ভয়াল ১২ নভেম্বরের দুঃসহ স্মৃতি এবং আজকের বাস্তবতা
১২ ই নভেম্বর, ২০০৯ সকাল ৭:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের ঠিক আগে ১৯৭০ এর ১২ নভেম্বর ইতিহাসের নির্মম প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছিল। বাংলাদেশের উপকূলের ৭৫০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বাঙ্গালী জাতির প্রতি চরম অবজ্ঞা আর ঘৃণা থেকে তৎকালীন শাসক গোষ্টী ভয়াবহ জলোচ্ছাস ও গোর্কীর আগাম আবহাওয়া বার্তা পেয়েও মানুষকে সতর্ক করেনি। এরফলে সে দিন কয়েক লক্ষ মানুষ, গবাদি পশুর প্রাণহানি ছাড়াও বিরাণ হয়েছে উপকূলের জনপদ। সে সময়টা ছিল আমন ধানের মৌসুম। বিশাল চরাঞ্চলে সোনালী ধান কাটার কাজে সকল প্রস্তুতি নিয়ে কৃষককুল ব্যস্ত। কৃষাণিরা ব্যস্ত ছিল মাড়াইকৃত ধান শুকিয়ে গোলায় তুলতে। উত্তরবঙ্গ সহ কয়েকটি জেলার কয়েক হাজার দিন মজুর এ মৌসুমে জীবিকার জন্য এখানে এসে ধান কেটে আয় করতো। প্রতিটি অবস্থাসম্পন্ন কৃষক পরিবারে ১৫/২০ জন দিনমজুর মজুরী দিতো মাসিক ভিত্তিতে। তাদের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না ঝড়-তুফান মোকাবেলার। ১২ নভেম্বর সে ভয়াল রাতে তাদের সবচেয়ে বেশী জীবন দিতে হয়েছে অজ্ঞতা আর সতর্কতা না পাওয়ার কারণে। উপকূলের বয়োবৃদ্ধরা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে ঝড়ের আংশকা করতে পারেন। বিশেষ করে নদীতে বিশেষ কিছু মাছের বেশী করে ধরা পড়া, পাখিদের অস্থিরতা, রাতের বেলায় শেয়াল কুকুরের অস্বাভাবিক ডাক বা কান্না অথবা ঝড়ের আগে গরম হাওয়া বা ঝিরঝির ইলশেগুড়ী বৃষ্টি দীর্ঘসময় ধরে হাওয়া ইত্যাদি দূর্যোগের আলামত সম্পর্কে। ১৯৭০ এর ১২ নভেম্বরের আগে এ সকল আলামত দেখা গেছে। তবে এতটা ভয়াবহতা বা ক্ষয়ক্ষতি হবে এ বিষয়ে কেউ আঁচ করতে পারেনি। সে সময়টা ছিল বাঙালীর দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন গণতন্ত্রের উত্তরণের নির্বাচনী হাওয়া। সোনালী ফসলের পাশাপাশি চলছিল নির্বাচনী জনসভা, মিছিল, গনসংযোগ। তখন চরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। কাঁচা সড়কের দীর্ঘ পায়ে চলা, পথে গরুর গাড়ী আর কয়েকটি যাত্রীবাহী বাস ছিল সম্বল। সে সময় উপকূলে বনাঞ্চল ছিল না। ছিলনা কোন দূর্যোগ মোকাবেলার ব্যবস্থাপনা। তাই চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে খুলনার সুন্দরবন অঞ্চল পর্যন্ত বিরাণ জনপদে লাখ লাখ লাশের সারি যার অর্ধেকও সমাহিত করা যায়নি। বহু গণকবর যার স্বাক্ষী হয়ে রয়েছে। নোয়াখালীর সদর, কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া উপজেলার ক্ষয়ক্ষতি ছিল অনেক বেশী। হাতিয়া সন্দীপের অসংখ্য মানুষ সমুদ্রে ভেসে গেছে। একইভাবে সদর, কোম্পানীগঞ্জেও নিখোঁজ হয়েছে অনেক। যারা আর কোন দিন ফিরে আসেনি তাদের পরিজনের কাছে। যাদের অনেকের সপ্নছিলো দীর্ঘকাল পর ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বাঙালী নেতৃত্বের সরকার প্রতিষ্ঠা করার। বিশ্ববাসী সেদিন হতবাক হয়েছিল তখনকার শাসকগোষ্ঠির অবজ্ঞা দেখে। ঝড়ের ৩ দিন আগে আমেরিকার স্যাটেলাইট থেকে ঝড়ের গতি প্রকৃতি সর্ম্পকে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল পাকিস্তান আবহাওয়া দপ্তরে। সে বার্তা প্রচার হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন গুলো ঝড়ের পরও ছিল নির্লিপ্ত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় “রোম যখন পুড়ছিলো নীরো তখন বাঁশী বাজাচ্ছিলো” ১২ নভেম্বর ঝড়ের দিন পাকিস্তানের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁন চীন সফরে ব্যস্ত। তাকে যখন ঝড়ের সংবাদ জানানো হলো, তখন কিছু সময় নিরুত্তর থেকে বলেছিলেন কিছু রিলিফ পাঠিয়ে দাও। এমনকি চীন সফর শেষে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। অস্বাভাবিক মদ্যপ এই সামরিক শাসক, যেদিন নোয়াখালী সফরে এসেছিলেন, সেদিন বর্তমান পিটিসির (পুলিশ টেনিং সেন্টার) প্যারেড গ্রাউন্ডে তার হেলিকপ্টার অবতরন করার পর তাকে তার দেহরক্ষী সামরিক কর্মকর্তার সাহায্য নিয়ে নামতে হয়। এ সময় কাছাকাছি থাকা জীপে উঠার পথ টুকুতে তাঁর পদযুগল ছিল বেসামাল। তবে ব্যাতিক্রম ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আহসান। ঝড়ের ৩য় দিনে তিনি আকস্মিক হেলিকপ্টার যোগে বর্তমান পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে অবতরন করার পর প্রশাসনের কেউ আগাম সংবাদ না পাওয়ায় তাকে ট্রেনিং সেন্টারের প্রবেশ পথ সংলগ্ন এস আই কোয়াটারের বারান্দায় কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হয়। এরপর জেলা প্রশাসক গাড়ী নিয়ে এসে তাঁকে নিয়ে যায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। এই গর্ভনর আহাসান বাঙালী প্রেমিক হওয়ায় তাঁকে পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর পদ থেকে পদচ্যুত করানো হয়। ১৯৭০ এর পর ১৯৮৫ এবং ১৯৯১ সালে দুটো সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছাসের তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও ২০০৭ সালের সিডোরের ক্ষয়ক্ষতিকে মূল্যায়ন করে আমাদের সচেতন হতে হবে। দূর্ভাগ্যজনক হলে সত্য যে আমাদের দেশে উপকূলীয় অঞ্চল এখনো অরক্ষিত কৃষি মৎস পশু সম্পদের উৎস ও উপকূলের মানুষ গুলো স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও এখনো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি । প্রচুর বনায়ন, আশ্রয় কেন্দ্র ও বাঁধ নির্মান না হওয়ায় লাখ লাখ উপকুলবাসী এখনও মারাত্বক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশগত বিপর্যয়রোধে কোন উন্নয়ন হয়নি। উপকুলের জনপদে ফসলী জমিতে অপরিকল্পিত বাসস্থান গড়ে তোলা এখনও বন্ধ হয়নি। একটা নিরাপদ ‘জোনে’ বাসস্থান তৈরীর জন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহন করা জরুরী। অপরিকল্পিত জনপদে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি বেশি হয়। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বাসস্থান, গবাধি পশুর আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা গেলে প্রাণহানি অনেক কমবে। সরকার উপকুলীয় অঞ্চলে উপকুল উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহন করার বিষয়ে আমরা জানি। তবে তা আজও বাস্তবায়ন করার কোন উদ্যোগে দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে হেলা-ফেলা না করে অতিদ্রুত এর বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তাতে করে উপকুলের জনজীবন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষতির হাত থেকে অনেক রেহাই পাবে।
http://www.youtube.com/watch?v=VpKS89857mk
Click This Link
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০০৯ সকাল ১০:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
লিখেছেন
মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে...
...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com...
...বাকিটুকু পড়ুনলিখেছেন
রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।...
...বাকিটুকু পড়ুনআমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।
তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন