বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন অনুযায়ী যৌথ নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে সমীক্ষা ও জরিপ করে তবেই এমন কোন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হবে। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ হলে বাংলাদেশের সিলেটের হাওর অঞ্চলসমূহ পানিতে তলিয়ে যাবে। ফলে প্রতিবছর প্রায় এক হাজার কোটি টাকার যে বোরো ধানের আবাদ হয় তা আর হবে না। এছাড়া বন্যা ও খরাতেও আক্রান্ত হবে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চল। বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকারকে এ বাঁধ ও জলবিদ্যুত্ নির্মাণে জোর প্রতিবাদ জানানোর দাবি জানান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জোর আপত্তি উত্থাপনের পরামর্শ দেন তারা। বিশ্ব ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো এসব প্রকল্পে অর্থ ঋণ দেয়। পার্শ্ববর্তী দেশের অনাপত্তির পরই এ অর্থ দেয়া হয়। বাংলাদেশ যদি জোর দাবি তুলতে পারে তাহলে হয়তো ভারত সরকারও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়বে। হয়তো তখন ভারত তার অবস্থান থেকে সরে আসবে।
উল্লেখ্য, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে বরাক নদের ওপর টিপাইমুখ বাঁধ ও জলবিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য গত ২২ অক্টোবর একটি যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি সই হয়েছে। যদিও এ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশের পর থেকেই বাংলাদেশ আপত্তি জানিয়ে আসছে। বাংলাদেশের আপত্তির মুখে ২০১০ ও ২০১১ সালে প্রতিবেশী দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে যুক্ত ইশতেহারে মনমোহন সিং বলেছিলেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় টিপাইমুখে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না ভারত। কিন্তু বাংলাদেশকে অন্ধকারে রেখেইে এ বাঁধ নির্মাণে চুক্তি করা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে ভারতের একতরফা চুক্তির ঘটনা আঞ্চলিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশকে না জানিয়ে ভারত যেভাবে বাঁধ নির্মাণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এতে কখনোই দুদেশের বিশ্বাসের সম্পর্ক স্থাপিত হবে না। তিনি প্রশ্ন করেন, দুদেশের মাঝে এই দূরত্ব থাকলে পারস্পরিক সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক কীভাবে সম্ভব। কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ভারত সরকারের এ পদক্ষেপ বৈরিতামূলক। ভারত এ সিদ্ধান্তের পথে অগ্রসর হলে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক স্বার্থহানির কবলে পড়বে। সেইসঙ্গে যারা বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়—এ পদক্ষেপ তাদের মদদ দেবে। তিনি ভারত সরকারকে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আবেদন জানান। সেইসঙ্গে ভারতের প্রগতিশীল জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর এ পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে। প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব সময় সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখিয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে না জানিয়ে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করা হলে তা সরকারের জন্য বিব্রতকর হবে। তিনি আরো বলেন, ভারত নীতিগতভাবেই কম কিছু দিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে চায়। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে বাংলাদেশের সহায়তা এবং ট্রানজিটের মতো সুবিধা পেলেও টিপাইমুখ বাঁধ, তিস্তার পানি বণ্টনের মতো বিষয়ে ভারত ইতিবাচক কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও গঙ্গা চুক্তির নয় নম্বর আর্টিকেলের পুরোপুরি লংঘন করে এ চুক্তি করেছে। তারা যে কোম্পানি গঠন করছে এটাও বাংলাদেশকে জানায়নি। এটা আন্তর্জাতিক পানি আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। কারণ আইন অনুযায়ী সমতা, ন্যায্যতা ক্ষতির কারণ না হয় দুদেশ যখন এমন অবস্থানে পৌঁছাবে তখন এ ধরনের বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু ভারত একতরফাভাবেই এ বাঁধ নির্মাণ করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ভারতের এ আচরণ ফারাক্কার কথা মনে করিয়ে দেয়। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের সময়ও ভারত একইভাবে বলেছিল বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু ভারত করবে না। কিন্তু তারা ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছিল। একইভাবে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের সময়েও ভারত বলে এসেছে যে, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু তারা করবে না। কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে কিছু না জানিয়েই বাঁধ নির্মাণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পানি বিশেষজ্ঞ ও ওয়ারপোর সাবেক মহাপরিচালক ম. ইনামুল হক বলেন, ভারত বাংলাদেশকে ‘কূটনৈতিক ট্র্যাপে’ ফেলেছে। ভারত সবসময় বলে এসেছে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতি হয় এমন কিছু তারা করবে না। কিন্তু বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে করবে এমন কিছু তারা বলেনি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তারা বাংলাদেশকে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণকালে তা জানাতে বাধ্য। কিন্তু তারা বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আগের মতো সক্রিয় থাকলে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে এখনই হয়তো ভারত সরকার অগ্রসর হতো না। কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর এ সুযোগ বাংলাদেশই করে দিয়েছে। এখন ভারত তাদের স্বার্থ উদ্ধার করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশকে উদার সহযোগিতার মূল্য দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামীতে ভারত হয়তো এ টিপাইমুখ বাঁধকেই কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। তারা যদি বেশি হারে নদী থেকে পানি তোলে সেক্ষেত্রে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা ও কুমিল্লায় পরিবেশগত ক্ষতি সাধন হবে এবং পানি সংকট দেখা দেবে। আগামীতে বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করলে ভারত এ আচরণ করতে পারে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মনিপুরের বরাক নদীর উপর টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে চুক্তি সংক্রান্ত খবরে বক্তব্য দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গতকাল শনিবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগের মহাপরিচালক শামীম আহসান ইত্তেফাককে জানান, নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনকে জানিয়েছে যে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যে, বোঝাপড়া আছে তা বহাল রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাইকমিশনকে এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়েছে। মহাপরিচালক আরো জানান, দু’একদিনের মধ্যে এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হবে।
সূত্র: ইত্তেফাক

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



