উত্তরকথন....৪-০২-১২:
বেশির ভাগ দিন সন্ধ্যায় বেশ মন খারাপ হয়ে যায়, সন্ধ্যার গোধুলী সময়টা খুব রহস্যময়! বিষন্ন সময়টা তারাতারি পার করবার জন্য বসে বসে পড়ছিলাম বিষ্ণুশার্মার পঞ্চতন্ত্র বইটা।
পঞ্চতন্ত্রের বিভিন্ন গল্প নিশ্চয়ই সবাই জানেন?
অনেক বছর আগে দাক্ষিনাত্যের মহিলারোপ্য নামে একটি নগর ছিল, সেই রাজ্যের রাজার নাম অমরশক্তি! রাজার ছিল তিন পুত্র-বসুশক্তি, উগ্রশক্তি এবং অনেকশক্তি! তিন জনই ছিলেন মহামূর্খ। এদের নিয়ে রাজার চিন্তার শেষ নেই!
কারণ রাজা জানতেন, গর্ভনষ্ট বা মৃতপুত্র হওয়া ভাল এতে দু:খ পাওয়া যায় একবার, কিন্তু মূর্খপুত্ররা দু:খদেয় বার বার।
তাই তিনি তার মন্ত্রীদের ঢেকে বললেন এদের যাথশীঘ্র সম্ভব এদের 'সর্বশাস্ত্রে শিক্ষিত করে তুলতে হবে:"।
তখন সুমতী নামের এক মন্ত্রী বললেন, বিষ্ণুশর্মা নামের একজন পন্ডিত আছেন, শুধু মাত্র তার পক্ষেই অল্প সময়ে কুমারদের শিক্ষিত করে তোমা যাবে!
রাজাদেশে তখন বিষ্ণুশর্মাকে ডাকা হলো। রাজা বললেন, যত ধন চাও পন্ডিত সব আমি দেবো, তার বিনিময়ে আমার ছেলেদের শিক্ষিত করে তোল!
উত্তরে বিষ্ণুশর্মা জানালেন, তিনি বিদ্যা বিক্রী করেন না, তার কর্তব্য অনুযায়ীই তিনি রাজকুমাদের সর্বশাস্ত্র বিশারদ করে তুলবেন। তখন রাজা খুশিমনে রাজপুত্রদের তুলে দিলেন তার হাতে।
তখন বিষ্ণুশর্মা সবশাস্ত্রের সারাংশ নিয়ে একটা বই রচনা করলেন, এই বইটিই হলো পঞ্চতন্ত্র! গল্পের মাধ্যমে সহজ সরল ভাষায় রাজনীতি, অর্থনীতি, মনস্তত্ব, ন্যায়-অন্যায়, আচার আচরন ইত্যাদি বিষয় তিনি তুলে ধরেন।
বইটা পাঁচটি তন্ত্র বা বড় গল্পে বিভক্ত বলে এর নাম হয়েছিল পঞ্চতন্ত্র! তন্ত্র পাঁচটির নাম মিত্রভেদ(বন্ধু-বিচ্ছেদ), মিত্রলাভ (বন্ধুলাভ), কাকোলীয় (চিরশত্রুতা), লব্ধপ্রণাশ (পেয়ে হারানো) ও অপরীক্ষিতকারক (না ভেবে কাজ করা)। মোট ৭৪টি গল্প ছিল!
বিষ্ণুশর্মা তার গল্পের চরিত্র হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন অতিপরিচিত সব পশু-পাখির,,এদের প্রতীকে তুলে ধরেছিলেন মানুষ চরিত্রকে।
যেমন- মিত্রলাভ গল্পের মূল চরিত্র ছিল কবুতর, কাক, ইঁদুর, কচ্ছপ ও হরিন! একদিন কবুতরকে শিকারীর পেতে রাখা জাল সহ উড়ে যেতে দেখে মুগ্ধ হয়ে কাক তার বন্ধু হয়। আরেকদিন হরিণ শিকারীর জালে আটকা পরলে ইদুর তাকে জাল কেটে বের করে আনে। এভাবে সবাই একে অপরের বন্ধু হয়!
আবার লব্ধনাশ মুল গল্পে একটা কুমীর আর একটা বানরের গভীর বন্ধুত্বের কথা আমরা দেখি। বানর প্রতিদিন কুমিরকে গাছের জাম পেরে খাওয়াতো, সাথে সাথে বন্ধুপত্নী কুমিরনিকেও পাঠাতো। একদিন কুমীরনি আবদার ধরলো বানের কলিজা খাবে, তাই কুমির তাকে বন্ধুত্বের কথা ভুলে গিয়ে ছলাকলা করে ধরে নিয়ে যায়। পরে বানর নিজের বুদ্ধির জোড়ে বেচে গেলেও, কুমিরের সাথে বন্ধু্ত্ব নষ্ট হয়ে যায়!
এভাবে মানুষের সুপ্রবৃত্তি-কুপ্রবৃত্তি, মূর্খতা-বিচক্ষনতা সব কিছুই ফুটে উঠেছে এক একটা গল্পে!
আচ্ছা দেখুন তো মনে আচ্ছে এই ছড়াটার কথা?
হুক্কা হুয়া কেয়া মজা
বনের রাজা কুপোকাত
কুয়োর মধ্যে দেখে ছায়া
লম্ফ দিয়ে প্রাণপাত!
সেই যে বুদ্ধিমান খরগোশ তার বুদ্ধীর জোড়ে তার চাইতে দ্বীগুন শক্তির বাঘকে কুয়োতে ফেলে জব্দ করেছিল! এই গল্পে গায়ের জোড়ের চাইতে যে বুদ্ধির জোড় বেশি তাই বোঝানো হয়েছে।
কিংবা সেই ব্রাক্ষনের কথা। যে একটা বেজীকে তার শিশু পুত্র পাহাড়ায় রেখে গিয়ে গিয়েছিল পুজো করতে। ফিরে এসে দেখে বেজীর মুখে রক্ত, সে ভাবলো বেজি বুঝি তার বাচ্চাটকে খেয়ে ফেলেছে! সেই ভেবে লাঠির ঘায়ে বেজিটাকে মেরে ফেলে ঘরে ঢুকে দেখে তার সন্তান নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছে, পাশে বিশাল এক মৃত সাপ ছিন্ন ভিন্ন। অর্থাৎ বেজী নিজের জীবন দিয়ে বাচিয়েছিল বাচ্চাটাকে। ব্রাক্ষন তখন নিজের ভিল বুঝতে পারে। এই গল্পের নাম ব্রাক্ষন-নকুল-সর্প কথা (এই নামে কিন্ত বাঘধারাও আছে)! হটকারিতার পরিনাম বোঝাতেই এই গল্প!
এভাবে প্রতিরি গল্পের মাধ্যমে বিষ্ণশর্মা মানুষের মনস্তত্বকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। একই ঢংকের গল্প বলার নিদর্শন দেখতে পাই আমরা গ্রীক লেখক ঈশপের গল্পেও। ঈশপের গল্পের সময়কাল ছিল খ্রী: পূ ৬২০-৫৬০। আর বিষ্ণশর্মার খ্রী: পূ তৃতীয় শতক। তবে কি বিষ্ণুশর্মা কোন ভাবে ঈশপ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন?
যাই হোক, বিষ্ণুশর্মার এই পঞ্চতন্ত্র ছিল সংস্কৃত ভাষায় রচিত। কালে কালে উপমহাদেশের সব গুলো ভাষায়, সিরীয়, মিশরীয়, আরবি, গ্রীক, ইতালিয়, জার্মানি, ল্যাটিন, পাভ, ফরাসি, ইংরেজি, স্পেনীয় ও হিব্রু ভাষায় এই গল্প গুলো অনুদিত হয়েছিল। এর অনুকরনেই পরবর্তি কালে আরও কিছু বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ রচিত হয়, যেমন-কথাসটিৎসাগর, হিতোপদেশ, দ্বাত্রিংশৎপুত্তলিকা, বেতালপঞ্চবিংশতি ইত্যাদি!
অনেক বিশেষগের মতে, প্রভাবের ব্যাপকতায় বাইবেলের পরেই পঞ্চতন্ত্রের স্থান (উলফ)!
আধুনিক বাংলায় যদি পঞ্চতন্ত্র পড়তে চান, তাহলে অতিস্বত্বর যোগাযোগ করুন বাংলা একাডেমীতে। লেখক দুলাল ভৌমিক বইটির চমৎকার অনুবাদ করেছেন সাবলিল ভাষায়।
এবার তাহলে দেখে নেই গতকালের সেই দাঁত ভাঙা নাম গুলোর বাংলা প্রতিশব্দ ...........
১। দমনক = শেয়াল
২। সঞ্জীবক = ষাড়
৩। পিঙ্গলক = সিংহ
৪। চিত্রগ্রীব = কবুতর
৫। লঘুপতনক= কাক
৬। হিরণ্যক = ইদুর
৭। মন্থরক = কচ্ছপ
৮। চিত্রঙ্গ = হরিণ
৯। অরিমর্দন = পেঁচা
১০। মেঘবর্ণ = কাক
এবার মিলিয়ে নিন আপনার অনুমানের সাথে।
বি:দ্র: আমার ল্যাপির চার্জ শেষ, তাই পুরস্কার বিতরনী আগামীকাল সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হইবে
প্রাক কথন ৩-০২-১২:
কিছু বাংলা শব্দের অর্থ করুন তো, দেখি কে কয়টা পারে........
১.অরিমর্দন =?
২.দমনক =?
৩.পিঙ্গলক=?
৪. সঞ্জীবক =?
৫. চিত্রগ্রীব =?
৬. লঘুপতনক=?
৭. হিরণ্যক =?
৮. মন্থরক=?
৯.চিত্রাঙ্গ =?
১০. মেঘবর্ণ =?
হিন্টস: সব গুলো আমাদের খুব পরিচিত পশু পাখির নাম!
বিশেষ ঘোষনা: সঠিক উত্তরদাতা কে প্রথমে যে উঁকি দেয়া জলহস্তির দূর্লভ ছবিটা দেয়া হয়েছে সেটা সকল স্বত্ব ত্যাগ করে দিয়ে দেয়া হবে
আর যারা সঠিক উত্তর জেনেও আমি জেনে যাব এই ভয়ে উত্তর দিতে চাইবেন না, তাদের দুটা জলহস্তি দিয়ে দেয়া হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০১২ বিকাল ৫:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



