হঠাৎ করে এক বন্ধু বললো চল ভোলায় যাই। ভোলাতে আমাদের এক পরিচিত বড় ভাই আছে যিনি সেখানে এতিম ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য একটি এনজিও চালান।
প্রস্তাবটা আমার খুব বেশি ভাল লাগলোনা। কারন সেখানে গেলে না আমরা তাদের কাজে আসি না আমাদের বেরানো হয়। তাই আমি প্রস্তাব করলাম চল দূরে কোথাও ঘুরতে যাই। যেমন কক্সবাজার। আমাদের একজন এর আগে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। আমরা রাতের বাসে কক্সবাজার যাবো, সারাদিন ঘুরবো আবার রাতের বাসে ফিরে আসবো। আমার কাছে প্রস্তুবটা বেশ ভাল লাগলো। কারন খরচ কম হচ্ছে। কিন্তু সবার ভাল লাগলোনা। কারন এরকম তারাহুরো করে কক্সবাজারে মজা করা যায় না।
অনেক চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, প্রস্তাবনা পার করে সিন্ধান্ত হল আমরা কক্সবাজার তিনদিন থাকবো। আমাদের খরচ ধরা হল ১৫০০ টাকা। যদিও শেষ পর্যন্ত তা অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
যাইহোক অবশেষে কক্সবাজার পৌছলাম। সেখানে একটু ধাতস্ত হয়ে চিন্তা করছিলাম কোথায় যাওয়া যায়। আমাদের প্রথম প্রস্তাব ছিল হিম ছড়ি। ঝর্ণা আর পাহাড়ের মিলন দেখবো। যেই কথা সেই কাজ।
হিমছড়ি পাহাড়
হিমছড়ি পৌছে গেলাম। বাইরে থেকে উপরে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের উপরে একটি বাড়ির মত। তার উপর কিছু মানুষ দাড়িয়ে আছে। বুঝতে পারলাম ঐপর্যন্ত যেতে হবে।
নজরুল আমাকে জিজ্ঞাসা করলো ঐ পর্যন্ত যেতে পারবি? আমি সরাসরি বললাম কেন নয়?
টিকিট কেটে যখন পাহাড়ে উঠা শুরু করলম তখন সেখানকার এক লোক আমাকে মানা করলো পাহাড়ে উঠতে। কারন অনেক উপরে যেতে হবে। আমি পারবো না এটাই তার চিন্তা। আমার বন্ধুরাও আমাকে মানা করতে লাগলো। বিশেষ করে নজরুল বললো অনেক দূর যেতে হবে। তাই তুই নিচে দেখতে থাক। আমরা উপর থেকে দ্রুত চলে আসবো।
কিন্তু আমার উঠতে মন চাচ্ছিলো। কারন এতদূর এসে না উঠে পরে বাসায় বসে আফসুস করে লাভনেই যে আমি হিমছড়ির পহাড়ে উঠিনি। তাই উঠা শুরু করলাম।
পাহাড়ে উঠার আগে একটু জিরিয়ে নেওয়া।
পাহাড়ে উঠা শুরু
পাহাড়ে উঠা শুরুকরতেই একটি ছবি তোলা
প্রথম ধাপ পার করার পর বুঝলাম এটা কোন সহজ কাজ না। যত বড় মুখ করে বলেছিলাম তত কঠিন।
আমার বাসা তিন তলায়। তাই সিড়ি উঠা আমার নিত্য দিনের কাজ। কিন্তু পাহাড়ের সিড়িগুলো বেশ উচু উচু তাই একটু পরেই ক্লান্ত হয়ে গেলাম। আমি বুঝতেছিলাম অনেক কষ্ট হবে। কিন্তু বন্ধুদের বুঝতে দিলাম না। আস্তে আস্তে উঠতে থাকলাম।
দ্বিতীয় ধাপে এসে কষ্ট বেশি হচ্ছিল
কিন্তু প্রথম ভাগ উঠে আমার হৃদপিন্ডের চলাচল বেড়ে গেল। মনে হল একটু জিরিয়ে নেই। কিন্তু সিড়ি এত চিকন যে তাতে বসলে বা দাড়ালে মানুষ উঠতে বা নামতে পারবে না। তবুও একটি জিড়িয়ে নিলাম। এখানে বন্ধুরা কিছু ছবি তুললো। আমি কিছু ছবি তুলে দিলাম।
আমার তুলে দেওয়া আমার সাথের পাঁচ বন্ধুর ছবি। যাদের সহযোগীতার কারনে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অনেক সহজ হয়েছে। যারা না সহযোগীতা করলে আমি কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন আর হিমছড়ি ঘুরতে যেতে পারতাম না। যাদের কৃতজ্ঞতা আমি কখনোই আদায় করতে পারবো না।
এর পর আবার চলার পালা। এই ধাপের সিড়িগুলো দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। অনেক উচু উচু। এক ধাপ উঠতে পা দিতে পারি কিন্তু পরের পা আর টেনে নিতে পারছিনা। চড়ম কষ্ট হচ্ছিল। এই সিড়ি বাওয়া চরম ঝুকির কাজ। কিন্তু আমিতো থামার পাত্র না। সাধারনত আমি দুই ধাপ করে সিড়ি উঠি বা নামি। কিন্তু এখানে এক ধাপ একধাপ করে উঠতে লাগলাম।
উচু ধাপগুলো উঠার সময় অবস্থা খারাপ হচ্ছিল
কিন্তু তারপরও বেশ ক্লান্ত লাগছিলো। শেষ পর্যন্ত এই ধাপও শেষ করলাম। এখানেও কিছুটা জিরিয়ে নিলাম। বন্ধুরা ছবি তোলা শুরু করলো। আমি একটু জিরিয়ে বন্ধুদের রেখেই চলা শুরু করলাম। কারন আমি ধীরে চলি। আমি আগে ভাগে সেখানে না গেলে বেশিখন উপরে থাকতে পারবোনা। আমার বন্ধুরাতো দ্রুতই চলে আসতে পারবে।
শেষের দিকে একবার, ঘেমে একাকার
যাই হোক শেষ ধাপে উঠা শুরু করে বেশ বিরক্ত হলাম। কারন এখানে সিরি বেশ ভাঙ্গা এবং রেলিং নেই। মানে পরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ ভাগ। কারন আমি রেলিং না ধরে উঠতে পারে না। কিন্তু থামাতো যাবে না। তাই সিরি ধরে ধরেই উঠা শুরু করলাম। থামা যাবে না।
অবশেষে সেই বাড়িটার কাছে পৌছলাম। বুক ফাটে ফাটে অবস্থা। উপরে থাকা কিছু লোক আমার দিকে আজব ভাবে তাকাচ্ছিল। কারো চোখে সন্দেহের চাহনি, কারো চেখো অবাক করা ভাব। এই ছেলে এখানে উঠলো কি করে? সেখানে কিছুখন বসে নিলাম। কারন দম নিতে পারছিনা। আবার চলা শুরু করলাম। কারন থামাতো যাবে না। কিন্তু বাড়িতে উঠার সিরি পাচ্ছিলামনা। একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বলে দিলেন কোথায়। সিড়ির সামনে পৌছে আবার মন ভেঙ্গে গেল। কারন সিড়িটা লোহার আর বেশ খাড়া। যাইহোক উঠার ইচ্ছে ছিল প্রবল। তাই টেনে হিচড়ে উঠে গেলাম। আহ কি শান্তি!
উঠেই আমি চিতকার শুরু করলাম "নিজেকে বীরের মত লাগছে" ; " I am feeling like a winner."
এখানে নিজের শরীর একদম ছেড়ে দিয়ে জিরাতে লাগলাম। কিছুখন পর এদিক সেদিক তাকিয়ে চারপাশ আর নিচের সৌন্দর্য দেখছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম। হঠাৎ বন্ধুদের ডাক শুনতে পেলাম। কারন তারা আমাকে খুজে পাচ্ছেনা। তাই তারাতারি ছাদের কিনারে গিয়ে তাদের ডাক দিলাম আমি এখানে। তাদের সামনে আবার চিতকার করতে লাগলাম "আমি বিজয়ি"; I am feeling like a winner." নিচে থেকে তারা আমার কিছু ছবি তুললো।
বাড়িটার ছাদ থেকে নিচের দিকে বন্ধুদের দেখে বিজয়ের চিহ্ন দেখাচ্ছি।
তারপর সব বন্ধুরা উপরে উঠে আসলো।
কিছুখন তাদের সাথে চিৎকার চেচামেচি করার পর যখন থামলাম তখন শরীরের অবস্থাটা অনুভূত হল। শরীর ভেঙ্গে আসছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ডান বুক আর দুই হাত প্রচণ্ড ব্যথা করছে। বসে থাকতে পারছিনা। আমি ছাদেই শুয়ে পড়লাম। নজরুল বলে উঠলো "এই বার ওর খবর হইছেরে"। সৌরভ বললো " খারাপ লাগতেছে?"। আমি সবাইকে আস্বস্থ করে একটু শুয়ে থাকলাম।
বাড়ির ছাদে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখছি। মুহুর্তটাকে ধরে রাখতে আমাকে সামনে রেখে বন্ধুরা ছবি তুললো।
একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠতেই ছাদে একটি ছবি তুললাম।
ছাদে ছয় বন্ধু একসাথে
হিমছড়ি পাহাড়ের উপর থেকে সমুদ্র সৈকত
অনেক আনন্দ, ছবি তোলা, ডাবের পানি খাওয়া, পাহাড়ের উপর থেকে চারদিকের সৌন্দর্য উপভোগ করা শেষ করে মন না চাইতেও নামা শুরু করতে হল।
নেমে আসছি পাহাড় থেকে
হিমছড়ি পাহাড় থেকে নামার পর মনে হল ঝর্ণাটা দেখতে হবে। তাই ঝর্ণার কাছে গেলাম।
পাহাড়ী ঝর্ণার কাছে দিয়ে তাতে একটু ভিজবো না তা তো হয় না। তাই ধীরে ধীরে পিচ্ছিল পথে বেয়ে ঝর্ণার কাঝে চলে গেলাম।
ঝর্ণার পানিতে ভিজছি আমি।
হাত মুখ মুছে একটু জিড়িয়ে নেওয়া।
অনেক বড় কিছু করিনি। কিন্তু আমার জীবনে এই ঘটনাটা অনেক বড় হিসেবেই থাকবে। এই ভাবে পাহাড়ে উঠেছি। অনেকগুলো বাধাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে গিয়েছি। হল না হয় মুসা ভাই প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে হিমালয়ে আরহনকারী। কিন্তু আমি যে কাজ করেছি তা তার চাইতে ছোট নয়। তার পাহাড়ে উঠার ব্যাপারে অনেকেই সন্দেহ করেছেন। কারন তার ছবিগুলো স্পষ্ট ছিলনা। কিন্তু আমার সব ছবি স্পষ্ট।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সন্ধার দৃশ্য যাকে আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। যার টানে বার বার ফিরে যেতে ইচ্ছে হবে। কিন্তু আফসোস প্রাকৃতিক সম্পাশ্চর্য থেকে বিস্বয়কার ভাবে কক্সবাজার বাদ পড়লো। আমি এখনো বুঝিনা আমরা সবাই কক্সবাজারকে এক নম্বরে আর সুন্দর বনকে দুই নম্বরে রেখে ভোট করার পরও কি করে কক্সবাজার বাদ পড়ে?
মুসা ভাই সব সময়ের জন্যই সেরা। কিন্তু আমি পাহাড়ে উঠে প্রথম যে কথাটা চিন্তা করেছিলাম ত হল "আমি মুসা ভাইকে হারিয়ে দিয়ছি'।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ৮:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


