আমার এই ক্ষুদ্র জীবনটায় প্রিয় মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। মা, বাবা, ভাইবোন, মামা, খালা, চাচা কতমানুষই না ক্রমে ক্রমে প্রিয় থেকে প্রিয়তর হয়েছে দিনে দিনে। তবে নিকটজনেরা ছাড়াও কেউ কেউ চিরপরিচিত কিন্তু আজীবন অদেখা মানুষেরা আমার অতি প্রিয় আপনজন রয়েছেন।
তেমনি একজন প্রিয় মানুষ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার ছেলেবেলার
জল পড়ে পাতা নড়ে বইটা দিয়েই তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। ক্রমে ক্রমে পরিচিত হয়েছি তার গানের সাথে, তার কবিতা ও গল্পের সাথে। মানুষের মনের কথাগুলিই কবি যেন বলে গেছেন অবলীলায়। এমন কোনো বাঙ্গালী পাওয়া যাবেনা যে কিনা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো সঙ্গীত, গীতিকাব্য বা নৃত্যনাট্য তার প্রিয় তালিকায় নেই।
আমার ও সকলের প্রিয় কবির বাবা, মা, আবাস, নিবাস সব আমি সেই ছেলেবেলা থেকেই ঠোটস্থ করে রেখেছিলাম। যে কেউ জিগাসা করলেই ফট ফট বলে যেতাম। আমি একনজরে আমার প্রিয় কবির পরিচিতি তুলে ধরলাম।
নাম- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
দাদু- প্রিন্স দ্বারকানাথ
বাবা- দেবেন্দ্রনাথ, উনি ব্রাহ্ম্ধর্মে ( বানান লিখতে পারছিনা) দিক্ষিত ছিলেন।
মা- সারদা দেবী। উনার ১৫টি সন্তানের মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চতুর্দশ সন্তান।
জন্ম-ঠাকুরবাড়ি, ২৫শে বৈশাখ, ১২৬৮ ।
প্রথম বিদ্যালয়- ওরিয়েন্টাল সেমিনারী। ( এটা অবশ্য প্রকৃত বিদ্যালয় নাকি আমি জানিনা। প্রিপ্লে টাইপ কিছু হবে। ধনীদের জন্য সেই আমলেও কত ব্যাবস্থা ছিলো।
তারপর তিনি গেছিলেন নর্মাল সকুলে। এছাড়া বাড়িতে সর্ববিদ্যায় পারদর্শী করে তুলতে বিচিত্র শিক্ষার আয়োজন করাহয়েছিলো,পালোয়নের কাছে কুস্তি, বাংলা,অংক,ভূগোল, ইতিহাস কোনোটাই বাদ যায়নি।ইংরেজী, ছবি আঁকা, জিমনাস্টিক, রবিবার সকালে বিগ্ঙান( আবারও বানান সমস্যা
প্রথম কবিতা প্রকাশ- অমৃতবাজার পত্রিকা,হিন্দুমেলার উপহার।
ষোলো বছর বয়সে প্রকাশিত হলো ভানুসিংহের পদাবলী।
এরপর বিলেতে পাঠানো হলো কবিকে ব্যারিস্টারী পড়বার জন্য।(এ কথা অবশ্য সকলেই জানেন)কিন্তু কবির পড়াশুনায় মন নেই।
কবি ও কবিপত্নী
বিবাহ- ১৮৮৩, ৯ডিসেম্বর।ঠাকুরবাড়ীর ই এক কর্মচারীর কন্যা। বিয়ের আগে নাম ছিলো ভবতারিণী।নতুন নাম হলো মৃনালিনী। মৃনালিনী দেবী বারো বছর বয়সে কবির বাড়িতে আসেন আর ত্রিশ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। তাদের তিনটি কন্যা সন্তান মাধবীলতা, রেনুকা ও মীরা আর দুই পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও শমীন্দ্র।
মাধবীলতা কোলে মৃনালিনী দেবী ও কবি।
সাহিত্যে নোবেল - দ্বিতীয়বার বিলাত ভ্রমনে কবির সাথে পরিচয় হয় ইংরেজ কবি ইয়টসের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতান্জলির অনুবাদ পড়ে তিনি মুগ্ধ! ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হলো গীতান্জলি। ইংল্যান্ডের শিক্ষিত মানুষের মধ্যে সাড়া পড়ে গেলো।
১৫ই নভেম্বর ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পান।তিনিই প্রথম প্রাচ্যবাসী যিনি এই পুরষ্কার পান।
কবির জীবনের শেষ কবিতা-
তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছে আকীর্ণ করে
বিচিত্র ছলনা জালে হে ছলনাময়ী।
.......
শেষ পুরষ্কার নিয়ে যায় সে যে আপন ভান্ডারে
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে শান্তি অক্ষয়
অধিকার।
এই ছিলো কবির শেষ কবিতা।
মৃত্যু- ১৩৪৮ সালের ২২ শ্রাবন। রাখী পূর্ণিমার দিন দুপুরবেলা। তিনি চলে গেছেন । রেখে গেছেন তার সব অমর সৃষ্টি।
আমার ২য় প্রিয় মানুষটির নাম পাবলো পিকাসো। এই মানুষটি আমার এত প্রিয় জেনে অনেকেই হয়তো চমকে উঠবেন। তবে আমি জানি, কি কারনে তিনি আমার এত প্রিয়। ছোটবেলায় ঘর বাড়ির দেওয়াল, ক্যালেন্ডারের পাতা, মায়ের হিসাবের ডায়েরী সর্বোপরি বাবার সাদা ধবধবে পান্জাবীকেও যখন ক্যানভাস বানাতে ছাড়লাম না, তখন বাসায় আমার নাম দেওয়া হলো পাবলো পিকাসো। আমি এই নামের মানুষটাকে নিয়ে অনেক ভাবতাম। একদিন আমার ১০ বছরের জন্মদিনে আমার ছোটমামা দিলেন একটি বই উপ হার সেখানে ছিলো কিছু বিখ্যাত মানুষের কথা, তারি মাঝে পিকাসো একজন।
পরে বড় হবার সাথে সাথে তার কথা জেনেছি। তার কিছু কর্মকান্ডে অবাক হয়েছি তবুও শেষ পর্যন্ত তিনি আমার প্রিয় ব্যাক্তিত্ব হিসেবেই থিতু হয়ে রয়ে গেলেন।
নাম- পাবলো পিকাসো। পুরো নাম নেপোমুসেনো ক্রিসপিনয়ানো দ্য লা সান্তিমাসমিমা তরিনিদাদ রুইজ পিকাসো। (বাবাহ! এত বড় নাম ধরে কেউ কি ডাকতে পারে?)বড় হয়ে তিনি নিজের নাম রাখলেন পাবলো পিকাসো। মাতৃকুলের পদবীটুকু রেখে পিতৃকুলের পদবীটুকু ছেটে ফেললেন যাক বাবা বাঁচা গেলো, নইলে প্রিয় শিল্পীর নাম বলতে গেলে আমার দাঁত একটাও আর থাকতোনা আর অন্যেরা পড়তো ঘুমিয়ে।
জন্ম- ২৫শে অক্টোবর ১৮৮১ সাল। স্পেনের ভুমধ্যসাগরের কাতালান প্রদেশের মালাগা শ হরে।
বাবা- ডন জোস রুইজ , তিনিও ছিলেন একজন আর্ট স্কুলের টিচার।তার কাছেই পিকাসোর ছবি আঁকায় হাতে খড়ি। তিন বছর হতেই একটা পেনসিল বা কাঠকয়লা পেলেই কাগজ, মেঝে, চেয়ার টেবিল, বই খাতা জামাকাপড় সবখানেই পিকাসো তার অংকন চর্চা চালাতেন । এতক্ষণে বুঝলাম আমাকেও কেনো সবাই পিকাসো বলতো।
জেনেছি বড় হবার পর তিনি পথে ঘাটে বস্তিতে, জাহাজ ঘাটায়,পতিতা পল্লীতে,জেলেপাড়ায়, সমুদ্রের উপকূলে সবখানেই ঘুরে বেড়াতেন। যা দেখতেন তাই আঁকতেন।
প্রথম ছবি প্রদর্শনী- The moulin de la Galettle একটি কফি হাউসের দৃশ্য।
ব্লু পিরিয়ড-১৯০১ থেকে ১৯০৪ এসময় তার সমস্ত ছবিতে ছিলো নীল রঙের প্রভাব। নীলকে তিনি বিষন্নতার প্রতীক বলেই ভাবতেন।
পিন্ক পিরিয়ড- এসময় তার ছবিতে গোলাপী রঙের আধিক্য দেখা যায়।
পিকাসোর জীবনে প্রথম নারী-ফেরানডে অলিভিয়ে।
৯ বছর তারা লিভ টুগেদারে থেকেছেন।তাদের একটি পুত্র সন্তানও ছিলো। এরপর পিকাসোর পরিচয় হয় ব্যালে ড্যান্সার ওলগা কোকালভা। পিকাসো তাকেই বিয়ে করেন।
১৯২৭ সালে পিকাসোর জীবনে এলো আরেক নারী। নাম মারি থেরেসা
ওয়ালটার। তিনি ছিলেন পিকাসোর ছবির মডেল। এসময় তার সাথে ওলগার বিচ্ছেদ হয়ে যায়।মারি থেরেসার ঔরসে পিকাসোর একট কন্যা সন্তান জনমে । এর পর পর পিকাসোর জীবনে আরো একজন নারীর আগমন ঘটে।
শান্তির প্রতীক সাদা পায়রা- প্যারিসে অনুষ্ঠিত ২য় শান্তি সন্মেলনে পিকাসো প্রথম লিথোগরাফে শান্তির প্রতীক সাদা পায়রা আঁকেন।
শিপ্লের ইতিহাসে পিকাসো ছবি বিক্রি করে যে অর্থ পেয়েছেন তার এক শতাংশও কেউ আর পায়নি। অর্থ, খ্যাতি জশ নারীসঙ্গ পিকাসোর জীবনে অপরিমেয় ভাবে এলেও তার শিল্পসৃষ্টিতে কিছুই বাঁধা সৃষ্টি করতে পারেনি। কিউবিজম, এক্সপরেশনিজম,পোস্টার, এচিং, লিথোগ্রাফ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অন্যন্য সাধারণ।
১৯৭০ সালে তিনি তার সব শিল্পকর্ম বারসিলোনার মিউজিয়ামে দান করেন। মাতৃভূমির প্রতি এই ছিলো তার শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য।
মৃত্যু- ১৮৭৩ সালের ৮ই এপ্রিল।ফ্রান্সের মুগা শহরে শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন।
এবার বলবো এক মহিয়সী মহিলার কথা যিনি সকলের পরিচিত একজন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠা সেবিকা হিসাবে। তার কথা পড়ে পড়ে ও জেনে আমার একসময় খুব ইচ্ছে হত ঠিক তার মত হতে। চোখের সামনে ভেসে উঠতো সাদা ধপধপে পোষাক পরা একজন নারী যিনি গভীর রাত্রীতেও হেঁটে বেড়াচ্ছেন যুদ্ধাহত শত শত সৈন্যের মাঝ দিয়ে। অকাতরে করে চলেছেন তাদের সেবা শুশ্রুসা। হ্যা আমি ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গলের কথাই বলছি।
নাম-ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গল।
জন্ম- ১৮২০ সালের ১২ই মে ইতালীর ফ্লোরেন্স শহরে। জন্মসথানের নামেই বাবা তার নাম রাখেন। মেয়েকে নানা দেশের ভাষা, ছবি আঁকা, সংগীত সর্ববিদ্যায় পারদর্শী করে তুলেছিলেন বাবা। কিন্তু মেয়ে চাইলো সেবিকা হতে। এ ব্যপারটা মোটেই পছন্দ হলোনা বাবার। তথাপি একটু বড় হবার পর ফ্লোরেন্স লন্ডনের হার্লে স্ট্রিটের একটি মেয়েদের জন্য নির্মিত হাসপাতালেই যোগ দিলেন।
১৮৫৪ সালে তুরস্কের বিরুদ্ধে রাশিয়া যুদ্ধ ঘোষনা করলো। আত্নীয় স্বজন পরিজনের সব বাঁধা উপেক্ষা করে ফ্লোরেন্স তুরস্কের হাসপাতালে সুপারিনটেড্ন্ট পদে যোগ দেন। ফ্লোরেন্স ছিলেন এই হাসপাতালের এক সেবার প্রতিমূর্তি।দিনরাত অকাতরে তিনি সেবা করে যেতেন। রুগীরা তার নাম দিয়েছিলো দীপ হাতে রমণী।
( অনেকটা আমার প্রফাইল পিকটার মত
যুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু ক্রমাগত রোগীদের সেবা করে করে অক্লান্ত পরিশ্রমে এ কয়বছরে তার নিজের শরীর ভেঙ্গে পড়েছিলো।
মৃত্যু- অবশেষে ১৯১০ সালে ১৩ই অগাস্ট এই মানব দরদী মহিয়সী নারীর মৃত্যু হয়।
তার ইচ্ছা ছিলো দেশে নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠিত করা। সমগ্র ইংল্যান্ডের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ৫০,০০০ পাউন্ড অর্থ তুলে দেয় আর তা দিয়ে ১৮৫৯ সালে সেন্ট টমাস হাসপাতাল তৈরী হয় প্রথম নার্সিং স্কুল যা নাইটিঙ্গেল হোম নামে পরিচিত।
আপাতত এটুকুই থাক। পরে জানাবো আমার ভেতরের পিকাসো, রবিঠাকুর বা নাইটিঙ্গেল হবার সুপ্ত স্বত্তার কথা।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১০ বিকাল ৩:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


