somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কানাডার স্কুলে প্রথম দিন (২য় পর্ব)

২৯ শে এপ্রিল, ২০১৬ সকাল ১১:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম লেখার পরে সবাই আরও অনেক কিছু জানতে চেয়েছেন। তাদের জন্যেই ২য় পর্ব।

তো ভর্তি হওয়ার পরে সেদিন আর ক্লাস করিনি, মা বাবার সাথে বাড়ি আসি। তারপরের কয়েকদিন পরে ক্লাস শুরু হয়। প্রথম ক্লাস সম্ভবত ম্যাথ ছিল। ম্যাথের টিচার কি লম্বা ছিল!! নীল চোখ, খাড়া নাক সেদিন টেনশনে খেয়াল করিনি কিন্তু পরে খেয়াল করে দেখেছি আসলেই সুদর্শন। তো আমি কাউকেই চিনতাম না, বেশিরভাগই কানাডিয়ান, আর চায়নার কয়জন ছিল। আমার পাশে একজন টি-শার্ট, হাফ প্যান্ট পড়া কানাডিয়ান ছেলে বসে ছিল। সে সারা ক্লাস টেবিলের নিচ দিয়ে মোবাইলে কি জানি করছিল। কথা বলার মতো না বলে আমি চুপ করে বসে রইলাম। তো দেখি টিচারের হাতে কাচের টুকরার বাক্স। আমি আগে থেকে জানতাম এখানে সবকিছু প্র্যাকটিকাল করায়। এখন যদি কাচের টুকরোগুলো দিয়ে কিছু তৈরী করতে বলে!! আমি পারব না বাবা। আমি তো ভয়ে ভয়ে ওয়েট করছি কি হয় দেখার জন্যে।

ও আর একটা জিনিস এখানে রোল নাম্বার থাকেনা, মাত্র ২০-৩০ টা স্টুডেন্ট। ওদের ৩০ টার বেশি স্টুডেন্ট এক ক্লাসে রাখার নিয়ম ছিলনা। টিচাররা নাম ধরে ডাকতেন, এবং কয়েক মাসের মধ্যে চেহারা চেনা হয়ে যাওয়ায় তাও করতে হত না। তো ওখানে লাস্ট নেম আলফাবেটিকাল অনুসারে লিস্ট থাকত। প্রতি ক্লাসে আমার নাম নেওয়ার পরে টিচাররা আমার কাছ থেকে শিউর হয়ে নিত ঠিক বলছে কিনা। আর সরিও বলত ভুল বললে। চাইনিজ, জাপানিজ নামগুলো তো আরও কঠিন। অনেকে এখানে এসে এজন্যে নিজের নামের আমেরিকান ভার্সন রাখত। রাখুক ওদের তো গরু, খাসি জবাই দিয়ে আকীকা দেওয়া নাম না, আমি কেন চেন্জ করব? তবে ক্লাসরুমগুলো তেমন বড় ছিল না। আমিতো মফস্বল শহরের মেয়ে, সারাজীবণ ১০০ সদস্য বিশিষ্ট ইয়া বড় ক্লাসরুমে, চওড়া বেন্চে বসে ক্লাস করেছি। ওখানে চেয়ার অথবা টুল থাকত। কেমন বন্দি, কর্পোরেট মনে হতো।

যাই হোক, সেই আয়না কাহিনীতে ফিরে আসি। সবার হাতে আয়না পাস করা হল। তারপরে সেটা বিভিন্ন এংগেলে রেখে সিমিট্রি, স্কেল ফ্যাক্টর বুঝানো হল। আমি কিছুই বুঝলাম না। যদিও ওখানকার অংক আমাদের দেশের চেয়ে অনেক সোজা, আমাদের এখানে যেটা গ্রেড ৭ এ শেখায় সেটা এখানে গ্রেড ১০ এ শেখায়। এটা অন্যান্য এশিয়ান দেশগুলোর ক্ষেত্রেও সত্যি। তাই টিচাররা এশিয়ানদের স্মার্ট কিড বলত। তো আমার না বোঝার কারণ ছিল ভাষার অদক্ষতা, এবং প্রথমদিনের নার্ভাসনেস। বুঝানোর পরে আয়নাগুলো ফেরত নিয়ে নিল। আমিতো খুশি যাক কিছু তৈরী করতে দেয়নি। তবে কয়েকমাসের মাঝে অংকে ভাল করতে শুরু করলাম।

এর পরের ক্লাসে যাওয়ার পালা, এখানে টিচাররা অন্য ক্লাসে যায় না। তাদের ক্লাসটা নিজের ব্যক্তিগত অফিসের মতো। স্টুডেন্টরা অন্য ক্লাসে যায়। এখানে প্রত্যেকের নিজস্ব লকার থাকে। অনেকে অন্য ক্লাসে যাওয়ার সময় লকার খুলে আগের ক্লাসের জিনিস রেখে পরের ক্লাসের জিনিস নিয়ে যায়। আমি দেশের মতো সবকিছু ব্যাগেই ক্যারি করতাম। বারবার লকার খুলতে ভাল লাগত না। ওখানে "লকার ক্লিন আপ ডে" তে (সেমেস্টার শেষে ২০ মিনিট স্টুডেন্টদের লকার পরিস্কার করতে দেওয়ার দিন) আমার কাজ সবচেয়ে সহজ হত। খালি জ্যাকেটটা নেব, ব্যাস। অনেকের বস্তা বস্তা জিনিস বের হত লকার থেকে। আর লকারে থাকলে জিনিস ভুলে যাওয়ারও চান্স থাকে। অনেককেই দেখতাম টিচারকে বলছে লকার থেকে ক্যালকুলেটর, বই আনতে ভুলে গেছি, আনতে পারি?

আমাদের দেশে পানি খেতে বা বাথরুমে যেতে চাইলে টিচাররা বেশ জেরা করে, বেশিবার গেলে বকেও। এখানে এসব নিয়ে কখনো বকতে দেখিনি। টিচাররা যে কি ধৈর্যশীল!! একটা স্টুডেন্টকে দশবার একই শান্ত, পোলাইট টোনে Please, pay attention বলতে পারে। তবে দু একটা কড়া টিচারও দেখেছি। আর আমাদের বাংলাদেশের টিচারদের কাছেও অনেক ভালবাসা পেয়েছি। তাদের বকার মধ্যেও ভালবাসা থাকত। আমি যদিও তেমন একটা বকা কোন দেশের টিচাররের কাছেই খাইনি। লাকি মি। :)

তো ESL (English Second Language) ক্লাসে গেলাম। এই একটা ক্লাসে কোন কানাডিয়ান থাকে না, শুধু অন্য দেশের ছাত্রছাত্রীরা। যেমন ব্রাজিল, কোরিয়া, কলাম্বিয়া, চায়না, জাপান, ইউক্রেন আরও কতো দেশের মানুষ। এক ক্লাসে যেন পুরো দুনিয়া। কানাডিয়ানদের সাথে ভাংগা ইংলিশে ভাব জমাতে না পারলেও ওদের সাথে জমে গেল। ওদের দেশ নিয়ে জানতে চাইলাম, ওরা আমার দেশ নিয়ে জানতে চাইল। আমার কাছে একটা জিনিস ব্রাজিলিয়ান, কলাম্বিয়ানরা জানতে চাইতো, তোমাদের কি নিজের Alphabet? আমি বুঝতাম না কি বলে। পরে বুঝেছিলাম ওদের অক্ষরগুলো আসলে ইংরেজী। আমাদের যেমন নিজেরদের অ, অা, ক, খ আছে তেমন না। শুনে চোখ কপালে তুলত। নাম্বার আলাদা সেটা শুনে তো আরোই।

ব্রাজিল, কলাম্বিয়া তো Free sex country, বিচের, পার্টির, ফুটবলের দেশ। আমার কাছে প্রথমদিনই কথায় কথায় জানতে চাইল তোমরা কি বিচেও এই ড্রেস (আমার পরে থাকা সালোয়ার কামিজ) পরে থাকো? আমি হ্যা বলাতে চোখ ছানাবড়া। বারবার জানতে চাইছিল বিচেও?? ওরা রুড ছিলনা শুধু কালচার শকটা প্রকাশ করছিল। তারপরে বলল আমার ড্রেসটা অনেক সুন্দর। এমনকি রাস্তায় চলতে ফিরতে অনেকে থামিয়ে বলত কি সুন্দর পোশাক। খুব ভাল লাগত।

বাসায় এসে মাকে বিচ পোশাকের গল্প বলতে মা তো হাসতে হাসতে শেষ। আমাকে জিগ্গেস করল আমি কি এখন থেকে জিন্স পরতে চাই কিনা, তবে ওড়না যেন পরি। মা চায়নি আমি স্কুলে কোন রেসিজমের শিকার হই, সেজন্যে এটা বলেছিল। আমি না করে দিই। কেন যেন জেদ কাজ করত মনে আমাকে আমার মতো করে মেনে নিতে হবে। নাহলে আমি এখানে থাকবনা। হ্যা আমি খুব ছোট্ট একটা দেশের অখ্যাত মফস্বল শহরের কনজারভেটিভ সোসাইটির মেয়ে। এটাই আমি। আমার কালচার। কোন কিছুই ফেলে দেওয়ার মতো না, আমি গর্ব করি আমার যা আছে তাই নিয়ে। গর্ব করি মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, লাল সবুজ পতাকা (লাল সূর্য, সবুজ তারুণ্য ), ধর্মনিরপেক্ষতা, ক্রিকেট=মাশরাফি ভাই, উৎসবপ্রিয় এই দেশের অংশ হয়ে। এই গর্ব তো লুকানোর কিছু না, ছড়িয়ে দেওয়ার। আমাদের যা সমস্যা তাতো বিশ্বের অন্য অনেক দেশেও আছে, এবং আরও বেশি করে আছে। তবে কেনো মাথা নিচু করা? ভারতীয় পরিচালক রিতুপর্ণ ঘোষ বলেছিলেন, আমরা বান্গালিরা যতো না গরিব তার চেয়ে নিজেদের বেশি গরিব ভাবতে পছন্দ করি। একদম ঠিক কথা। এটা আসলেই বন্ধ করতে হবে।

পরের পর্বে কানাডিয়ানদের সাথে কিভাবে বন্ধুত্য করলাম তা নিয়ে লিখব। সেটা আসলেই কঠিন এক চ্যালেন্জ ছিল।

আগের পর্বের লিংক: কানাডার স্কুলে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১২:৪৪
৩৩টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বন্যায় প্লাবিত কুড়িগ্রাম; জনজীবনে দুর্ভোগ

লিখেছেন আরাফাত আবীর, ১৮ ই জুলাই, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০২

কুড়িগ্রাম; যে জেলাকে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা বলা হয়। দেশের আর কোথাও এখন 'মঙ্গা' কার্যক্রম দেখা না গেলেও, এখানে 'মঙ্গা' কার্যক্রম প্রতিবছর চালু থাকে। এখানকার মানুষদের এখনো শুনতে হয়, 'আরে!... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাস্তায় পাওয়া ডায়েরী থেকে-১০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই জুলাই, ২০১৯ রাত ৯:৫১



১। বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে এমন একজন লেখক হচ্ছেন- হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ুন আহমেদ এর মৃত্যুর কথা মনে পড়লেই কোত্থেকে যেন এতগুলো কষ্ট এসে জমে বুকে। আমার সবচেয়ে প্রিয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্ণবাদকে উসকে দিচ্ছেন আমেরিকায়

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৮ ই জুলাই, ২০১৯ রাত ১০:৪৫



বহুবর্ণের মানুষের দেশ হিসেবে, বর্তমান বিশ্বে, আমেরিকা সবচেয়ে কম বর্ণবাদী সমাজ; ১৯৬০ সালের পর, এই দেশে বর্ণবাদ দ্রুত সহনশীলতার মাঝে আসে, এবং গত ৪০ বছর বর্ণবাদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্রেমবন্দির গল্প-২

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে জুলাই, ২০১৯ রাত ১২:১০

©কাজী ফাতেমা ছবি
=ফ্রেমবন্দির গল্প=
গত এপ্রিল মাসে আম্মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম ইসলামিয়া ইস্পাহানী চক্ষু হাসপাতাল চোখ দেখাতে। সেখানে চোখ দেখাতে অনেক ঘুরাঘুরি করতে হয়। ফাইল কাগজপত্র এখান থেকে সেখানে, সেখান থেকে ওখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাহিত্যকর্ম

লিখেছেন এমজেডএফ, ১৯ শে জুলাই, ২০১৯ ভোর ৫:৩৮


দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৯ জুলাই, ১৮৬৩ - ১৭ মে, ১৯১৩) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি, নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা। তিনি ডি. এল. রায় নামেও পরিচিত ছিলেন। আজ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×