতে যা যা লাগবে, শাপলা ডাটা এক ইঞ্জি লম্বা করে আশা ছাড়িয়ে কেটে নিন দুই কাপ। মাঝারি সাইজের চিংড়ি ১ কাপ। মসলা লাগবে পেয়াজ কুচি, রসুন বাটা, হলুদ, জিরা, ধনে গুড়ো আর কাচা মরিচ।
প্রথমে ডাটা গুলো ধুয়ে হালকা ভাপ দিয়ে পানি ফেলে দিন, খেয়াল রাখতে হবে বেশু ভাপ যেন না হয়, তাহলে ডাটা গুলো গলে যাবে। এরপর কড়াইতে তেল ও বাকি সব মসলা ও অল্প পানি দিয়ে কষিয়ে চিংড়ি গুলো দিয়ে ভেজে নিন। চিংড়ি মোটামুটি সিদ্ধ হয়ে আসলে শাপলা ডাটা আর তেজপাতা দেবেন। আলাদা পানি দেবার দরকার নেই কারণ শাপলার ডাটা থেকে অনেক পানি বের হবে। ভাজা ভাজা করে নামিয়ে নিন।
এটা চিংড়িং বাদে নারকেলের দুধ দিয়েও রান্না করতে পারেন।
শাপলা ফুলের কন্দের অংশ যেটাকে শালুক বলে, সেটাও কিন্তু খাওয়া যায় পুড়িয়ে বা সিদ্ধ করে। এটা আর কদিন পরে পাওয়া যাবে।
আরেকটা খাবার হয় এটা থেকে, ঢ্যাপ। ঢ্যাপের খই বানানো হয় শাপলা ফুলের বীজ থেকে।
এগুলো হলো ঢ্যাপ, এটা ভেজে মুড়ির মতো একটা খাবার বানায়, যেটাকে ঢ্যাপের খই বলে (ছবি গুলো মহলদার ভাইয়ের পোস্ট থেকে নেয়া)।
যাই হোক রূপকথার গল্পের সাথে যে ফাও ফাও যে এত গুলো খানা খাদ্যের রেসিপি দিলাম সেই জন্য আমাকে স্পেশাল থ্যাংক দিবেন কইলাম
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ১২:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


