somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি অর্থকরী ফসল আলু

১১ ই নভেম্বর, ২০১১ রাত ১২:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মানুষের কৃষিই একমাত্র ভরসা। ১৬ কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাবার যোগান দিচ্ছে আমার এই কৃষকেরাই। কৃষিপ্রধান এই দেশের কৃষকেরা প্রতিবছর বহুসংখ্যক ফসল জন্মিয়ে থাকে। কিছু ফসল তাদের এনে দিচ্ছে সফলতা আবার কোনটা করছে নিঃস্ব। এর মধ্যে আমরা বলতে পারি আলুর কথা। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে আলুর উৎপাদন আশাতীত তবুও এ থেকে কৃষকের লাভবান হওয়ার নজির খুবই কম। তারপরও আলু নিয়ে চলছে নিরন্তর গবেষণা এবং উদ্ভাবিত হচ্ছে নতুন নতুন কৌশল যা আলুর উৎপাদন বৃদ্ধিতে সক্রিও ভূমিকা পালন করছে। মূলত আলু একটি বহুবর্ষজীবী টিউবেরাস ফসল যা সোলানেসিয়া গোত্রের অন্তর্গত। আসলে এর খাওয়ার উপযোগী টিউবারের কারনেই এটির আলু নামকরণ। আলুর ইংরেজি শব্দ পটেটো এসেছে স্প্যানিশ পেটাটা থেকে। স্প্যানিশ রয়েল একাডেমির তথ্য অনুযায়ী এটি টাইনো (মিষ্টি আলু) এবং কুয়েছু পেপা (আলু) । আলু বলতে মুলত সাধারণ আলু অপেক্ষা মিষ্টি আলুকে বোঝানো হয়, যদিও এই দুই ধরনের আলুর মাঝে কোন মিল নেই। এটি নিয়ে ইংরেজরাও দ্বিধাদন্দে আছে। ষোড়শ শতাব্দীতে ইংরেজ উদ্ভিদবিদ জন গেরারড “বাস্টার্ড পটেটো” এবং “ভার্জিনিয়া পটেটো” নামক দুইটি টার্ম ব্যবহার করেন এবং মিষ্টি আলুকে সাধারণ আলু হিসেবে নামকরণ করেন।

আলুর প্রজাতিসমুহঃ

Solanum tuberosum প্রজাতির আলু সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়ে থাকে যা টেট্রাপ্লোয়েড এবং ক্রোমোসোম সংখ্যা ৪৮। এছাড়াও ২৪ ক্রোমোসোম যুক্ত ডাইপ্লোয়েড প্রজাতি হচ্ছে Solanum stenotomum, Solanum phureja , Solanum goniocalyx , and Solanum ajanhuiri . ৩৬ ক্রোমোসোম যুক্ত ট্রাইপ্লোয়েড প্রজাতি সমুহ হচ্ছে Solanum chaucha and Solanum juzepczukii. এছাড়াও ৬০ ক্রোমোসোমযুক্ত পেন্টাপ্লোয়েড প্রজাতি Solanum curtilobum ও চাষ হয়ে থাকে।

আলুর উৎপত্তি ইতিহাসঃ

আন্দাস অঞ্চলের কাছাকাছি এর কিছু সংখ্যক প্রজাতি দেখা যায়। এটি সর্বপ্রথম ৪০০ বছর পূর্বে আন্দাস পর্বতে দেখা যায় যা পরবর্তীতে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ধান, গম এবং ভুট্টার পর এটি চতুর্থ বৃহত্তম ফসল। বন্য আলুগুলো মূলত সমগ্র আমেরিকাতে দেখা যেত বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উরুগুয়ে পর্যন্ত। এর উৎপত্তি হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলের নাম উল্লেখ করা হলেও সম্প্রতি একটি গবেষণায় প্রমাণ করে আলুর উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ পেরু যা ৭০০০-১০০০০ বছরের পুরনো Solanum brevicaule complex প্রজাতির আলু দ্বারা প্রমাণিত হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশেরা ইউরোপে আলু পাচার করে, পরবর্তীতে ইউরোপীয় নাবিক দ্বারা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪৫ সালে যদিও oomycete Phytophthora infestans, ছত্রাক দ্বারা আলুর লেট ব্লাইট রোগ দেখা যায় যা পশ্চিম আয়ারল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তারপরও আলুর উৎপাদন থেমে থাকে নি । বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি মানুষ বছরে ৩৩ কে.জি আলু ভক্ষণ করে থাকে এবং এককভাবে চীন এবং ভারত সর্বাধিক আলু উৎপাদন করে থাকে। তবে বিশ্বের সমগ্র অঞ্চলে কম বেশি আলু জন্মে।
আলু মূলত প্রথম বছরের টিউবার থেকে পরবর্তী বছরের জন্য জন্মানো হয়ে থাকে। মূলত িটউবারই আলু উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। তবে এর বাইরেও আলুর বীজ থেকেও জন্মানো হয়ে থাকে। আলুর বীজ একটি বিশেষ পদ্ধতিতে উৎপাদন হয়ে থাকে যা ট্রু পটেটো সিড(টি.পি.এস) নামে পরিচিত। ১৯৫৭ সালে রামানুজান প্রথম এটি উদ্ভাবন করেন যদিও তা কৃষকদের কাছে গ্রহণের উপযোগী ছিল না। প্রাথমিকভাবে এই পদ্ধতিতে নার্সারীতে চারা উৎপাদন করে সিড বেড রপন করা হয়ে থাকে যা খুবই ব্যয়বহুল এবং নিবিড় পরিচর্যা পদ্ধতি। মূলত এটি দুই ধাপে সম্পন্ন হয়ঃ

(১) প্রথম বছর নার্সারি বেেড িটউবারলেট উৎপাদন করা হয়।

(২) পরবর্তীতে এটি হিমাগারে রাখা হয় এবং প্রয়োজনীয় সময় রোপণ করা হয়। প্রতি হেক্টরের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ৫০-১৫০ গ্রাম।

টি. পি. এস এর সুবিধাসমুহঃ

(১) এই পদ্ধতিতে রোগমুক্ত বীজ পাওয়া যায়। এটি মূলত ভাইরাস মুক্ত বীজ উৎপাদনের একটা পদ্ধতি।

(২) সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি বছর ব্যবহিত টিউবার এর পরিমাণ খুবই বেশি যেখানে নার্সারিতে উৎপাদিত এই বীজ পরবর্তী বছরে রোপণের উপযোগী হবে তা খুবই সস্তা।

(৩) বড় আকারের টিউবার উৎপাদিত আলু সংগ্রহের জন্য অনেক জায়গা প্রয়োজন যেখানে এই আলু রাখার জন্য কম জায়গা প্রয়োজন কারণ এটি আকারে ছোট কিন্তু বড় আলুর মত পুষ্টিসমৃদ্ধ।

(৪) এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত আলুর ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা কম।

(৫) টিউবারলেট ছোট আকার হওয়ায় টিউবার থেকে উৎপাদিত আলু অপেক্ষা কম রাসায়নিক সার প্রয়োজন।

(৬) মূলত এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত আলু রোগ মুক্ত হবে এবং উৎপাদিত জমিগুলো রোগমুক্ত রাখবে।

আলুর পুষ্টিগুণঃ

আলু ভিটামিন এবং খনিজ দ্রবের পাশাপাশি ফাইটোকেমিকেল বিশেষ করে ক্যরটিনয়েড এবং প্রাকৃতিক ফেনল সমৃদ্ধ। মূলত প্রতি ১০০ গ্রাম আলুতে যে সকল পুষ্টি থাকে তা নিম্নরুঃ

শক্তি
৩২১ জুল (৭৭ ক্যালরি)

কার্বোহাইড্রেট
১৯ গ্রাম

স্টার্চ
১৫ গ্রাম

তন্তু
২.২ গ্রাম

চর্বি
০.১ গ্রাম

প্রোটিন
২ গ্রাম

পানি
৭৫ গ্রাম

থায়ামিন(ভিটামিন বি-১)
০.০৮মিলিগ্রাম

রায়বোফ্লাভিন (ভিটামিন বি-২)
০.০৩ মিলিগ্রাম

নিয়াচিন (ভিটামিন বি-৩)
১.১ মিলিগ্রাম

ভিটামিন বি-৮
০.২৫ মিলিগ্রাম

ভিটামিন সি
২০ মিলিগ্রাম

ক্যালসিয়াম
১২ মিলিগ্রাম

আয়রন
১.৮ মিলিগ্রাম

ম্যাগনেসিয়াম
২৩ মিলিগ্রাম

ফসফরাস
৫৭ মিলিগ্রাম

পটাশিয়াম
৪২১ মিলিগ্রাম

সোডিয়াম
৬ মিলিগ্রাম

বিভিন্ন উপাদান সমৃদ্ধ এই সবজিটি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ । প্রতিবছর আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হয়ে থাকে। হিমাগারের স্বল্পতা ছাড়াও বিভিন্ন কারনে আমাদের দেশে আলুর পর্যাপ্ত সুবিধা আমাদের কৃষক পাই না। তবু আমরা প্রত্যাশা করি সরকার মহল সহ বিভিন্ন আলু গবেষণা সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলো একটু সচেতন হলেই আমাদের দেশে আলুর সঠিক ব্যাবহার সম্ভব। যার ফলে উপকৃত হবে দেশ, আমার কৃষক। অর্থাৎ সঠিক বাবস্থায় বাঁচবে কৃষক,আর কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০১১ রাত ১২:২১
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শরৎ বন্দনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯


শরৎ এলেই আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা
দিনমণি আর মেঘমালার লুকোচুরি খেলা।

রুম ঝুমঝুম নূপুর পায়ে ছুটছে নদীর ঢেউ
ভাটিয়ালি গাইছে গান অচিন সুরে কেউ।

বিলে ঝিলে শাপলা পদ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×