একধরনের অনিশ্চিয়তা (এক্ষেত্রে হাইজেনবার্গের principle of uncertainity'র কথাও বলা যায় ) কিংবা আরো ব্যাপক অর্থে মহাকালের অব্যক্ত অনুভূতিগুলোই গত শতকের শেষের দশকগুলোতে এবং এই শতকের প্রথমদিকের বাংলা কবিতায় চিন্তার সম্ভাবনাকে আরো বেশী মাত্রায় জাগিয়ে তুলেছে। প্রকৃতিতে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার সবটাই কি আমাদের ভাবসত্ত্বায় তার সুপরিকল্পিত চিত্রকল্পে আবির্ভূত হয়? কিছু প্রতিফলিত স্বপ্ন সবসময় তাড়িয়ে ফেরে অন্ধকার থেকে আলোতে আর আলো থেকে অন্ধকারে। নিগৃহিত ভালোবাসার মিথ্যা জালে প্রতিনিয়ত আমরা আটকে যাচ্ছি; অথচ সেই গোপন সত্যটি স্বীকার করতে কি ছলনারই আশ্রয় নিতে হয় আমাদের। এমনও তো হতে পারে-
'স্রোত হলো চলমান জলে আটকে থাকা পৃথিবীর রোদ' / মুয়ীজ মাহফুজ
'স্রোত' আর 'চলমান জল' দুইটিই তাদের স্ব স্ব জায়গায় এক একটি গতিশীল সত্ত্বা। কিন্তু চিন্তার প্রখরতায় তারা আটকে গেছে একটি স্থির প্রতিবিম্বে- পৃথিবীর রোদ্রে। একজন কবি কখনোই সভ্যতার আদর্শকে লালন করেনা, তার একমাত্র কাজ আত্মার ঘনীভূত স্পন্দকে প্রতিনিয়ত সংজ্ঞায়িত করা। চেতনার বহুবর্ণিল কোলাজে স্থির সময়ের হতাশা উঠে আসে দ্বিমাত্রিক অনুভূতি নিয়ে। দ্বিমাত্রিক অনুভূতি এইজন্য বললাম যে আমরা তো আর কল্পনা আর বাস্তবতা কিংবা অতীত আর ভবিষ্যতের বাইরে এখন পর্যন্ত তেমন কিছু ভাবতে পারিনি। তবে ভাবা যাবেনা এমনটা বলা যায় না। কারন আমি মনে করি মানুষ যা ভাবতে পারে আর যা পারেনা, তার সবই ঐ মানুষের ভিতরেই আছে। এমনই সম্ভাবনাময় মানুষের স্বপ্নগুলো। 'to be or not to be that is the question'.
বর্তমান সময়ের কবিতা নিয়ে প্রায় সবার ভিতরেই একধরনের নেগলিজিবল মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। এর অবশ্য যুক্তিসংগত কারনও আছে- পুঁজিবাদী শিক্ষাব্যবস্থার চরম বিকলাঙ্গ মানুষিকতাই এই কারনগুলোর অন্যতম। যেখানে তোমাকে দেহের সৌন্দর্য আর অলসতায় প্রতিনিয়ত মুড়ে রাখা হচ্ছে সেখানে চেতনার সৌন্দর্য খোঁজার সময় কোথায়। সংস্কৃতির বিকৃত অপব্যবহারে এখন হারিয়ে যেতে বসেছে প্রেমিকার চিবুকে লেগে থাকা ঘাসফুলের গন্ধ। এই বিশ্বায়নের যুগে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা মিথস্ক্রিয়া আশা করা অমুলক নয়। কিন্তু নিজের জন্মপরিচয় ভুলে গিয়ে যদি এমনটি ঘটে তাহলে তার পরিণাম কি হতে পারে এর ভার আমি পাঠকদের চেতনার উপর ছেড়ে দিতে চাই।
যা স্বপ্ন বা কল্পনা তাই ভবিষ্যৎ। আর বাস্তবতা বা রিয়েলিটিকেই অতীত স্মৃতির আড়ালে ইতিহাস নামের পোশাক পরানো হয়েছে। অবশ্য ইতিহাসের পাতা সততই অমসৃণ। ইতিহাস আর স্বপ্নের এই অব্যাখ্যাত(unexplained) দ্বন্দ্বেই আমরা ছিড়ে যাচ্ছি অথবা বলা যায় পিষ্ট হচ্ছি প্রতিনিয়ত। কি হাস্যকরভাবেই আমরা নিজেদেরকে বর্তমান থেকে আলাদা করে ফেললাম। যেখানে আমরা নিজেরাই বর্তমানের এক চলমান প্রতিবিম্ব। সময়ের আবিষ্কার মানুষের জন্য একটা ব্যর্থতাই বলবো। যদিও আমি জানিনা এর বাইরে মানুষ আর কিইবা ভাবতে পারি। আমার মনে হয় সময়কে আরো ছোট করে কাটলেও বেঁচে থাকার আনন্দকে এতটুকু বদলানো যাবেনা। ভাবা যায় মৃত্যুর মত হতাশাও আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে। আগুন আমাদেরকে পোড়ায় কিন্তু সে নিজে কতটুকু পোড়ে বা আদৌ পোড়ে কী না তা কি আমরা জানতে পেরেছি!
নিলস বোরঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বৈচিত্র্য কখনো ব্যাখ্যা করা যায় না। সে শুধুই সম্ভাবনার ছড়াছড়ি। একটা কণা কোনো মূহুর্তেই কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে নেই, রয়েছে শুধু ঐ বিন্দুতে তার থাকার সম্ভাবনা। কণাদের রাজত্বে নির্দিষ্টের বদলে সম্ভাবনা। কে তার ব্যাখ্যা দেবে? কে তার ব্যাখ্যায় যাবে?
আইনস্টাইনঃ ঈশ্বর এরকম পাশা খেলেন না। খেলতেও চান না কখনো।
নিলস বোরঃ ঈশ্বর কি করবেন না করবেন তা আপনাকে বলতে হবেনা।
ফাইনম্যানঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্স কেউই বোঝেনা- কেন যে ও এরকম, তা জানতে চেওনা। অতলে তলিয়ে যাবে। যদি পারো, তাহলে প্রশ্ন করা থেকে বিরত হও, বিরত থাকো।
হুইলারঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনেককিছুর ব্যাখ্যা করে দেয়, কিন্তু ওর নিজের কোনো ব্যাখ্যা নেই। ও মিস্টিরিয়াস, শুধুই মিস্টিরিয়াস...
লেখকঃ আসুন আমরা ঐ কণাদের সম্ভাবনার রাজ্যে নিজেদের অস্তিত্ব অবলোকন করি। প্রকৃতপক্ষে বলতে হয়- 'know thyself'। কেননা আমরা যদি জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি দশ হাজার মানুষের সাথে মিশি; তাহলে আমরা কি ঐ মানুষগুলোকে চিনলাম না কী নিজেকে আবিষ্কার করলাম আরো বেশী বিমর্ষ বিশ্বাসে? এই প্রশ্নটি পাঠক আপনাদের জন্য তুলে রাখলাম।
এখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাথে সাথেই কবিতার সম্ভাবনাগুলো একটু মিলিয়ে দেখুন। যদিও কবিতা শিল্পের সমস্ত অস্তিত্বে নিজেকে বিনির্মাণ করেও শেষপর্যন্ত কবিতাই থেকে যায়...
'কবিতা তো মক্তবের মেয়ে, চুল খোলা আয়েশা আক্তার'/ আল মাহমুদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

