১
নিখাদ প্রেম যাকে বলে আর কী! আমার বন্ধু মুশফিকের তার বান্ধবী লিতির প্রতি প্রেমটাও ছিল ঠিক তেমনই। মুশফিকের প্রেম যে নিখাদ ছিল তাতে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কোন সংশয় সন্দেহ ছিল না। কিন্তু লিতির প্রেম কতোটা নিখাদ ছিল তা নিয়ে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বেশ কানাঘুষা ছিল। তবে মুশফিক একেবারে নিশ্চিন্ত ছিল। অবশ্য ওদের দুজনকে একসাথে দেখলে যে কারোরই তেমনটা মনে হতে পারে। এই লাইলী-মজনু জুটির কেউ অত বড়লোক না হলেও তারা ঘুরত ঢাকার অভিজাত সব রেস্তোরাঁয়। আর এসকল রেস্তোরাঁর বিল আসত বন্ধু মুশফিকের পকেট থেকে। ওর পকেটে টাকাটা আসত মোটামুটি মানের ৪ টা টিউশানীর বদেীলতে। বলাই বাহুল্য এই পরিশ্রমলব্ধ টিউশানীর পুরো টাকাটাই চলে যেত রেস্তোরাঁর বিল মেটাতে মেটাতে।
আগেই যেমনটা বললাম ওদের দুজনের সাথে একসাথে সাক্ষাৎ করলে কারো পক্ষেই একথা ভাবার কোন অবকাশ থাকে না যে এদের এই সম্পর্ক কোনদিন ভেঙ্গে যেতে পারে। কিন্তু মেয়েটা তার ভার্সিটি থেকে যেবার ‘অবকাশ’ যাপনে গেল সেই ‘অবকাশে’ সর্বশক্তিমান ভাগ্যনির্মাতা মুশফিকের উপকার করার চেষ্টা করলেন। সোজা কথায় বলতে গেলে মেয়েটাকে আরেকটা ছেলের সাথে ‘জুড়েই’ দিলেন! সৃষ্টি হল নতুন জুড়ি বা জুটি! মানুষ অনেকসময় সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি করতে বাধ্য করে। এটাও মনে হয় তেমনই!
ঐ অবকাশে ছেলেটা লিতিকে জয় করেছিল না লিতি ছেলেটাকে জয় করেছিল তা বলা না গেলেও ছেলেটার ঢাকায় বাড়ী ও অর্থবিত্ত যে লিতি কে ভাসিয়ে নিয়েছিল সমুদ্রের নোনা জলে তা নিয়ে এখন পরিচিত মহলে কারো মধ্যেই আর দ্বিমত নেই।
সবচে আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল লিতির বাড়ীর লোকজনও এ ঘটনা কে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছিল।
প্রেম-কাম-বিয়ে এগুলোতে সফল হতে গেলে ঢাকায় একটা বাড়ী থাকলে এখন খুবই সুবিধা হয়। যাদের বাড়ী নেই তারা দেীড়ায় ৪০০ মিটার আর বাড়ীওয়ালার ছেলেরা দেীড়ায় ২ মিটার! ১ম মিটারে মেয়েটা রাজি না হওয়ার ভাণ করে... ২য় মিটারে গলায় গোল মেডেল পরিয়ে দেয়! ৪০০ মিটার দেীড়ে এসে খাঁটি প্রেমের এ্যাথলেট ক্লান্ত হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে! কেউ কেউ অভিমানে মাটির নিচেই ঢুকে পড়ে!
২
না মুশফিক অভিমানে মাটির নিচে শুয়ে পড়ল না। মাটির উপরে বিছানায় বার বার শুয়ে পড়তে লাগল। আর ভাগ্যনির্র্মাতার তার টাকা বাঁচিয়ে দেয়ার কেীশলের প্রতিবাদে সে কেঁদে কেটে বালিশ ভেজাতে লাগল। সবাই ওকে কতো বোঝাল যে মেয়েটাই ভাল না ... এরকম একটা ভোরাশাস লেডি ... ওর জন্য আফসোস করে কী হবে... ইত্যাদি ইত্যাদি...কিন্তু মুশফিক এসকল কথা একান দিয়ে শুনে ওকান দিয়ে বের করে দেয়। ও না কী এখনও মেয়েটাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত আছে! প্রেমে পড়লে পুরুষমানুষ কতোটা বোকা হতে পারে তা জীবনে এই প্রথম উদাহরণ সহ এত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করলাম!
মুমফিক মেয়েটাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত থাকলেও ক্ষমা চাইতে আসার জন্য মেয়েটার বয়েই গেছে!
সে আছে তার ধান্ধায়... মেয়েটা আসলেই লোভী ছিল। যে নতুন ছেলেটার সাথে সে জুড়ে গিয়েছিল তার সম্পর্কে লোকে কিন্তু দু এক কথা বলে... লিতিও শুনেছে সেসব... কিন্তু বাড়ী থাকলে বাকী সব লোককথা রূপকথার মতোই মিথ্যা হয়ে যায়! তাই লিতি রূপকথার রাণীর মতো বাস্তবেই রাণী সেজে বসে গেল। অর্থাৎ ছেলেটাকে সে বিয়ে করল...
৩
এই বিয়ের পর বন্ধু মুশফিকের প্রকৃতই কী অবস্থা তা শুধু বড় কোন লেখকই দিতে পারবেন। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি চোখের পানিতে ভিজে যাওয়া বালিশ শুকানোর পর সেগুলো দেখতে রীতিমতো ‘অশ্লীল’ লাগছে!
৪
লিতির সংসারের বয়স এখন ৬ মাস। না কোনমতেই এটাকে পুরানো সংসার বলা যায়না। তবে সেই টিউশানিই আবার তার চালটা চালল... একটা রহস্যময় টিউশানির কারণে এ নতুন সংসারে পুরানো গন্ধ ছড়াতে লাগল!
বড় লোকের ছেলে হলেও লিতির বর আগে থেকেই টিউশানি করত। বিয়ের পর সে তার সব টিউশানিই ছেড়েছে তবে রহস্যময় কারণে একটা টিউশানি তখনো ছাড়তে পারেনি। বিয়ের পরও তার এই বিশেষ টিউশানির প্রতি তার কেন এতো মায়া? লিতি আর তার বন্ধু-বান্ধব সবাই উত্তর খোঁজা শুরু করল। সাধারণত এসব উত্তর পেতে খুব একটা সময় লাগে না। লিতির বর না কী যে ছাত্রী কে পড়াতে যায় তাকে পড়ানোর পরিবর্তে নিজেই না কী কীসব যেন পড়ে আসে!
না! একদম না! এ খবর শুনে লিতি মুশফিকের মতো মোটেও হেলে পড়ে গেল না বিছানায়... কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে সেটাকে অশ্লীল রংও দিল না।
সে ঠান্ডা মাথায় আবারও একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিল। ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেয়া তার ধাতে সয়ে গেছে। উঁহু আপনার যা ভাবছেন তা না... সে মোটেও তার বরকে খুন করবে না। সে কাউকে প্রাণে মারে না। বাঁচিয়ে রেখে মৃত্যুযন্ত্রণা দেয়...
এই তো কয়েক মাস আগেই তার ভার্সিটির এক বড় ভাই (যিনি একটি পত্রিকায় চাকরি করেন) তাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। তেমন কিছু না... বড় ভাই তার ‘ছাত্র’ হতে চেয়েছে!
আবারও সেই ‘টিউশানি’ ফ্যাক্টর!
লিতি একদিন টিউশানিটা শুরুই করে দিল...
নতুন অবস্থায়ই পুরানো রূপ পাওয়া ভঙ্গুর সংসারটা বোধহয় এ যাত্রা আর ভাঙবে না...
-----------------------------------

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



