বয়স যখন নয় বছর, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের ক্যান্টিনে কাজ শুরু করে বিল্লাল। শৈশব-কৈশোর পেরিয়েছে ছোট্ট এ ক্যান্টিনেই। এখন ২১ বছর বয়সেও আছেন সেখানে।
বিল্লালের মতোই অনেকের শৈশব কাটে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠে। তবে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ তাদের আসে না, নেই থাকার বন্দোবস্তুও। হাড়ভাঙা খাটুনির পর প্রাপ্য মজুরিও তাদের জোটে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হলে ২৩টি ক্যন্টিন এবং ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত ১৯টি মেস রয়েছে। এছারাও রেজিস্ট্রার ভবন, মোকাররম ভবন, কার্জন হল, কলা ভবনসহ বিভিন্ন ভবনে ক্যান্টিন রয়েছে আরো অন্তত ১৫টি। আর এর আশপাশে রয়েছে অনেক দোকান।
ক্যান্টিন, মেস, দোকান থেকে শুরু করে এ এলাকায় শিশু শ্রমিকরা বেঁচে থাকার তাগিদে দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছে নামমাত্র মজুরিতে। প্রতিটি ক্যান্টিনে গড়ে ১০ জন এবং মেসে ১২ জনের বেশি শিশু শ্রমিক রয়েছে বলে জানালেন হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের ক্যান্টিন ব্যবস্থাপক আব্দুল বাতেন ও কবি জসীম উদদীন হলের মেস ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম।
এ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু ক্যান্টিন ও মেসগুলোতেই প্রায় অর্ধ সহস্রাধিক শিশু শ্রমিক কাজ করছে। একাধিক শিশু শ্রমিক জানায়, তাদের দিনে ১৪ ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করতে হয়।
শ্রম আইনে আট ঘণ্টা কাজের বিধান রয়েছে। আর সরকার সম্প্রতি জাতীয় শিশু নীতির যে খসড়া তৈরি করেছে, তাতে ১৪ বছরের কম বয়সিদের সার্বক্ষণিক কাজে নিয়োগ না দেওয়ার বিধান করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া ১৮ বছরের নিচে প্রত্যেককে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সবই উপেক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে।
জসিম উদদীন হলের ক্যান্টিন, মেস ও দোকানগুলোতে মোট ১৭ জন শিশু শ্রমিক কাজ করে। কিন্তু তাদের থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। সারাদিন কাজ শেষে মেস ও ক্যন্টিনের চেয়ার ও খাবার টেবিলই তাদের ঘুমাতে দেখা যায়। একই চিত্র মধুর ক্যান্টিনেও।
ক্যান্টিনবয় হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলে, "সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। খুবই ক্লান্ত থাকি। এরপর অনেক রাতে ক্যান্টিনের ফ্লোর ধুয়ে তার ওপর বিছানা ফেলে ঘুমাই। ভোর হলেই আবার উঠতে হয়।"
এ সব শিশু শ্রমিকদের বেতনের ক্ষেত্রেও কোনো নিয়ম-নীতি নেই। এসব শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন জন বিভিন্ন হারে বেতন পায়। তবে দৈনিক বেতন কারোই ৫০ টাকার বেশি নয়। আবার সেটাও নিয়মিত পাওয়া যায় না।
জসীম উদদীন হলের ক্যান্টিনে দুই বছর ধরে কাজ করছে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার নাসির। দিনে ৩০ টাকা করে পায় সে। আয় বাড়ানোর জন্য রাতে পাশের দোকানেও কাজ করছে সে।
নাসির বললো, "ক্যান্টিনের কাজে খুব খাটনি। সকাল ৬টা থেকে শুরু করে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কিছু কিছু ছাত্র খারাপ ব্যবহার করে। কেউ কেউ মারেও।"
শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার ইচ্ছা আছে নাসিরেরও। সে বললো, "আমার পড়তে ইচ্ছা করে। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়ছিলাম। সুযোগ পেলে আরো পড়তাম। বাবা-মা পড়াতে না পেরে কাজে পাঠিয়েছে।"
জসীম উদদীন হলের মেস ব্যবস্থাপক রবিউল অবশ্য জানালেন, মেসে শিশু শ্রমিকদের মাসে ১ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর এর সঙ্গে থাকে তিন বেলার খাবার।
ক্যান্টিন ও দোকানগুলোতে শিশু শ্রমিকদের ঠকানো হয় বলে বেশি অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে এ জন্য ক্যান্টিন ইজারাদাররা দায়ী করেছেন, প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বিনা পয়সায় খাওয়ার 'সংস্কৃতি'কে।
জসীম উদদীন হলের ক্যান্টিন ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মনির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "ক্যান্টিন লাভ কম। কিছু পলিটিকাল ছাত্র আছে, তারা ফ্রিতে বা কম টাকায় খায়। তাই ক্যান্টিনে যারা কাজ করে, তাদের বেশি টাকা দিতে পারি না।"
এ অভিযোগ পাওয়া গেল অন্য হলগুলোতেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্যান্টিন ব্যবস্থাপক বলেন, "প্রতি মাসে হলের ছাত্র নেতাদেরকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলে কোনো পার্থক্য নেই। সব সময় একই নিয়ম।"
শিশু শ্রমিকদের এ বঞ্চনার জন্য প্রশাসনের নজরদারিহীনতাকেই দায়ী করছেন শিক্ষার্থীরা।
মাস্টারদা সূর্য সেন হলের ছাত্র নাইমুল ইসলাম রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "ক্যান্টিনের ওপর হল প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ছাত্রনেতারাই মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন এগুলো। এজন্য ক্যন্টিনের খাবারের মান থেকে শুরু করে ক্যান্টিনবয়দের জীবনযাত্রার মান- কোনো কিছুই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।"
এ সব শিশু শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা ও বেতনের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালার কথার গুরুত্ব স্বীকার করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আআসম আরেফিন সিদ্দিকও।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের উচিত, এসব শিশুদের আবাসনের ব্যবস্থা করা। এসব শিশু অক্লান্ত পরিশ্রম করে। তাই তাদের বেতনের ক্ষেত্রেও একটি নীতিমালা থাকা উচিত।"
এ নিয়ে হল প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে উপাচার্য আরো বলেন, "এসব শিশুরাও অনেক মেধাবী। আমরা বিভিন্ন সময় তার নজির পেয়েছি। গত বছর স্যার এএফ রহমান হলের এক ক্যান্টিনবয় এসএসসিতে গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়েছে। তাকে বিনা বেতনে সিটি কলেজে পড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।"
"আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের উদ্যোগে এসব শিশুদের পড়াচ্ছে। আমরা তা উৎসাহিত করছি", বলেন তিনি।
সূত্রঃ প্রতিবেদক, শফিকুল ইসলাম মিলটন।বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
খবরটি মনে দাগ কাটার মত আর ওদের উপর নির্যাতন আমরাতো প্রতিনিয়তই দেখতে পাই। ছাত্রদের মধ্যেতো ভালও আছে কিন্তু যারা নির্যাতন কারী দেখি সামান্য কারনেই ধমক এমনকি হাত তোলা যাদের স্বাভাব তাদের কি একটুও ওদের প্রতি মায়া হয় না???? ভাগ্যক্রমে তারাতো উল্টো পজিশনেও থাকতে পারতো.....
কচি বয়সে হাড়ভাঙা খাটুনি, তাতেও বঞ্চনা...তারপর আবার শারীরিক নির্যাতনও!!!! এর মধ্যে থেকেও বাচাঁর আশা, মনে দাগ কাটা একটি খবর।
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।