জন্ম ৮৫ তে হলেও ৯০ এর গণঅভুত্থানের কিছুটা টিয়ার গ্যাস আমিও খেয়েছি। এর পর যখন বিএনপিকে নামিয়ে আনা হল তখনকার প্রেসকাবের গণআন্দোলন নিজ চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে আমার লিখাটা এগুলো নিয়ে নয়।
আমার দেখা প্রথম নির্বাচন ১৯৯৬ সালের নির্বাচন। এর পর আরো দুটো নির্বাচিত সরকার দেখার সৌভাগ্য হল। তাছাড়া মাঝের দুই বছরের তত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালের সেই দু:সহ স্মৃতি এখনো তাজা হয়ে আছে।
আমার লিখাটা তিন পর্বে হবে। ১ পর্বে থাকবে ১৯৯৬ সালের আওয়ামিলিগ সরকারের কাহিনী। ২য় পর্বে চারদলের ইতিহাস। আর শেষ পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে থাকবে বর্তমান সরকারের বর্তমান।
এখানে উল্লেখ করা বেশিরভাগই কথাই আমার অভিজ্ঞতা।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের ব্যাপক প্রচারণা চলছে। আমরা ছোটরা বেশ মজায় আছি। কখনো লীগের মিছিল কখনো বিএনপির মিছিল। নেতাদের সাথে হাত মিলানো। মাঝে মাঝে নেতাদের সাথের পাতিনেতাদের কাছ থেকে ৫ ১০ টাকা পাওয়া। কিংবা গণভোজ। সব মিলিয়ে আমাদের কাছে নির্বাচন বলতে এই।
দেখছিলাম আর প্রতিটি মিছিলের সাথে আমরাও স্লোগান ধরছিলা। “আমার ভাই তোমার ভাই অমুক ভাই অমুক ভাই” ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন আমরা ঢাকা কেন্টনমেন্টে থাকি। নির্বাচন যথারীতি শেষ হল। নির্বাচনের কারচুপি হয়েছে কি হয়নি তার দিকে গেলাম না। কারণ আমি সরাসরি কিছু দেখিনি। তবে আমার বোন এক কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিল। আদর্শ বিদ্যানিকেতন থেকে তাদের ভোটারদের সহযোগীতা করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। রাতে আপার কাছে শুনেছিলাম এক মহিলা লীগে ভোট দেয়নি দেখে এক লীগ নেত্রি দরজার ফাকে বৃদ্ধাঙ্গুল রেখে তার আঙ্গুল কেটে দিয়েছে। পুলিশ তাকিয়ে দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলো। এই লিখার সময় আমি আমার বোনের কাছে নেত্রির নাম জানতে চেয়েছিলাম। কারণ আমি তার নাম ভুলে গেছি। কিন্তু আমার বোনও তার নাম মনে রাখতে পারেনি।
নির্বাচন শেষ। আমরা ঢাকা কেন্টনমেন্ট ছেড়ে আজিমপুর চলে আসলাম। পুরোনো ঢাকা তাই একেবাড়েই আলাদা।
এখানেই শুরু হল আমার আসল জীবন।
এখনে এসে সবচাইতে অবাক হলাম মাদক আর অস্ত্র এর সমাহার দেখে। ধারালো কিংবা আগ্নেআস্ত্র। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম। আমাদের কোয়াটারটা মাদক সেবীদের আড্ডাখানা ছিল। আর অস্ত্র ব্যাবসায়ীদের স্বর্গ। আমার সাথে বেশকয়েকজন বড় ভাইয়ের পরিচয় হল। তাদের অনেকেই আমাকে অস্ত্র ধরতে বলেছিল। আমার কব্জি ছোটবেলাথেকেই বড় ছিলে বলে তাদের কাছে মনে হয়েছে আমি খুব ভাল অস্ত্র চালাতে পারবো। তাই তারা আমাকে উৎসাহ দিত একটা অস্ত্র নিয়ে রাখতে। আমি কখনোই তাদের কথায় সায় দেয়নি।
মাদক এখানে দিনে কিংবা রাতে কখনোই থেমে থাকতো না। আজিমপুর পুরাতন এবং নতুন কবরস্থানতো ছিলা তাদের আসরের জায়গা। আবার আমাদের কোয়াটার ও তার চিপা চাপি তো ছিল তাদের ঘরবাড়ির মত। আমাদের বিল্ডিংয়ের নিচে এত পরিমান গাঞ্জা সেবন করতো তার ধোয়ায় আমারা তিনতালায় থেকেও বমি করা শুরু করতাম। শুধু গাঞ্জা নয়, হিরোইন, ফেন্সিডিল, সিরিঞ্জ, টেবলেট, কোকেন, ইত্যাদি কি, কেন কিভাবে খেতে হয়, তাদের কোনটার দাম কত তা আমি ফাইবে থাকতেই শিখে ফেলি। এমনো হয়েছে আমি যখন তারাবির নামাজ পড়ে আসছি তখন একজন আমাকে বলছে ভাই একটু হাতটা জোরে টিপে ধরতো। রগ পাচ্ছিনা যে সিরিঞ্জটা ঢোকাবো। আমি উপায় না থেকে তার হাত টিপে ধরলাম। দেখি হাতের রগগুলোতে দশবারোটা ফুটো। একের পড় এক সুই ঢুকিয়েছে। আমি ধরার পড়ও কয়েকবার চেষ্টা করতে হল। আমি অবাক হলাম। তার বেথা লাগছেনা দেখে। যাক শেষ পর্যন্ত সে সফল হলে আমি আমার বাড়ি ফিরে আসতে পেরেছিলাম।
এলাকাটা ছিল চোরের চরনভূমি। হাস মুরগী, রোদে দেওয়া কাপড়, বালিশ, স্কুলের বই এমনকি ঘরের দরজার সমানে থেকে সাইকেল, ঘরের ভিতর থেকে টিভি পর্যন্ত চুরি হয়েছে। আমার বন্ধুর নতুন কেনা সাইকেলটা যখন আমার বাসাার সামনে থেকে চুরি গেল তখন এত খারাপ লেগেছিলো যে ভাষায় প্রকাশ করার মত না। আমাদের কোয়াটারে টেম্পু, টেক্সি চুরি করে লুকিয়ে রাখা হত। পরে এগুলো বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নেওয়া হত। টাক ভাগাভাগি করতে গিয়ে কতবারযে মারা মারি হয়েছে তার হিসেব নেই। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন কারণে মারামরি হত। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও এই সংঘাতে অংশগ্রহণ করতো। অনেক ১২-১৫ বছরের ছেলেরা ২০-২৫ বছরের ছেলেদের এই কারণে মেরেছিলো যে তারা তাদের বড় ভাই হিসবে শ্রদ্ধা করেনি। বুঝা যাচ্ছে? আমি যখন ৮এ পড়ি তখন কয়েকবার ৪-৫ এর ছেলেরা ধরেছিল তাদের বড় ভাই করে বলতে হবে।
কুরবানির সময় আমরা সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কারন কুরবানীর চামড়া নিয়ে চলতো মারাÍক সংঘাত। কুরবানীর চামড়া কেনার জন্য একেকটা দল আগ্নেআস্ত্র নিয়ে মাঠে নামতো। দাম চাইতো যা মূল্য তার চাইতে অনেক কম। যার ফলে কথাকাটাকাটি হত। তারা অস্ত্র দেখিয়ে সব কিছু ঠিক করে নিতো। আমার বাবাকে একবাড় অস্ত্র ধরেছিলো। বুকের মাঝে ধরা সেই অস্ত্রটা দেখে আমার দম যায় যায় অবস্থা। পড়ে সাথে আর এক মুরম্বি আমার বাবাকে সরিয়ে নিয়ে আসে। তখনকার সময়ের ১৫শ টাকর চামড়াটা শেষ পর্যন্ত তারা ৫শ টাকায় নিয়ে যায়।
অস্ত্র হোক, হোক মাদক বা চোড়, এরা সবাই লীগের কর্মি, নেতা বা কেডার ছিল। বর্তমানের লীগের লালবাগ থানার সাধারণ সম্পাদক আনু এগুলোকে নিয়ন্ত্রন করতো। এখন সে উপরের দিকে তাই তাদের নিয়ন্ত্রণ করে আরেক ভাল মানুষ টুবলু।
বাইরের ছেলেরা কোয়াটারে এসে মারাÍক বদমাশি করতো। আমার মা একবার তাদের একটু ধমক দিয়েছিলো বলে সে কি গালাগালি। মনে করতেই লজ্জায় মাথা নষ্ট হয়ে যায়।
আমি লালবাগের একটি মাদ্রাসায় পড়া লেখা করতাম। মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল একবাড় দুখ করে আমাদের বলেছিলেন এলাকার ছেলেদের নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার কারণে তোমাদের জন্য কোন কাজ করতে পারছি না। কতবার আমার অফিসে এসে আমার টেবিলে অস্ত্র রেখে কথা বলেছে। তোমরা এমনকিছু করোনা যাতে তারা আমার বিরুদ্ধে কথা বলার কোন সুযোগ পায়।
সেই সরকাররের সময় ইসলাম আর মাদ্রাসার উপর নেমে আসে অদৃশ্য আঘাত। লালবাগের সবগুলো বিদ্যালয়ে কোন এক অদৃশ্য কারণে কোন ধর্ম শিক ছিলনা। কোন কোন বিদ্যালয়ে খেলার, শরীর চর্চার শিক ধর্ম পড়াতেন। আমরা ছেলেরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করলে আমাদের কয়েকজনকে থানায় ধরে নিয়ে ্যায়।
প্রতিটি মাদ্রাসাতে পুলিশ নিয়মিত তল্লাশি চালাতো। আমাদের মাদ্রাসাটা ছিল নতুন। সেখানে ইট ভেঙ্গে রাখা হত নির্মাণ কাজের জন্য। তাছাড়া মাদ্রাসর জানালার সানসেট তৈরী করার জন্য কিছু রড এমন ভাবে তৈরী করে রাখা হয়েছিলো যে দেখতে অনেকটা হকিস্টিকের মত লাগতো। পুলিশ এগুলো সব নিয়ে গিয়েছিল। তারা ভেবেছিল রড মারা মারি করার জন্য আর ইট আন্দোলনের জন্য। পুলিশ আমাদের মাদ্রাসাতে তল্লাশির সময় ফুল ও গাছের টবগুলোর মাটিতে কাঠি ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে দেখেছে কোন কিছু লুকানো রয়েছে কিনা? আমাদের সাথের সব মাদ্রাসাতে বড় বড় চাকু ও ধারালো অস্ত্র থাকতো। এগুলো কুরবানীর জন্য ব্যবহার করা হত। এগুলো রাখার জন্য আলাদা স্টোর রুম থাকতো। এগুলো পাওয়া যাওয়াতে সেই মাদ্রাসার অনেক শিার্থী শিক ও একটি মাদ্রাসার অধ্যকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
নিউপল্টন লাইন স্কুলের অবস্থা ছিল করুন। ছেলেদের মারামারি ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। মারা মারি করতে গিয়ে বিদ্যালয়ের নির্মাণাধিন ছাদ থেকে এক ছেলে আর এক ছেলেকে ফেলে দিলে পড়ে যাওয়া ছেলেটি মারা যায়। যে ছেলে ফেলে দিয়েছিলো সে বড় নেতার ছেলে। তাই তার কোন কিছুই হয়নি। নেতার হুম্বি তুম্বিতে আমরা কয়েকদিন বেশ ত্রস্থ ছিলাম।
আমাদের এলাকা দিয়ে তখন মহররমের মিছিল যেতো। সবগুলো লীগের ছেলেরা মিলে প্রতি বছরই সেই মিছিলের বিভিন্ন জিনিস লুট করতো। কতবার ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারা মারি হয়েছে। এমনকি শেষবার তো ককটেল মারা মারি হল। বলার অপো রাখেনাযে এগুলো সব লীগের ছেলে। ককটেল যখন মারা হল তখন আমি সেই ছেলের পাশে বসে ছিলাম। ছোট দেখে পুলিশ আমাকে ধরেনি। তবে আমি ছেলের পরিচয় বলে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই ছেলের কিছুই হয়নি। খুলে বলতে হবে কেন? পড়ে আমাদের এলাকা দিয়ে মহররমের মিছিল যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এটি করার পেছনে বড় হাত ছিলো হাজি সেলিমের। ভাল কাজ। কিন্তু লীগের ছেলেদের ভাল লাগলো না। তারা সেলিম ভাইয়ের গাড়িতে বোমা মারলো। তখন আমরা মাদ্রাসাতে কাশ করছিলাম। ভয়ে মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আগেই বলেছি আমাদের এলাকাতে অস্ত্রের ব্যবসা চলতো। সাথে বোমের কারখানা। ককটেলের কারীগররা আমার সাথে অনেকবার আলাপ করার সময় কিভাবে ককটেল বানাতে হয় তা শিখিয়েছিল। আবার কারা কতটুক সময়ের মধ্যে কয়টা ককটেন বানাতে পারে তাও গর্ব করে বলতো। আমাদের কোয়ার্টারের ছাদ ছিল কারখানার মূল অংশ। ককেবার তো এলাকাতেই ফুটে যেত। এতে করে পরিবেশের অবস্থা কি হত বলার অপো রাখে না। চারদলের মিছিলে কিংবা আন্দোলনের সময় এরা এই ককটেলগুলো ফুটাতো আর নাম দিতো তাদের।
লীগের সময় টিভির কি অবস্থা ছিল তা আর বলার অপো রাখে না। আওয়ামিলীগ মাতায় আসার আগে শেখ হাসিনা এক টিভি আলোচনায় বলেছিল তারা বিটিভিকে দলের কাজে ব্যবহার করবে না। তখন তার গায়ে ছিল একটা সাদা শড়ি যার মধ্যে অনেকগুলো নৌকার কালো ছাপ ছিলো। মতায় আসার প্রথম একমাসের বিটিভির অবস্থা যা ছিল তা আর কি বলবো। তখন অন্যকোন সেটেলাইট চেনেল ছিলনা। তাই বিটিভি আমাদের সঙ্গি। তখন টিপু সুলতান নামের একটি মেগা সিরিয়াল খুব চলতো। বঙ্গবন্ধুকে দেখানোর জন্য কয়েক রবিবার সেটি বন্ধ ছিল।
দামের অবস্থা যা ছিল তাও সুখকর নয়। বাবা ৯০-৯৬ তে যে ইলিশ ৮০-১২০ টাকার মধ্যে কিনতো তা একসময় হয়ে গেল ২৫০০ টাকা। আমি ভুল লিখিনি। ২৫০০ টাকা। আমাদের বাসাতে কোন মাছের ফেরিআলা আসতো না। কারণ যানে আমাদের কেনার কোন সামথ্য নেই। আমরা বড় মাছ কিনতে পারিনা।
রিকশা আর গাড়ির দাম তো হু হু করে বাড়ছিলো। ৩ টাকার রিকশা ভারা হঠাৎ করে ৫-৮ টাকা হয়ে গেল। এখন ৫-৮ টাকা কম লাগলেও তখন তা অনেক বেশি ছিল।
একটু দেশের কথা না বললেই নয়। লালবাগের হাজি সেলিম, ড. ইকবাল, জয়নাল হাজারিরা তো রীতি মত দেশ বিখ্যাত। বিরোধীদলের লোকেরা মরতো পাখির মত। পুলিশ হল সরকারীদলের লঠিয়াল বাহিনী। পথিককেও ছাড়তোনা। বায়তুল মোকাররমের মুসল্লিরা কোন এক রাজনৈতিক দলের লোকদের কারণে পুলিশ বাহিনীর ল্য বস্তু হয়ে গেল।
ধর্ষন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল। ধর্ষণের সেঞ্চুরীকের মানিক ভাইতো সবাইকে মিষ্টিমুখ করালেন। মেয়েদের জন্য সেই সময়টা ছিল দুর্বিসহ।
এভাবে আরো অনেক কিছুই লিখা যায়। সেই সময়কার অবস্থা বর্ণনা করার জন্য এতটুকই যথেষ্ট বলে মনে হল।
এর পরের পর্বে বলবো চার দলের অবস্থা।
আমার এই লিখার সাথে মন্তব্য করার সময় কেও যদি সেই সময়ের আরো কিচু যোগ করতে চান তবে স্বগতম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



