গীতার কথা মত ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের বৃদ্ধির তাৎপর্য হল- ভগবদ্ প্রেমী, ধর্মাত্মা, সদাচারী, নিরপরাধ এবং মানুষদের ওপর নাস্তিক, পাপী, দুরাচার, বলবান ব্যক্তিদের অত্যাচার বৃদ্ধি পাওয়া এবং মানুষের মধ্যে স˜্গুণ সদাচার অত্যন্ত কমে গিয়ে দুর্গুণ-দুরাচারের অত্যাধিক বৃদ্ধি পায়।
শ্রীকৃষ্ণ যখন আবির্ভূত হন তখন পৃথিবীতে বহু ধর্মমত ও উপধর্মমত প্রচলিত ছিল। যে সনাতন যোগধর্ম অনেকবার প্রচারিত হয় এবং লয়ও হয়, শ্রীকৃষ্ণ তাই পুনরায় প্রচলন করলেন। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন, হে অর্জুন, আমার এই দিব্য জন্ম ও কর্ম যিনি তত্ত্বতঃ জানেন, তিনি দেহত্যাগ করে আর জন্মগ্রহণ করেন না, তিনি আমাকেই পেয়ে থাকেন।
শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীকে কলুষ মুক্ত করতে কংস, জরাসন্ধ ও শিশুপালসহ বিভিন্ন অত্যাচারিত রাজাদের ধ্বংস করেন এবং ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। কেননা সেই সময় পৃথিবীতে এক অরজকতা সৃষ্টি হয়েছিল। আর তারই অবসান ঘটাতে তিনি ধরাতে অবতরণ করেন।
দ্বাপরের যুগের সন্ধিক্ষণে রোহনী নক্ষত্রের অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটেছিল এই মাটির ধরাধামে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলাকে কেন্দ্র করেই জন্মাষ্টমী উৎসব। ঐ সময় অসুররূপী রাজশক্তির দাপটে পৃথিবী হয়ে ওঠে ম্রিয়মাণ, ধর্ম ও ধার্মিকেরা অসহায় সংকটাপন্ন অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হন। অসহায় বসুমতি পরিত্রাণের জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মার পরামর্শে দেবতারা সবাই মিলে যান দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে। সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের যুগসন্ধিক্ষণে তারা সকলে বিষ্ণুর বন্দনা করেন। স্বয়ং ব্রহ্মা মগ্ন হন কঠোর তপস্যায়। ধরণীর দুঃখ-দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে দেবতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি দেবতাদের অভয়বাণী শোনান এই বলে যে, তিনি অচিরেই মানবরূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হবেন দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানরূপে শঙ্খ, চক্র, গদাপদ্মধারী শ্রীকৃষ্ণ নামে। ভগবান বিষ্ণু দেবতাদের নির্দেশ দিলেন এই ধরাধামে তার লীলার সহচর হওয়ার প্রয়োজনে এই ধরণীতে জন্ম নেয়ার জন্য। ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশমত দেবতারা তাদের স্ব স্ব পত্নীসহ ভগবানের কাঙ্ক্ষিত কর্মে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে যদুকুলে বিভিন্ন পরিবারে জন্ম নিতে থাকেন। এভাবে ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য দেবতাদের মর্ত্যলোকে অবতরণ।
বসুদেব দেখলেন, শিশুটির চারহাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম ধারণ করে আছেন। নানা রকম মহামূল্য মনি-রত্ন খচিত সমস্ত অলংকার তাঁর দেহে শোভা পাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন জগতের মঙ্গলার্থে পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণই জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের ঘরে। বসুদেব করজোড়ে প্রণাম করে তাঁর বন্দনা শুরু করলেন। বসুদেবের বন্দনার পর দেবকী প্রার্থনা শুরু করলেন এবং প্রার্থনা শেষে একজন সাধারণ শিশুর রূপ ধারণ করতে বললেন শ্রীকৃষ্ণকে।
একজন সাধারণ শিশুর রূপ ধারণ করে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, আমি জানি, আপনারা আমাকে নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত এবং কংসের ভয়ে ভীত। তাই আমাকে এখান থেকে গোকুলে নিয়ে চলুন। সেখানে নন্দ এবং যশোদার ঘরে একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। আমাকে ওখানে রেখে তাকে এখানে নিয়ে আসুন।
শ্রীকৃষ্ণের কথা শুনে বসুদেব সূতিকাগার থেকে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। গোকুলে নন্দ এবং যশোদার সন্তানরূপে যিনি জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি হলেন ভগবানের অন্তরঙ্গ শক্তি যোগমায়া। যোগমায়ার প্রভাবে কংসের প্রাসাদে প্রহরীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কারাগারের দরজা আপনা আপনি খুলে গেল। সে রাত ছিল ঘোর অন্ধকার। কিন্তু যখন বসুদেব তার শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে বাইরে এলেন তখন সবকিছু দিনের আলোর মত দেখতে পেলেন। আর ঠিক সেই সময় গভীর বজ্রনিনাদের সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বর্ষণ হতে শুরু হল। বসুদেব যখন শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বৃষ্টির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন ভগবান শেষসর্পরূপ ধারণ করে বসুদেবের মাথার উপরে ফণা বিস্তার করলেন। বসুদেব যমুনা তীরে এসে দেখলেন যমুনার জল প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে ছুটে চলেছে। কিন্তু এই ভয়ংকর রূপ সত্ত্বেও যমুনা বসুদেবকে যাবার পথ করে দিলেন। এভাবে বসুদেব যমুনা পার হয়ে অপর পাড়ে গোকুলে নন্দ মহারাজের ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে তিনি দেখলেন সমস্ত গোপগোপীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেই সুযোগে তিনি নিঃশব্দে যশোদার ঘরে প্রবেশ করে শ্রীকৃষ্ণকে সেখানে রেখে যশোদার সদ্যজাত শিশুকন্যাকে নিয়ে কংসের কারাগারে ফিরে এলেন। নিঃশব্দে দেবকীর কোলে শিশুকন্যাটিকে রাখলেন। তিনি নিজেকে নিজে শৃংখলিত করলেন যাতে কংস বুঝতে না পারে যে ইতিমধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর জন্ম নিয়ে বলেছেন, তাঁর জন্ম সাধারণ মানুষদের মত নয় এবং তাঁর মৃত্যুও সাধারণ মানুষের মত নয়। মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায় কিন্তু আমি জন্মরহিত হয়েও আবির্ভূত হই এবং অবিনশ্বর হয়েও অন্তর্ধান করে থাকি। আবির্ভূত হওয়া এবং অন্তর্হিত হওয়া-দুটিই আমার অলৌকিক লীলা।
গীতাতে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আরও বলেছেন, আমি জন্মহীন, অব্যয় আত্মা, ভূতগণের ঈশ্বর (শাসক, নিয়ন্তা শ্রষ্টা) হয়েও নিজ প্রকৃতিকে (অনির্বচনীয় মায়াশক্তিকে) আশ্রয় করে আত্মমায়ায় জন্মগ্রহণ করি।
পুরাণে একে ধরাভারহরণ, অসুর-নিধনাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু শুধু মাত্র এটাই শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্য নয়। বুদ্ধ, খ্রিস্ট, শ্রীচৈতন্য অনেককেই অবতার বলা হয়, কিন্তু এসব অবতারের অসুর-বিনাশ নেই, এসব অবতারের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবাত্মাকে দিব্য প্রেম-পবিত্রতা-জ্ঞান-ভক্তির অনুপ্রেরণা দেয়। পক্ষান্তরে, পৌরাণিক নৃসিংহাদি অবতারের অসুর-বিনাশ ব্যতীত আর বেশি কিছু প্রয়োজন দেখা যায় না। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ অবতারের দুটিই উদ্দেশ্য আছে। প্রথমটি হচ্ছে অন্তর্জগতে মানবাত্মার উন্নতি সাধন ও বাহ্য জগতে মানব-সমাজের রাষ্ট্রীয় বা নৈতিক পরিবর্তন সাধন।
বেদে বলা আছে ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়, নিরাকার, জ্যোতির্ময়, সর্বত্র বিরাজমান এবং সর্ব শক্তিমান। বেদজ্ঞ জ্ঞানী ঋষিরা নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করে থাকেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে নিরাকার ঈশ্বরের উপলব্ধি করা খুবই কঠিন কাজ। তারপরও মানুষই সেই অসাধ্যকে সাধন করছে।
মহাকাল ও মহাজগৎ ব্যাপ্ত হয়ে যিনি অনন্ত সর্বশক্তিমান সত্তায় শাশ্বত সত্যরূপে বিরাজিত, আমরা তাকেই ভগবান বলে থাকি। কেবল সনাতনীকল্প মণীষাতেই তিনি অষ্টোত্তর শতনামে সম্ভাসিত হয়েছেন। ভক্তরা তাকে যে নামে ডাকেন, সে নামে তিনি সাড়া দেন। যেভাবে তাকে পেতে চান, সেভাবেই তিনি ধরা দেন। সনাতনী সমাজে তার অবস্থান অনেকটা পরিবারের একজনের মত। তাই তো তিনি দেবকী ও বসুদেবের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে কংসের কারাগারে তাদের সম্মুখে আবির্ভূত হন পুত্ররূপে, কৃষ্ণনামে।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৩:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


