না! এটা কোন কোপা আমেরিকা কাপের গল্প নয়! এটা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কোপাকুপির গল্প। ঠিক মানুষ কোপাকুপি নয় তবে বল কোপানোর গল্প এবং সঙ্গে প্রতীকী কাপটাও!
গত বিশ্বকাপের আগের বিশ্বকাপের সময় কলোনীর সিনিয়রদের মাথায় বুদ্ধি এলো কলোনীতে আর্জেন্টিনা ব্রাজিল ভাগ হয়ে ‘ম্যাচ’ খেলা হবে এবং খেলা শেষে বিজয়ী দল মেডেল সহ কাপ পাবে।
সমস্যা লেগে গেল বল নিয়ে। কারো কাছে ভালো বল নেই। আর্জেন্টিনা ব্রাজিল ম্যাচ কী আর যে সে বল দিয়ে খেলা যায়! কলোনীতে সবার বাবাই ছা-পোষা সরকারী কর্মকর্তা। তাই কারো পকেটেই একা একটি বল কেনার মতো ‘বল’ ছিল না!
ইচ্ছা যখন প্রবল থাকে তখন উপায় একটা হয়ই। ঠিক করা হলো বল, মেডেল, কাপ ইত্যাদির জন্য চাঁদা তোলা হবে। যারা খেলতে চায় তারা নির্ধারিত চাঁদা দিলেই হবে। অর্থাৎ আমাদের জুনিয়রদের জানিয়ে দেয়া হল যে ... বাপু! খেলতে চাও? চাঁদা দাও!
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল? আমার আর মনিরের জিভে জল আসার অবস্থা। অনেক কষ্ট করে তাই নির্ধারিত চাঁদা যোগাড় করে ফেললাম।
কলোনীর সবচে ভালো ফুটবলার মোতালেব ভাই। উনি চাঁদার টাকা যোগাড় করতে পারেননি তাই আর্জেন্টিনা ব্রাজিল কোন দলেই তার জায়গা হয়নি! ঠিক করা হল তিনি হবেন রেফারি! পারিশ্রমিক হিসেবে তাকে একটি মেডেল ও একটি কোক খাওয়ানো হবে। দু’দলই মোতালেবের মত অসাধারণ ফুটবলারকে রেফারি হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট! কারণ উনি যদি কোন এক দলে থাকতেন তবে প্রতিপক্ষের বারোটা বাজিয়ে দিতেন! মোতালেব ভাই ঢাকা লীগে খেলার মত প্রতিভা কিন্তু উনি খেলার ব্যাপারে খুব একটা সিরিয়াস নন!
হয়ত দারিদ্রের কারণে লাজুক লাজুক হয়ে থাকার কারণেই তিনি বেশি একটা খেলতে চান না। সবসময় তিনি কী যেন একটা চিন্তার মধ্যে থাকেন। তবে তাকে রেফারি হিসেবে পেয়ে দুদলের সবার ‘নিরপেক্ষতা’ সম্পর্কিত চিন্তা দূর হয়ে গেল। মোতালেব ভাই’র মত ভদ্র ও নিরপেক্ষ লোককে রেফারি হিসেবে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার!
ম্যাচের দিন সকালে দুটো দলে ভাগ হয়ে সবাই গেল বল, মেডেল ও কাপ কিনতে। আমি ছিলাম বল কেনার গ্র“পে।
দোকানদার নানা রকম বল দেখাচ্ছে। শামীম ভাই বিরক্ত হয়ে গেলেন
-আরে ভাই ডিয়ার ছাড়া কোন বল বের করবেন না। এই রকম হাজার হাজার বল আমাদের আছে! [আমি তো থ! হাজার বল? একটাই যেখানে নাই সেখানে হাজার!]
দোকানদার ডিয়ার বাদে বাকী সব বল সরিয়ে ফেলল। নানান রকমের ডিয়ার বল দেখা যাচ্ছে। অথচ এমনটি হবার কথা ছিল না। ডিয়ার বল একরকমই হবার কথা। আমি খেয়াল করলাম ডিয়ার বলগুলো দু’রকমের... কোনটির গায়ে লেখা ‘DEER’ আর কোনটির গায়ে লেখা ‘DEAR’... আমি শামীম ভাইকে ঘটনা খুলে বললাম। উনি বললেন
-অ্যাঁ! তাইতো! আসল ডিয়ার কোনটা?
দোকানদার ছেলেটি বলল,‘সবই আসল ডিয়ার যেটাই নেন... বল ভালো।’
- গ্যারান্টি আছে?
- কোন গ্যারান্টি ফ্যারান্টি নাই! পানিতে ডুবাইয়া লীক চেক কইরা দিমু। এর পর বাসায় নিয়া গেলে আর ফেরত নাই!
- তাহলে আসল ডিয়ার কোনটা এটা শিওর হয়ে নিতে হবে। মামুনরে কল দিই...
‘মামুন আসল ডিয়ার কোনটা? ডি ই ই ... না কী ডি ই এ... ... অ্যাঁ কী? যেটার অর্থ ‘হরিণ’ সেটা? বানান জানস না! হায় কপাল! এখন বানান পাই কই? কল কেটে গেল...
- এ্যাই সুমন যেটার অর্থ হরিণ সেটা কোন ডিয়ার?
- ডি ই ই আর
- তুই শিওর?
- মোটামুটি শিওর...
- হায়রে বাঙালি জাতি... কী হবে এদের? এরা হরিণের ইংরেজিটাও শিওর হয়ে বলতে পারে না! সবগুলা বান্দর না কী?
শামীম ভাই উদাসভাবে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ বললেন ‘আইডিয়া!’ এই বলেই শামীম ভাই বিপরীত দিকে বই ঘর দোকানের দিকে রওয়ানা দিলেন। বৃদ্ধ দোকানদার উদাস ভাবে বসে ছিলেন।
- কী চাচামিয়া ভালো তো!
- জ্বী ভালো! শামীম তুমি কেমন...
- জ্বী একটু ব্যস্ত ... আর বলবেন না... আচ্ছা আপনার দোকানে কী ভালো ডিকশনারী আছে?
- ভালো তো একাডেমির টা। কিন্তু ঐটা বোধহয় শেষ। তুমি বরং এটি দেবেরটা নিতে পারো।
- যা আছে তাই দেখান!
শামীম ভাই পাতা উল্টানোর ভাণ করে ডিয়ার এর অরিজিনাল বানান চেক করে নিল।
- চাচামিয়া ডিকশনারী কতো?
- এইটা বাবা রাখা যাবে ১২০ টাকা!
- আর কম হবে না? মনে করেন যদি নিতেই চাই...
- না বাবা! একদাম!
- আমার কাছে আছে টেনেটুনে ৭০ টাকা। আচ্ছা চাচা কাল সকালে এসে ‘ডিয়ার’ নিয়ে যাবো।
- ডিয়ার নিবা মানে?
- অ? থুক্কু! ডিকশনারী নিব। বুঝলেন চাচা যে যুগ পড়ছে! সামনে পিছে উপরে নিচে ডাইনে বামে খালি ইংরেজি আর ইংরেজি! কাউরে লাথি দিবেন তাও ইংরেজি! এই যুগে ডিকশনারী ছাড়া কী ঘর থেকে বের হওয়া যায় বলেন? কাল সকালেই একটা ডিকশনারী লাগবো!
এই বলেই শামীম ভাই হনহন করে দোকান থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি পেছন ফিরে দেখলাম বৃদ্ধ দোকানদার ফ্যালফ্যাল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন!
বলের দোকানে ঢুকেই
- ভাই ডি ই ই আর দেন...
- ঐটা কি জিনিস?
- ডিয়ার বল। অরিজিনাল। তাড়াতাড়ি...
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল মহারণের প্রস্তুতি সম্পন্ন। বিকাল তিনটায় ম্যাচ। খেলা একটু পরই শুরু হবে। বেশ কিছু খুদে মানবশিশু আর বেশি বয়সী কিছু জানোয়ার ( কুকুর, গরু, মুরগী ছাগল ইত্যাদি) খেলা উপভোগের জন্য মাঠের আশেপাশে জমায়েত হয়েছে। বিকেল নাগাদ আশা করা যায় আকাংিখত দর্শকরাও একবার ঢুঁ মারবে। কেমন যেন একটা উৎসব উৎসব ভাব। আমার খুব ভালো লাগছিল। তবে যে সকল দর্শকের বিবরণ দিলাম তারা ব্যতীতও আরো একজন দর্শক ছিল যাকে কেউই দেখতে পাচ্ছিল না! হায় কে জানত! সেই দর্শকই ম্যাচের ফলাফল ও তৎপরবর্তী দুর্ঘটনার জন্য পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ভাবে দায়ী হবে!
খেলা শুরু হল। আমি আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার । খুব একটা ভালো স্কোরার নই। কে জানে হয়ত পেছনে ম্যারাডোনা নেই বলেই আমার গোল সংখ্যা খুব বেশি নয়! গোলসংখ্যা বেশি না হওয়ার আরেক কারণ ব্রাজিল ডিফেন্ডার শামীম ভাই। উনি আমার পায়ের প্রতিটা মুভমেন্ট মুখস্থ করে রেখেছেন। আমাদের আর্জেন্টিনা দলেও আছে বিশালদেহী বেলাল ভাই। তাকে ভেদ করেও গোল দেয়া প্রায় অসম্ভব। তাই স্ট্রাইকার দের কারণেই হোক আর ডিফেন্ডারদের কারণেই হোক খেলা শেষ হবার পাঁচ মিনিট আগে খেলা গোলশুন্য!
কিন্তু পরবর্তী মিনিটেই আর্জেন্টিনা ব্রাজিল ম্যাচে এমন এক দক্ষতায় জয়সূচক গোল হয়েছিল যে সেরকমটা পৃথিবীর আর কোন আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচ কিংবা অন্য কোন খেলায় হয়েছে কী না সন্দেহ! গোলটা করেছিলাম আমি। ফুটবলীয় দক্ষতায় নয়, কূটনৈতিক দক্ষতায়!
আগেই বলেছি এই খেলায় আরো একজন দর্শক ছিল যাকে শুরু হতে কেউ দেখতে পাচ্ছিল না। কারণ তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালে। আমরা যে মাঠে খেলছিলাম তার দক্ষিণ পশ্চিম কোণে ছিল সুমি আপুদের বাসা। তিনি আবার আর্জেন্টিনার সাপোর্টার।
ভাগ্যক্রমে তাকে আমি দেখতে পেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন মামুন ভাই, বেলাল ভাই আর শামীম ভাই এর দিল কী ধড়কান! আগে বিভিন্ন খেলার সুমি আপু জানালায় এসে দাঁড়ালে উনি কার দিকে তাকিয়েছেন এটা নিয়ে এই তিনজন না হলেও তিনশোবার ঝগড়া করেছে।
তাই জানালায় সুমি আপুকে দেখেই আমার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেলো! আমি বল পাবার অপেক্ষায় ছিলাম। বল এলো আমার পায়ে। সামনে শুধু শামীম ভাই আর গোলকীপার। আমি বলের উপর পা ঘোরাচ্ছি। কিন্তু শামীম ভাই ডজ খাচ্ছেন না...এবার দিলাম কূটিৈতক ডজ ... বললাম,‘শামীম ভাই সুমি আপু জানালায় আসছে। আপনার দিকে চেয়ে আছে!’
ব্রাজিল বলে কী মানুষ নয়! রোমান্টিসিজম কী ব্রাজিলীয়দের নেই! অবশ্যই আছে! মূহুর্তের জন্য শামীম ভাইয়ের মনোযোগে ভাটা পড়ল। তার চোখ সুমি আপুদের জানালায়... আমার চোখ তার দু পায়ের ফাঁকে! যে ফাঁক দিয়ে আমি বল পাঠিয়ে দিলাম চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের জালে!... গোল! গোল!গোল!
শামীম ভাই যতোক্ষণে সংবিৎ ফিরে পেয়েছে ততোক্ষণে আমাকে ঘিরে উৎসব শুরু হয়ে গেছে! পরের তিন চার মিনিট ব্রাজিল বেশ দেীড়াল। কিন্তু বিশালদেহী ডিফেন্ডার বেলালের ডিফেন্স ভাঙতে পারলো না।
মোতালেব ভাই শেষ বাঁশি বাজালেন। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় সমর্থক আমাকে ঘিরে উৎসব শুরু করে দিল। পাঁচ মিনিট মতন উৎসব আমি প্রাণভরে উপভোগ করেছি কিন্তু এরপর আমি আর কিছু জানি না। কারন এর পর আমি অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে!
পরে কী ঘটেছিল তা শুনেছি সতীর্থদের মুখেই...
পাঁচ মিনিট পর উৎসব যখন একটু হাল্কা হয়ে এসেছিল তখনই শামীম ভাই এসে আমার পেছনে এক ফ্লাইং কিক মারেন! যে কিকের প্রভাবে অজ্ঞান হয়ে প্রায় উড়েই আমি হাসপাতাল পেীঁছেছিলাম!
এরপর দু-পক্ষে বাধে তুমুল সংঘর্ষ! ভাগ্যিস কোপাকুপি হয় নি। কিন্তু বেলাল ভাই সেই মূহুর্তে হঠাৎই বলে উঠেন...‘কোপা বলকাপ! (বল ও কাপ দুটোই কোপাতে বলল!)... যারা পরাজয় মেনে নিতে পারে না...‘ম্যারাডোনাকে(!) লাথি মেরে অজ্ঞান করে ফেলে তাদের সাথে আমি অন্তত আর কোনদিন খেলব না! কোপা বলকাপ কোপা!’
ক্ষুব্ধ আর্জেন্টাইন সমর্থকরাই বলকাপ কুপিয়ে একশেষ করল ‘ম্যারাডোনাকে(!) লাথি মারার অপরাধে!
এর পর আরো অনেকবারই কলোনীতে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচের প্রস্তাব উঠেছে। কিন্তু সবাই তখন সমস্বরে বলতো ‘কোপা বলকাপ আর খেলব না! ভবিষ্যতের কোন ম্যারাডোনা -পেলেকে তো আমরা মরতে দিতে পারি না!’
------------------------

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

