ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮টি গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ১৫টিতে গত শিক্ষাবর্ষে (২০০৮-০৯) কোনো মৌলিক গবেষণা হয়নি। এর মধ্যে কয়েকটি কেন্দ্র আছে, যেগুলোতে কখনোই কোনো মৌলিক গবেষণা হয়নি।
এই ১৫টি গবেষণা কেন্দ্রের জন্য গত শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাড়ে ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। কিন্তু কয়েকটি সভা-সেমিনার ও কিছু প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম।
এক দশকের বেশি সময় উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ছিলেন আমিনুল ইসলাম। তিনি এখন দর্শন বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গবেষণা কেন্দ্রগুলোর সেমিনারে সাধারণত যেসব প্রবন্ধ পাঠ করা হয় সেগুলো “সেমি-পপুলার” গবেষণা। এসব “পাঁচমিশালী”কে মৌলিক গবেষণা বলা যাবে না।’ তিনি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মৌলিক গবেষণাও হয়।
কয়েকটি গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালকদের দাবি, অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দের কারণে অনেক সময় মৌলিক গবেষণা করা সম্ভব হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য বিভিন্ন অনুষদ ও কিছু বিভাগের সঙ্গে গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। সংশ্লিষ্ট অনুষদ বা বিভাগের একজন শিক্ষককে নির্দিষ্ট মেয়াদে কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত এ দায়িত্বের জন্য তাঁরা আলাদা সম্মানী পান।
নজরুল গবেষণা কেন্দ্র:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক, তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্য-কর্ম সম্পর্কে গবেষণা পরিচালনার জন্য ১৯৮৮ সালে নজরুল গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গত শিক্ষাবর্ষে এ কেন্দ্রের জন্য ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল; তবে কোনো গবেষণা হয়নি।
কেন্দ্রটির পরিচালক এ টি এম নূরুর রহমান খান বলেন, ‘আগে কী হয়েছে তা বলতে পারি না। শিগগির নতুন উদ্যমে গবেষণার কাজ শুরু করা হবে।’ তিনি সম্প্রতি এ কেন্দ্রে যোগ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের হদিস নেই:
নাম আছে, বরাদ্দও দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কেন্দ্রটি কোথায় বা কার দায়িত্বে আছে, তা জানা যায়নি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। অথচ গত শিক্ষাবর্ষে ওই কেন্দ্রের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আড়াই লাখ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান জানান, মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রটির দায়িত্বে আছেন অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী।
আবদুল মান্নান চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে এখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে জানান, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এরপর আর কোনো কার্যক্রম হয়নি।
আবদুল মান্নান চৌধুরী জানান, তিনি এখন আর এর সঙ্গে যুক্ত নন। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন যুক্ত থাকতে পারেন।
যোগাযোগ করা হলে মুনতাসীর মামুন জানান, তিনি এই কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত নন। ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান আহমেদ কামাল যুক্ত থাকতে পারেন।
অধ্যাপক আহমেদ কামাল বলেন, তিনি বা তাঁর বিভাগ এ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্যের কার্যালয়ও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র: গত শিক্ষাবর্ষে এ কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ ছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। এক বছরে ১০টি সভা-সেমিনার, দুটি বিশেষ বক্তৃতা ও গবেষণা প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। এ সময়ে মৌলিক কোনো গবেষণা হয়নি। তবে কেন্দ্রের পরিচালক খোন্দকার আশরাফ হোসেন সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধগুলোকেই গবেষণা বলে দাবি করেন।
উচ্চতর মানবিক ও সামাজিক গবেষণা কেন্দ্র:
গত শিক্ষাবর্ষে এ কেন্দ্রের জন্য পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। এখন পর্যন্ত গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়নি।
একই অবস্থা সেন্টার ফর এডুকেশসন রিচার্স অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের। কেন্দ্রটির পরিচালক এম নাসির উদ্দীন জানান, বরাদ্দকৃত টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে।
ড. সিরাজুল হক ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র:
এ গবেষণা কেন্দ্রে গত শিক্ষাবর্ষে দুটি সেমিনার ছাড়া আর কোনো কার্যক্রম ছিল না। কেন্দ্রের পরিচালক এ আর এম আলী হায়দার দাবি করেন, তাঁদের এ কেন্দ্রে যেসব সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, সেগুলোই এক ধরনের গবেষণা। এ কেন্দ্রের জন্য গত শিক্ষাবর্ষে বরাদ্দ ছিল পৌনে দুই লাখ টাকা।
বাংলাদেশ সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র:
২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো গবেষণাই হয়নি এ কেন্দ্রে। ১০ বছরে মাত্র তিনটি সেমিনার হয়েছে। এ গবেষণা কেন্দ্রটির কোনো কার্যালয় নেই।
কেন্দ্রটির পরিচালক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, তিনি ২০০৮ সালে এখানকার পরিচালক হয়েছেন। এরপর তিনি সিলেটের ‘নাগরি লিপিতে’ হস্তলিখিত একটি আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ সম্পাদনার কাজ শুরু করেছেন। আগামী মাসে কাজ শেষ হবে। তিনি বলেন, এ কেন্দ্রের জন্য গত বছর বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫০ হাজার টাকা। এ টাকা দিয়ে কোনো গবেষণা পরিচালনা সম্ভব নয়।
সেন্টার ফর বুড্ডিস্ট হেরিটেজ অ্যান্ড কালচার:
গত শিক্ষাবর্ষে এ কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ ছিল দেড় লাখ টাকা। এ সময়ে কোনো মৌলিক গবেষণা হয়নি, শুধু তিনটি সেমিনার ও একটি কর্মশালা করা হয়।
কেন্দ্রের পরিচালক সুকোমল বড়ুয়ার দাবি, তাঁদের সেমিনারে মূলত গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ পাঠ করা হয়।
নাজমুল করিম স্টাডি সেন্টার:
প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত এখানে মৌলিক কোনো গবেষণা হয়নি। সামাজিক বিজ্ঞান সম্পর্কিত একটি জার্নাল বের করাই কেন্দ্রটির মূল কাজে পরিণত হয়েছে।
গত শিক্ষাবর্ষে গবেষণা পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটিকে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে কেন্দ্রের পরিচালক কামরুল আহসান চৌধুরীর দাবি, বরাদ্দের কোনো অর্থ তিনি পাননি।
গোবিন্দ দেব দর্শন গবেষণা কেন্দ্র:
গত শিক্ষাবর্ষে এ কেন্দ্রে দুটি সেমিনার হয়েছে। আর ‘দর্শন ও প্রগতি’ নামে একটি বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ১৮টি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। ওই বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল তিন লাখ টাকা।
অধ্যাপক দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য গবেষণা কেন্দ্র:
এখানে গত শিক্ষাবর্ষে কোনো গবেষণা হয়নি। নেই কোনো পরিচালক। কেন্দ্রটির সাবেক পরিচালক নারায়ণ বিশ্বাস জানান, নিয়ম থাকলেও তিনি কারও হাতে কেন্দ্রটির দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে পারেননি। তিনি স্বীকার করেন, তাঁর গাফিলতির কারণে এ কেন্দ্রে কোনো গবেষণা হয়নি।
ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যালায়েন্স:
২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রটির পরিচালক জি এম চৌধুরী বলেন, ওই কেন্দ্রে মৌলিক গবেষণা হয় না। মূলত বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র:
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রের জন্য গত শিক্ষাবর্ষে বরাদ্দ ছিল তিন লাখ টাকা। গত শিক্ষাবর্ষে আয়োজন করা হয় চারটি সেমিনার। সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধ প্রবন্ধাবলী শিরোনামে পাঁচ খণ্ডে এবং পারসপেক্টিভ ইন স্যোসাল সায়েন্স (১-৮) পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া এবং কার্ল মার্কস অ্যান্ড ম্যাক্স ওয়েভার শীর্ষক দুটি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশ করেছে এ কেন্দ্র।
আন্তধর্মীয় ও আন্তসাংস্কৃতিক সংলাপ কেন্দ্র:
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রে গত শিক্ষাবর্ষে বরাদ্দ দেওয়া হয় এক লাখ টাকা। এ পর্যন্ত কোনো মৌলিক গবেষণা হয়নি। কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর ঈদে মিলাদুন্নবী, বুদ্ধপূর্ণিমা পালন এবং ১১টি সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হয় এ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে।
জাপান স্টাডি সেন্টার: বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটিকে গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করলেও কেন্দ্রটিতে কার্যত কোনো মৌলিক গবেষণা হয় না। কেন্দ্রের পরিচালক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, এখানে মূলত জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর দুই বছরের পেশাদার স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়।
তদারকির ব্যবস্থা নেই: বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের গবেষণার জন্য বছর বছর নতুন নতুন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম কীভাবে চলছে তা তদারকির কোনো ব্যবস্থা নেই।
এই যদি হয় বাংলাদেশের সবোর্চ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা, তাহলে সমগ্র দেশের অবস্থা কি ????
কোনদিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ ?
এ দেশের ভবিষ্যৎই বা কি ?
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০১০ বিকাল ৩:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



