দখলে দখলে বিপন্ন নোয়াখালীর দুই শতাধিক খাল। জেলার ঐতিহ্য নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাও এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জেলার সর্বত্র খাল দখলের প্রতিযোগিতা চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। সব দেখেশুনেও সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং প্রশাসন নির্বিকার।
জানা যায়, খালপ্রধান জেলা নোয়াখালীতে একসময় ছোট-বড় খালগুলোই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলে ফসল উত্পাদন এবং মাছের চাহিদা মেটাতেও মানুষের নির্ভরতা ছিল প্রবহমান খালের ওপর। নৌকায় চড়ে বরযাত্রার বহু কাহিনী এখনও আলোচিত এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে। স্থানীয় হিসাবমতে ছোট-বড় ২৮৮টি খাল ছিল নোয়াখালীতে। এসব খালই মেঘনা হয়ে মিশে ছিল বঙ্গোপসাগরে। এসব খালের কারণেই সবুজে আচ্ছাদিত থাকত নোয়াখালী। ফসলের ব্যাপক উত্পাদন জেলাকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছিল। আর জেলার বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে এবং এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছোটবড় খাল দিয়েই চলত যাতায়াত। যাতায়াতের প্রধান বাহন সাধারণ নৌকার সঙ্গে দেখা যেত পালতোলা নৌকা। যে খালের নামে নোয়াখালীর নামকরণ হয়েছে সেই নোয়াখালের (নতুন খাল) দৈর্ঘ্য ছিল ৪৪ কিলোমিটার। ছোট ছোট খালগুলোর সংযোগ ছিল বৃহত্ খাল নোয়াখাল, ওয়াপদাখাল, বামনীখাল ও মহেন্দ্রখালের সঙ্গে। কিন্তু নোয়াখালীর ছোট খালগুলো এখন হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব খাল ভরাট করে চাষাবাদ করছে। আর বেপরোয়া দখলবাজিতে সরু হয়ে যাচ্ছে বড় খালগুলো। নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনীতে যে বড় খালটিতে লাইন পড়ে থাকত শত শত বাণিজ্যিক নৌকার, সেই খালে এখন নৌকা ভেড়ানোর ঘাট নেই। দু’পাশ থেকে খালের বৃহত্ অংশই দখল হয়ে গেছে। নোয়াখালের সঙ্গে সংযুক্ত এ খালটিতে এখন আর নৌকা চলাচলের পথ নেই। চৌমুহনী দিয়ে প্রবাহিত এ খালটির ওপর নির্মিত ব্রিজটির নাম ‘বড়পুল’। কিন্তু ব্রিজের আশপাশও এমনভাবে দখল হয়েছে যে ব্রিজের নিচে কোনো খাল আছে তা কেউ অনুমান করতে পারবে না। এছাড়া চৌমুহনী চৌরাস্তা থেকে মাইজদী হয়ে সোনাপুর পর্যন্ত প্রধান সড়কের পাশে খালের কোনো অস্তিত্বই এখন আর চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে কিছু জায়গা নালা-নর্দমা বলে মনে হয়। এ খালের ওপরই পাকা ভবনও হয়েছে। ব্রিজ না করে খাল ভরাট করেই হয়েছে অনেক বাড়ির রাস্তা। কিন্তু কোনো কর্তৃপক্ষ দখলদারদের বাধা দিয়েছে শোনা যায়নি। এখনও বিভিন্ন খালের ওপর রাতারাতি গড়ে উঠছে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দলবাজদের স্থাপনা। সরেজমিন ঘুরে চোখে পড়ে চৌমুহনী থেকে ফেনীখালের বিভিন্ন অংশে দখলের ভয়াবহ চিত্র। চৌমুহনী এলাকা ছাড়াও জমিদারহাট, সেতুভাঙ্গা, ছমির মুন্সী, চৌরাস্তা থেকে সোনাইমুড়ী হয়ে চাটখিল পর্যন্ত এবং পশ্চিমে চন্দ্রগঞ্জ হয়ে লক্ষ্মীপুরের দিকে খাল দখল চলছে সমানতালে। চৌমুহনী বড়খাল থেকে মদনমোহন স্কুলের সামনে দিয়ে পূর্ব দিকে যাওয়ার পথ আর নেই। বড়পুল থেকে চৌমুহনী এসএ কলেজ পর্যন্ত পুরো খালই দখলে। আর বড়পুল থেকে দক্ষিণে দেখা যায় খালের মাঝখান থেকে দোকানঘরের চৌহদ্দি নেয়া হয়েছে। এসব স্থানে যারা দখলে আছে—তারা কেউ দখল হিসেবে, কেউ অতীতে লিজ নিয়েছিল একবার এবং এখনও সেই ভিত্তিতেই আছে। জানা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে বিরাট অঙ্কের মাসোহারা দিয়েই এসব অবৈধ স্থাপনা টিকিয়ে রাখছে এবং দিনে দিনে সম্প্রসারণ করছে দখলদাররা। এজন্য সব সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তিকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মূলত খালগুলোতে যেসব স্থান কেন্দ্র করে নৌ-চলাচল সচল থাকত, সেসব স্থান অচল হয়ে পড়ায় ধসে গেছে নৌ-যোগাযোগ। এছাড়া বড় খালগুলোতে কম উচ্চতার ব্রিজ তৈরি নৌ-চলাচলকে অনেক ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত করেছে। এদিকে জেলার দক্ষিণে চরাঞ্চলে খাল দখল করে চলছে মাছ চাষ। প্রতি বর্ষায় ভূমিদস্যুদের দখলের কারণে জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয় হাজার হাজার একর জমির ফসল। টেককাটাখাল দখল এবং ভরাটের কারণে ভাটিরটেক এবং ওয়াপদাখাল এলাকায় এ বছরও ১৫ হাজার একর জমিতে ফসল উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে। অবৈধ দখলে বিপন্ন চরজুবিলির মধ্যে গোপাটখাল, মরাদোনাখাল, লোকমানখাল, জেঠারখাল, আশ্রয়নখাল, বাগারদোনাখাল, চরওয়াপদাখাল, চরজব্বারের মালেকখাল ও বাঁশখালীখালের পানিপ্রবাহ। যে খালগুলো দিয়ে একসময় নোয়াখালীর যে কোন প্রান্ত থেকে মেঘনা হয়ে হাতিয়া বা সন্দ্বীপ যাতায়াত করা যেত, সে নৌপথ এখন বিলুপ্ত। ফলে নোয়াখালীজুড়ে জলাবদ্ধতার হুমকি বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, নোয়াখালী জেলায় এরই মধ্যে ছোট ছোট অন্তত ৫০টি খাল অস্তিত্ব হারিয়েছে। লিজের নামে অনেক স্থানে দখল হয়েছে খাল। এখনও প্রতিদিন খাল ইজারা নিতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ভিড় জমায় পাউবো কর্যালয়ে। তবে নোয়াখালীতে এ পর্যন্ত কত খাল অস্তিত্ব হারিয়েছে বা দখল হয়েছে অথবা নাব্যতা বিপন্ন হয়েছে, সে পরিসংখ্যান নেই খালের মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে। নোয়াখালীতে এ বেপরোয়া খাল দখল সম্পর্কে জানতে চাইলে পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, বিভিন্ন স্থানে খাল দখল, খালে বাঁধ দেয়া ইত্যাদি অবৈধ কর্যক্রম আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রশাসনের সহায়তায় উচ্ছেদ অভিযানও করেছে। কিন্তু অনেক স্থানে উচ্ছেদের পর তা আবার দখল হয়ে যায় বলে তিনি জানান। অতীতে কিছু খালের অংশবিশেষ লিজ দেয়ার ঘটনা স্বীকার করে তিনি বলেন, বর্তমানে কোথাও খাল লিজ নেই। খালে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে প্রধান প্রকৌশলীকে চেয়ারম্যান করে সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।http://www.amardeshonline.com/pages/details/2009/12/07/8651

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


